kalchitro
Bongosoft Ltd.
ঢাকা রবিবার, ২৪ মে, ২০২৬, ১০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

নজরুলের নাটকে প্রেম


কালচিত্র | চন্দন আনোয়ার প্রকাশিত: মে ২৪, ২০২১, ১২:২২ এএম নজরুলের নাটকে প্রেম

নজরুলের নাটকে প্রেম

চন্দন আনোয়ার

চন্দন আনোয়ার

পাড়াগাঁয়ের যাত্রাগান, কথকথা, কবিগান ইত্যাদির সাথে কাজী নজরুল ইসলামের নিবিড় পরিচয় ঘটেছিল ছেলেবেলাতেই। তিনি নিজেও লেটোর দলে অভিনয় করতেন নিয়মিত। তিনি ছিলেন গ্রাম্য যাত্রাদলের কবিয়াল। গানও লিখতেন এই দলের জন্য। রঙ্গমঞ্চের সাথে জড়িত থাকার সুবাধে তাঁকে অভিনয়েও অংশগ্রহণ করতে হতো মাঝেমধ্যেই। তিনি মনোমোহন থিয়েটারে যোগ দিয়েছিলেন সংগীতাচার্যরূপে।

বহু নাটকের সংগীত রচনা করেছেন এবং সংগীতে স্বয়ং সুরও আরোপ করেছেন। সুতরাং নিরবচ্ছিন্ন না হলেও নাটকের সাথে তাঁর যোগাযোগ ছিল বরাবরই। তারপরও কয়েকটি নাটিকা ও গীতি-নাটকই বাংলা নাট্যসাহিত্যের ইতিহাসে নজরুলের অবদান। রঙ্গমঞ্চ ও নাটকের সাথে এত ঘনিষ্ঠ পরিচয় থাকা সত্তে¡ও কেন নজরুল মহৎ নাটক রচনায় হাত দিলেন না, তা বোধগম্য নয়। অথচ রোমান্টিক নাটক তো বটেই, চীনের জনপ্রিয় ‘লাল লণ্ঠন’ জাতীয় অপেরা লেখার প্রতিভা ছিল তাঁর । নিজের প্রতিভা সর্ম্পকে তিনি ছিলেন উদাসিন প্রকৃতির। নইলে বেতার বা গ্রামফোন জাতীয় ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের পেছনে এত সময় দিতেন না বোধ করি শুধু অর্থোপার্জনের নেশায়। তবে এ সত্যও মানতে হবে, নজরুল আপাদমস্তক গীতিকবি ও সুরস্রষ্টা। গতিশীল ও পরিবর্তিত জীবনের বাস্তবতার রূপায়ণ ঘটে রঙ্গমঞ্চে অভিনয়ের মাধ্যমে। এক্ষেত্রে যে পরিমাণ নৈর্ব্যক্তিক ও নির্লিপ্ত হতে হয়, নজরুলের মতো একজন গীতিকারের জন্য ছিল বড় কঠিন। এই কারণেই উনিশ শতকের রোমান্টিক কবি বায়রন এবং তাঁর সাঙ্গপাঙ্গরা নাটক রচনা করতে গিয়ে শোচনীয় ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছিল। অবশ্য রবীন্দ্রনাথের মতো সর্বত্রমুখী সচেতন প্রতিভার পক্ষে মোটেই কঠিন কাজ নয়। তারপরও নজরুল প্রতিভা বাংলা সাহিত্যে এমনি এক যাদুরকাঠি, যেখানেই ছোঁয়া লেগেছে, নতুনত্বের আমেজ পেয়েছে। বাংলা নাটকও তার ব্যতিক্রম নয়। ১৩৪১ সালের ‘মাসিক মোহাম্মদী’র পৌষ সংখ্যায় মুজীবর রহমান খাঁর লেখা ‘কাজী নজরুল ইসলামের নাটক, শিরোনামের নিবন্ধের মন্তব্য স্মরণযোগ্য :

নজরুল ইসলামের নাটকগুলোর ভাষাও সরল, সুন্দর ও নাটকোচিত গুণ সম্বলিত।... নজরুল ইসলামের এক ‘ঝিলিমিলি’ ভিন্ন আর সকল নাটক-নাটিকায় যে-সুর গুঞ্জনটি শুনতে পাই তা সর্ব দেশের। ‘আলেয়া’য় আছে শাশ্বত প্রেমের বাণী, ‘সেতুবন্ধে’ প্রাণের সঙ্গে জড়ের বিরোধ, ‘শিল্পী’তে শিল্পী ও তার বঞ্চিতা প্রেমিকার বেদন-নিবেদন’ আর ‘ঝিলিমিলি’ যদিও বিশেষ সামাজিক আবেষ্টনের চিত্র, তবু তার মর্মবস্তু হল চিরদিনের পিপাসাতুর তরুণ-তরুণীর তপ্ত অশ্রæজল। কাজেই তার নাটকগুলো শাশ্বত কালের প্রশ্নকে ভিত্তি করে রচিত। নাট্যকারের কারবার শাশ্বতকালের জিনিস নিয়ে হলেও তাঁকে তাঁর বিশেষ পারিপার্শ্বিকের দাবী স্বীকার করতে হয়। নইলে তাঁর রচনা হয় অবাস্তব ও প্রাণহীন। নজরুল তাঁর নাটকে বিশেষের সঙ্গে সাধারণের ও বাস্তবের সঙ্গে আদর্শের প্রায় সর্বত্র সুন্দর সমন্বয় সাধন করেছেন। কবি-প্রতিভার সঙ্গে নাট্য-প্রতিভার অনেক সময় যে প্রচণ্ড বিরোধ দৃষ্ট হয়, নজরুল ইসলামের বেলায় তা দেখা যায় না।

নজরুলের নাটক পর্যায়ে প্রায় সব রচনাতেই রূপক-সাংকেতিকতার পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। কখনও তিনি সচেতনভাবেই করেছেন, আবার কখনও ভাবপ্রকাশের জন্য স্বাভাবিকভাবেই এসেছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, ‘হৃদয়াবেগে যার সীমা পাওয়া যায় না, তাকে প্রকাশ করতে গেলে সীমবদ্ধ বেড়া ভেঙ্গে দিতে হয়। কবিত্বে আছে সেই বেড়া ভাঙ্গার কাজ।... একদিকে ভাষা স্পষ্ট কথার বাহন, আর একদিকে অস্পষ্ট কথারও। বাস্তব জীবনের এমন অনেক সূক্ষ অনির্দিষ্ট অনুভূতি থাকে, যা ভাষার নির্ধারিত কাঠামোতে প্রকাশ করা যায় না। তখনই শিল্পী আশ্রয় নেন রূপক-সাংকেতিকতার। এই শ্রেণির নাটকের ভাব পরিপূর্ণ করে ব্যক্ত করতে পারেন না নাট্যকার। গভীরতর অর্থের আভাস দিতে পারেন মাত্র। ‘সেই জন্য প্রতীকী কবিতায়, নাট্যে, সমগ্র সাহিত্য-বস্তুটি জুড়িয়া একটি মায়াময় কুহেলিকা যেন সব কিছুকে ঢাকিয়া রাখে, পাঠকের চিত্তের উপর একটা মায়াস্পর্শ বুলাইয়া দেয় এবং মনের মধ্যে একটা স্বপ্নরাজ্য গড়িয়া তুলে।...প্রতীকী রচনা সব কথা বুঝিবার জন্য নয়, শুধু মনের মধ্যে একটা সুর বাজাইবার জন্য। নজরুল তাঁর নাটকে এই সুর বাজাবার চেষ্টা করেছেন। তবে  সব ক্ষেত্রে তাঁর এ প্রচেষ্টা সার্থক হয় নি।

নজরুলের ‘ঝিলিমিলি (১৯৩০)’ নাটিকা সংকলনটিতে রয়েছে—‘ঝিলিমিলি, ‘শিল্পী’, ‘সেতুবন্ধ’, ‘ভূতের ভয়’ নাটিকা চতুষ্টয়। এছাড়া নজরুলের লেখা গীতিনাট্যের মধ্যে আছে ‘আলেয়া (১৯৩১)’, ‘মধুমালা (১৯৬০)’, ছোটদের নাটক ‘পুতুলের বিয়ে (১৯৩৩)’। এর বাইরে বেতার, গ্রমোফোন, ছায়াছবির জন্য দেবীস্তুতি, ঈদ, গুল-বাগিচা, অতনুর দেশ, বিদ্যাপতি, বিষ্ণুপ্রিয়া, বিজয়া, শ্রীমন্ত ইত্যাদি কিছু নাটক জাতীয় লেখাও রয়েছে।

 

‘ঝিলিমিলি’ নজরুলের ক্ষুদ্রাকৃতির রূপক- সাংকেতিক নাটিকা। তিন দৃশ্যের নাটিকা। প্রেমের ধারা বহমান আদম-হাওয়ার কাল হতে আজও। কিন্তু প্রেমের পথ কণ্টক মুক্ত নয়। কালে কালে প্রেমের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রচলিত সমাজেরই স্বার্থতাড়িত মিথ্যা ঐতিহ্য আশ্রয়ী একশ্রেণির মানুষ। কিন্তু প্রেমের মহত্ব¡ও তাতে বেড়েছে। প্রেম যেখানে বাধাপ্রাপ্ত, সেখানে আরও দুর্বার, সেখানেই তৈরি হয় আরও গভীর বন্ধন। প্রেমের সার্থক পরিণতি বা মিলন ধুলো-মাটির বাস্তব পৃথিবীতে সম্ভব নয়। প্রত্যেক প্রণয়-প্রণয়িনীর অন্তরে লালন করে থাকে স্বর্গীয় মিলনের স্বপ্ন। তাই যত বাধাই আসুক, প্রেমকেই আঁকড়ে ধরে আরও শক্ত করে। ‘ঝিলিমিল নাটকে ফিরোজা-হাবিবের প্রেমের মূর্তিমান অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায় ফিরোজার ঐতিহ্যপ্রিয় বাবা মির্জা সাহেব। এই দুই তরুণ-তরুণীর মহৎ প্রেমে স্বার্থের শর্ত জুড়ে দিলেন মির্জা সাহেব। হাবিবকে বি এ পাশ করতে হবে, বাঁশি ও এসরাজ ছেড়ে কোরান তেলাওয়াত ও নামাজ পড়তে হবে। শর্ত দিয়েই মির্জা সাহেব নীরব রইলেন না । দুজনের  যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে রাখলেন। এমন কি হাবিবের বাড়িমুখী পূর্বদিকের জানালা খোলাতেও কঠিন নিষেধ তার। পাষাণ পিতার কঠিন শর্তে ফিরোজা শয্যাশায়ী আর তার প্রেমিক হাবিবের প্রহর কাটে বিরহ যন্ত্রণায় ছটফটিয়ে। ফিরোজার করুণ অনুরোধে মা হালিমা জানালা খুলেও ছিল এক সময়। জানালা খুলতেই মৃদ আলোতে দেখা গেল, বাতায়নপথে ছায়ামূর্তির মতো দাঁড়িয়ে ছট্ফট্ করছে হাবিব। হাবিবের বাঁশির সুর ফিরোজার কানে আসে কান্নার সুর হয়ে। বাতায়ন হতে  হাবিবের কণ্ঠের যে গান ভেসে এসেছে বাতাসে, তাতে  প্রতিফলন ঘটেছে প্রেমের শাশ্বত সত্য।

                       হৃদয় যত নিষেধ হানে নয়ন তত কাঁদে।

                        দূরে যত পালাতে চাই, নিকট ততই বাঁধে।।

                                               স্বপন শেষে বিদায়- বেলা

                                                অলক কাহার জড়ায় গো পায়,

                                                 বিধুর কপোল স্মরণ আনায়

                                                             ভোরের করুণ চাঁদে।।

                       বাহির আমার পিছল হল কাহার চোখের জলে।

                       স্মরণ ততই বারণ জানায় চরণ যত চলে।

                                                      পার হতে চাই মরণ-নদী

                                                      দাঁড়ায় কে গো দুয়ার রোধি,

                                                      আমায়- ওগো বে-দরদী-

                                                             ফেলিলে কোন ফাঁদে।

মির্জা সাহেবের হঠাৎ আগমনে ঘরের প্রদ্বীপ নিভে যায়। এই প্রদীপ নিভে যাওয়ার অর্থই হচ্ছে সংকীর্ণ স্বার্থতাড়িত মানুষ মির্জা সাহেব পবিত্র প্রেমের পরশ পেতে পারেন না। ঘরে ঢুকেই জানালা খোলা দেখে তিরস্কার করেন হালিমাকে। মেয়ের সঙ্কটাপন্ন অবস্থা দেখে পিতা হিসেবে মির্জা সাহেবকে বিচলিত হতে দেখি না এমনটাও নয়। বরং স্বাভাবিকের চাইতে বেশিই হতে দেখি। কিন্তু মির্জা সাহেবও এক্ষেত্রে অসহায়। একদিকে একমাত্র মেয়ের একনিষ্ঠ প্রেম, অন্যদিকে সামাজিক বাস্তবতা। প্রেমে কোন দায়বদ্ধতা নেই। কিন্তু বিয়ের সাথে অর্থ ও সমাজ ওতোপ্রতোভাবে জড়িত। মেয়ের সুখের জন্যেই মূলত মির্জা সাহেবের এই প্রচেষ্টা। তাছাড়া মির্জা সাহেব মেয়ের প্রেমের স্বীকৃতি দিতে চান না, এমনটাও নয়।  তার সম্মতিতে যে শর্ত দিয়েছে তা প্রচলিত সমাজব্যবস্থার সব পিতাই করে থাকে। ‘ও ব্যাটা  পাজি, নচ্ছার, বাঁদর!.. কিন্তু মা, তুমি ভাল হয়ে ওঠ। ও যদি বি.এ পাশ করতে পারে এবার, তাহলে ঐ বাঁদরের গলাতেই মোতির মালা দেবো- এও ত বলে রেখেছি। ঠিক এই সময় হাবিব দরজায় কড়া নাড়ে। খবর নিয়ে আসে বি. এ পাশের ফল প্রকাশের। কিন্তু মির্জা সাহেবের বিশ্বাস নেই হাবিবের মৌখিক সংবাদে। বিএ পাশের ‘তার সংবাদ চান মির্জা সাহেব। হতাশ হাবিব ব্যর্থ মনোরথে ফিরে যেতে হয় দরজা হতেই।

বিশ শতকের জটিল-কূটিল প্রকৃতির মানুষদের প্রতিনিধি মির্জা সাহেব। তার কঠিন ও কঠোর অনুশাসনের কারণে হাবিব-ফিরোজার বাস্তব মিলনের পথ প্রায় রুদ্ধ। কিন্তু  শেষ পর্যন্ত প্রেমের গতিরোধ করতে পারে না মির্জা সাহেবেরা, প্রেম ঠাঁই করে নেয় তার ঠিকানায়। আরও বড় পরিসরে নর-নারীর মিলনের সম্ভাবনা জেগে ওঠে তখন। সেখানে মির্জা সাহেবের মতো সমাজ প্রতিভূর স্বার্থ-শর্ত নেই। প্রেমের প্রকৃত আশ্রয় মানুষের অন্তরের গভীরতম প্রদেশে। মহৎ ও পবিত্র প্রেমের প্রাপ্তিও অন্তরের বিষয়। ফিরোজা পেয়েছে  সেই প্রেম। তার কথায় সে প্রমাণ পাওয়া যায়।

     ফিরোজা: কেন এত অপমান সইছ আমার জন্য তুমি যাও। আমি তোমায়  পেয়েছি।

      হাবিব : পেয়েছ ?

      ফিরোজা : হাঁ পেয়েছি।

      হাবিব : কিন্তু, আমি ত পাই নি ।

      ফিরোজা : কাল পাবে। আমি আজ তোমার উদ্দেশ্যে যাব পুব-জানালা দিয়ে। তুমি তোমার বাতায়নের ঝিলিমিলি খুলে রেখো।

      হাবিব : কিন্তু তোমার বাতায়ন ত রুদ্ধ।

      ফিরোজা : যখন যাব, তখন আপনি খুলে যাবে।

      হাবিব : তবে যাই আমি।

এক সময়, মির্জা সাহেবের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন ঘটে। প্রেমের দুর্দমনীয় শক্তির কাছে সে পরাস্ত হয়। আর এই পরাজয়ের মধ্য দিয়ে জীবনের নব দীক্ষা গ্রহণ করে সে। তার চালু চিন্তারও পরিবর্তন ঘটে। আমাদের মিথ্যা অহমিকা ও সমাজ শাসনের শেকল দিয়ে প্রেমকে বাঁধা যায় না। বরং এতে হিতে বিপরীত হয়। ফলে তার মত পরিবর্তন ঘটে। কিছুটা অনুশোচনাও দেখতে পাই মির্জা সাহেবের মধ্যে। আর এই অনুশোচনাবোধের কারণেই চরিত্রটি মহত্তে¡র ছোঁয়া পেয়েছে।

নাটকের দ্বিতীয় দৃশ্যে হাবিব-ফিরোজার মিলন ঘটেছে স্বপ্নালোকের দেশে। যেখানে মির্জা সাহেবের বাধা দেবার হাত নেই। হাবিব-ফিরোজা দুজনেই নিজেদের নতুন করে আবিষ্কার করে। এখানে তারা লাইলী-মজনু, শিরি-ফরহাদ, ইউসুফ-জুলেখাদের সমগোত্রীয়। এখানে ফিরোজা নিখিল বিরহিণী, আর হাবিব নিখিল পুরুষ। এখানে সবাই অ-নামিকা। এখানে যে যাকে কামনা করে তার মত করেই তাকে পায়। জ্যোৎস্নালোকে ফিরোজা নিজের মুখ দেখে বলেছে -‘এ যেন-এ যেন সকলের মুখ! এ যেন শকুন্তলা, এ যেন মালবিকার, এ যেন মহাশ্বেতার মুখ! এ যেন লায়লীর, এ যেন শিরীর মুখ !’

প্রেমের এই স্বর্গীয় মিলনের জন্যই যুগে যুগে নর-নারী জীবনের বিনিময়ে হলেও প্রেমের মর্যাদা অক্ষুণœœ রেখে আসছে।  প্রেমের স্বর্গীয় রূপ আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে হাবিবের কথায় ‘হাঁ এখানে- এই স্বর্গলোকে-শুধু দুটি নর নারী-তুমি আর আমি-অনন্ত কাল ধরে মুখোমুখি বসে আছি। তাদের চোখে পলক নেই। বুঝি পলক পড়লেই বিশ্ব কেঁদে উঠবে। হারিয়ে যাবে সুন্দর এ স্বর্গ-লোক। হারিয়ে যাব আমি আর তুমি। মানুষ সচেতন মনে যা কামনা করে অথচ পায় না, অবচেতন মনে স্বপ্নে তাই পেয়ে থাকে। স্বপ্ন মধুর কিন্তু ক্ষণিক। আর ক্ষণিক বলেই স্বপ্ন ভেঙে গেলে বেদনা বাড়ে। স্বপ্নে প্রেমের মিলনে কোন বাধা নেই। প্রেমিক-প্রেমিকা প্রত্যেকেই মনের মতো করে তাদের নিজেদের আকাক্সক্ষার পরিতৃপ্তি ঘটায়। নজরুল এক্ষেত্রে প্রেমের বাস্তব দিকটাই তুলে ধরেছেন। স্বপ্নই প্রেমকে বাঁচিয়ে রাখে, কলুষ ও লাভ-লোভ-স্বার্থের উর্ধ্বে রাখে। স্বপ্নালোকের দেশে হাবিব-ফিরোজার মিলন ঘটিয়ে নজরুল প্রেমের আশারবাণী শুনিয়েছেন। প্রেমের একটা প্রাপ্তি আছেই। পার্থিব প্রাপ্তি সাধারণত মহৎ প্রেমে ঘটে না কিন্তু অপার্থিব প্রাপ্তিতে কোন বাধা নেই। 

নাটকের তৃতীয় দৃশ্য সংঘটনের স্থান আবারও বাস্তব পৃথিবী। মির্জা সাহেব মেয়ের প্রেমের স্বীকৃতি দিলেন। স্ত্রী হলিমাও নতুন করে ভালবাসে তার স্বামীকে। ফিরোজা বলেছে, ‘তোমাদের আজ বিয়ে হল। নারী-পুরুষের দাম্পত্য জীবনে প্রেমের স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশ থাকতে হবে। মির্জা সাহেব মেয়ের প্রেম মেনে নিয়ে নিজেও প্রেম পেল। ফিরোজা যখন জানতে চাইল, মা, তুমি আব্বাকে খুব ভালবাস? হালিমা হেসে বলল, ‘আজ তোর সাথে সাথে প্রথম ভালবাসলুম। হাবিবের ঘরের জানাল বন্ধ দেখে ফিরোজা শংকিত হয়ে ওঠে। তার দেখা স্বপ্ন মিলে যায়। ফিরোজার বিশ্বাস, হাবিব নিশ্চয় স্বপ্নালোকের দেশে তাকে খুঁজতে গেছে। ফিরোজাও  ছুটে চলে স্বপ্নালোকের দেশে। ঠিক একই সময়েই পারদর্শিতার সাথে বি.এ পাশ করেছে এই সংবাদ নিয়ে হাবিব এসে দরজায় কড়া নাড়ে। ফিরোজা চলে গেছে, এ সংবাদে হাবিব ক্রন্দন-উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে চিৎকার দিয়ে ওঠে। ঝড়ের বেগে বেরিয়ে পড়ে ফিরোজার অন্বেষণে।    

চিরকালই প্রেমের পিছে পিছে রাহুর মত ঘুরে বেড়ায় স্বার্থান্বেষী মানুষেরা। সমাজ-সংসারে আর দশটি পণ্যের মতোই প্রেমের মূল্য বিচার করে বাস্তববাদীরা । মির্জা সাহেব তাদেরই প্রতিনিধি। মূলত, মির্জা সাহেব আধুনিক বিজ্ঞানকেন্দ্রিক বস্তুতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার প্রতিনিধি হিসেবে এই নাটিকায় উপস্থাপিত। মির্জা সাহেবের স্বার্থের বেড়াজালে পড়ে দুটি কোমল মনের তরুণ-তরুণীর জীবন বিপন্ন। কিন্তু প্রেমের মহত্ব এতে কমে নি। পবিত্র প্রেমের মিলনে বাধা দেওয়ার শক্তি বা সুযোগ স্বার্থান্ধ সামজ ও তার মানুষদের নেই, রূপকের আড়ালে নজরুল এ সত্যই বলেছেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রূপক নাটক ‘ডাকঘর’-এর আবহ সৃষ্টি হয়েছে নজরুলের ‘ঝিলিমিল’ নাটকে। অমল-সুধার মতোই হাবিব-ফিরোজার মধ্যেও দেখতে পাই অসীমের প্রতি আকুতি ও মুক্তির শাশ্বত ব্যাকুলতা।   

নজরুলের  রোমান্টিক চিন্তার নাটকীয় রূপ ‘শিল্পী’ নাটিকা। তিন দৃশ্যের ছোট একাঙ্ক নাটিকা এটি। বাস্তব সংসারে জীবনাচরণের প্রাত্যহিক লাভ-লোভ-স্বার্থ-সংঘাতের ও সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে থাকেন সৃজনশীল প্রতিভার অধিকারী মানুষ। শিল্পী একজন হলেও বিশ্বজনের হৃদয় আকুতি থাকে তার অন্তরে। নির্দিষ্ট স্থান-সময়ে অবস্থান করলেও শিল্পীর মন বিচরণ করে স্বর্গ-মর্ত-পাতাল জুড়ে। শিল্পীকে বাস্তব জীবনের ঘর-সংসারের চৌহদ্দিতে বাঁধতে গেলেই বন্ধনছিন্ন করে আরও বেশি করে। এমনি এক বন্ধন ভীরু  ‘শিল্পী নাটকের নায়ক শিল্পী শিরাজ। স্ত্রী লায়লি আর সব নারীর মতো শিল্পী শিরাজকে পেতে চায় একান্ত আপনার করে, প্রাত্যহিক জীবনে, দেহের সীমানায়। শিল্পী শিরাজ লায়লির মাঝে খুঁজে ফিরেছে বিশ্ব সৌন্দর্যের রহস্য, নিখিল নারীর প্রতিচ্ছবি। দুজনের ভেতরেই জমাট বাঁধে অপ্রাপ্তির দীর্ঘশ্বাস, গভীর বেদনাবোধ। দুজনের কেউ সুখি নয়। বেদনার দাহে লায়লি শয্যাশায়ী, শিল্পী শিরাজের অস্বস্তির জীবন।

লায়লি :সত্যি করে বল দেখি, তুমি বিয়ে করেছিলে কেন ?

চিত্রকর : বিয়ে করার জন্য।

লায়লি : হেয়ালী রাখ। তুমি শিল্পী, তুমি কেন আমাকে তোমার দুঃখের সাথী করে তোমার স্বচ্ছন্দ জীবনকে এমন বোঝা করে তুললে? আমি জানি আর তুমিও জান, তুমিও শান্তি পাচ্ছ না, আমিও সোয়াস্তি পাচ্ছিনে, আমাদের এই টানাটানির জীবন নিয়ে।

চিত্রকর : তুমি সেরে ওঠ, তারপর সব কথা বলব। আজ নয়।

লায়লি  : না, তুমি আজই বল। মরতেই যদি হয়, তবে ও-জিনিষটা যত তাড়াতাড়ি হয়, ততই ভাল। জীবনে অনেক টানাহেঁচড়া করেছি, মরণে আর ওটা সইবে না।

চিত্রকর : সব কথা কি সবসময় মানুষ বলতে পারে লায়লি?... আমি কি শুধু শিল্পীই? আমি কি শিরাজ নই ? বিয়ে তোমায় করেছে মানুষ- শিরাজ, শিল্পী শিরাজ নয়।... তোমাতে আমাতে দ্ব›দ্ব কোনখানে, জান ? তুমি চাও শুধু মানুষ- শিরাজকে, শিল্পী-শিরাজকে তুমি দুচোখে  দেখতে পার না। অথচ আমি মানুষ শিরাজ যতটুকু, তার অনেক গুণ বেশী শিল্পী শিরাজ।  

মানুষ শিরাজকে পাবার লায়লির ব্যাকুল আর্তি শিল্পী শিরাজকে আরও বেশি বহির্মুখী করে তোলে। সে এখন তার বান্ধবী চিত্রার মধ্যে অন্বেষণ করে সুন্দরের অমৃত সুধা। তার নিজের ভাষায় ‘তুমি যে আমর সুন্দরের প্রতীক। আমার শিল্পী-ল²ী, ধেয়ান-প্রতিমা তুমি।’ এই সুন্দরের রহস্য অন্বেষণ শিল্পীর জীবনে নিয়তির মতোই সত্য। যদিও শিল্পী কখনই এই রহস্য ভেদ করতে পারে না। শিল্পী শিরাজ বিস্ময়ের সাথে লক্ষ করে, তার মানসী চিত্রাও মানুষ শিরাজকেই কামনা করে দেহে-মনে। এতে সে আবারও বিচলিত হয়ে ওঠে। চিত্রার কথাবার্তাতেও রহস্য ও দীর্ঘশ্বাসের সুর। দুজনের প্রত্যাশা দুধরনের, দুজনের গন্তব্যও দুদিকে, দুজনের বেদনাও দুরকম। তাদের মিলন হবে না, এই সত্য দুজনেই জানে। 

চিত্রা : তুমি এমন করে বল বলেই ত তোমায় কাছে-আরো কাছে পেতে ইচ্ছা করে-যেমন করে আমার নোটন-পায়রাগুলিকে বুকে জড়িয়ে চুমু খাই তেমনি করে।...হায় উদাসীন! তুমি আমায় বুঝবে না। তুমি বিকশিত শতদলের শোভা দেখ শুধু, বেদনার শতদল বিকশিত হয়ে ওঠে সে বেদনার কি বুঝবে তুমি?

চিত্রকর : সত্যি চিত্রা শিল্পী চাঁদপাখি- এরা আর সব  বোঝে, শুধু  বোঝে না বেদনা।

চিত্রা : তুমি পাষাণ এ্যাপোলো। তবু জিজ্ঞাসা করতে ইচ্ছে করে, সত্যি তোমার মনে আর কোন লোভ নেই? যে ফুল কাননে ফোটে, তাকে কাননেই ঝরতে দিতে চাও, মালা করে গলায় পরাতে ইচ্ছা করে না ?

চিত্রকর : না বন্ধু, ফুলের সুবাসই আমার পক্ষে যথেষ্ট, তাকে গলায় জড়িয়ে ফাঁসি পরবার সাধ আমার নেই।

চিত্রা  : আমি অন্যের হলে তোমার দুঃখ হবে না।

চিত্রকর : হবে। সে দুঃখ আমার জন্য নয়, তোমার জন্য। সুন্দর ফুল এমনি ঝরে পড়ে তা সওয়া যায়, কিন্তু তাকে জোর করে  বৃন্তচ্যুত করে কাঁটা বিধে মালা করতে দেখলে আমার কষ্ট হয়।

চিত্রা লায়লির সমধর্মা। কোন নারীই তার প্রার্থীত পুরুষকে সুদূরের কল্পনার রঙ চড়িয়ে পেতে চায় না। বাস্তবে পেতে চায়, দুবাহুর সীমানায়, নিরেট বাসনা-কামনা নিবারণের প্রয়োজনের সঙ্গী হিসেবে। যুগে যুগে শিল্পী খুঁজেছে নারীর রূপের রহস্য, নারী চেয়েছে  ভাল-মন্দের বাস্তব রক্ত মাংসের মানুষ। শিল্পী শিরাজের চিত্রার জন্য যে বেদনা, সে বেদনা সকল নারীর জন্যেও। চিত্রা যখন জানতে চাইল, একা তার জন্য কোন বেদনা নেই। তখন শিল্পী নিজেকে হৃদয়হীন উদাসিন বলেছে। কিন্তু চিত্রা চলে যাবার ক্ষণে শিল্পীর অন্তরে একটা বেদনার টান অনুভব করে। উপহার হিসেবে চিত্রার হাতে তুলে দিল শিল্পীর তুলি, যা বহু হৃদয় রক্তাক্ত করেছে। শিল্পী শিরাজ এখন বিশ্ব বেদনার ধারক। তার এ সত্য উপলব্ধি ঘটে, বাস্তবতাবর্জিত সুন্দরের কোন মূল্য নেই। বাস্তব বিশ্বের বাস্তব মানুষের আশা-নিরাশা, লাভ-লোভ-স্বার্থ-সংঘাতের-কলুষের মধ্য হতেই শিল্পীকে সুন্দরের অমৃত সুধা পান করতে হবে। তাই শিল্পীর অনিবার্য পরিণতি চির বেদনার পথে হাঁটা। শিল্পী শিরাজও এখন সেই পথের যাত্রী, যে-পথে পৃথিবীর কোটি কোটি ধূলিলিপ্ত সন্তান নিত্যকাল ধরে চলেছে, সেই দুঃখের, সেই চির-বেদনার পথে। ‘রোমান্টিক নজরুলও উপলব্ধি করেছেন, কোন শিল্পীই কখনো জীবনের সুখ-দুঃখ ব্যথা-বেদনার ঊর্ধ্বে উঠে নিছক সৌন্দর্যাভিলাষী হতে পারে না। কেননা মানুষের দুঃখ বেদনার মধ্যেই শিল্পের সৃষ্টি। ‘শিল্পী নাটকটি আমাদের কাছে এই তাৎপর্য বহন করে নিয়ে আসে।’

নজরুলের দর্শকপ্রিয় নাটক ‘আলেয়া’। নাটকটির প্রথম নাম দিয়েছিলেন ‘মরুতৃষ্ণা। পরবর্তীতে নাম পরিবর্তন করে ‘আলেয়া রাখা হয়। তিন অঙ্কের নাটক ‘আলেয়া। নাটকটি ১৩৩৮ সালের ৩রা পৌষ তারিখের রাতে প্রথম অভিনীত হয়। মূলত, মনোমহন থিয়েটারে ‘আলেয়া নাটক মঞ্চস্থ হওয়ার কথা থাকলেও তা হয়েছিল কলকাতার নাট্য-নিকেতনে। একদিন নাটকের সভাকবি মধুশ্রবার ভূমিকায় নির্ধারিত অভিনেতার অনুপস্থিতে নজরুল নিজেই অভিনয় করেছিলেন। নাটকের উপজীব্য বিষয় কি, তা নাট্যকার প্রথমেই দর্শকের সামনে খোলাখুলি বলে দিয়েছেন।

এই ধূলির ধরায় প্রেম ভালবাসা- আলেয়ার আলো। সিক্ত হৃদয়ের জলাভূমিতে এর জন্ম। ভ্রান্ত পথিককে পথ হতে পথান্তরে নিয়ে যাওয়াই এর ধর্ম। দুঃখী মানব এরই লেলিহান শিখায় পতঙ্গের মত ঝাঁপিয়ে পড়ে।

তিনটি পুরুষ, তিনটি নারী- চিরকালের নর-নারীর প্রতীক- এই আগুনে দগ্ধ হল, তাই নিয়ে এই গীতি- নাট্য।

                                           তিনটি পুরুষ

                              মীনকেতু- রূপ- সুন্দর

                               চন্দ্রকেতু- মহিমা- সুন্দর, ত্যাগ-সুন্দর

                                উগ্রাদিত্য- মুক্তি- মাতাল

                                         

                                              তিনটি নারী

কৃষ্ণা- চিরকালের ব্যর্থ- প্রেম, জীবনে সে কাউকে ভালবাসতে পারলে না-এই তার জীবনের পরম দুঃখ।

জয়ন্তী- যে-তেজে যে-শক্তিতে নারী রানী হয়, নারীর সেই তেজ সেই শক্তি।

চন্দ্রিকা-চিরকালের কুসুম পেলব প্রাণ-চঞ্চল নারী, যে শুধু পৌরুষ-কঠোর পুরুষকে ভালবাসতে চায়। মরুভুমির পরে বনশ্রী, সংগ্রামের শেষে যে কল্যাণ, এ সেই। এরই পশু-নর মানুষ হয়, মৃত্যু-পথের পথিক প্রাণ  পায়।

নারীর হৃদয় এবং পুরুষ হৃদয়ে প্রেমের স্বরূপও নাট্যকার নজরুল নাটকের প্রথমেই বিশ্লেষণ করেছেন :

 নারীর হৃদয়- তাদের ভালবাসা কুহেলিকাময়। এও এক আলেয়া। এ যে কখন কাকে পথ ভোলায় , কখন কাকে চায়, তা চির-রহস্যের তিমিরে আচ্ছন্ন।

যাকে সে চিরকাল অবহেলা করে এসেছে, তাকেই সে ফিরে পেতে চায় তার চলে যাওয়ার পর। যাকে সে চিরকাল চেয়েছে সেই তখন তার চলে-যাওয়া প্রতিদ্ব›দ্বীর পিছনে পড়ে যায়।

পুরুষও তেমনি হৃদয় হতে হৃদয়ান্তরে তার মানসীকে খুঁজে ফেরে। তাই তার কাছে আজকার সুন্দর, কাল হয়ে ওঠে বাসি। হৃদয়ের এই তীর্থ-পথে তার যাত্রার শেষ নেই। তাই সে এক মন্দিরে পূজা নিবেদন করে আর মন্দিরের বেদীতলে গিয়ে লুটিয়ে পড়ে।

হৃদয়ের এই রহস্য মানুষকে করেছে চির-রহস্যময়, পৃথিবীকে করেছে বিচিত্র সুন্দর।

“আলেয়া” তারির ইঙ্গিত।

গান্ধার-রাজার প্রমোদ উদ্যানে বহুদেশের সুন্দরী তরুণীর সমাহার ঘটিয়েছে রাজা মীনকেতু। বসরার গোলাব, ইরানি নার্গিস, বঙ্গের শেফালিকা, চীনের চন্দ্রমল্লিকা প্রভৃতি। আন্তর্জাতিক সুন্দরের পূজারী রাজা মীনকেতু একজন কামার্ত- ভোগলিপ্সু পুরুষ, যৌবন দেবতা। তার নারী তৃষ্ণা অসীম। সে আরও নারী চায়, আরও। তার প্রমোদ কাননের চোখ ধাঁধাঁনো বিচিত্র রূপসীদের পাশাপাশি মদালসার মতো কুৎসিত নারীও সুন্দরীর মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত। সব সুন্দরের মোহ কেটে গেলে মীনকেতু তার কাছেই যাবে সুন্দরের খোঁজে। মীনকেতুর সকল আয়োজন সুন্দরের তৃষ্ণা নিবারণের নিমিত্তে। তার প্রমোদকাননের সুন্দরী তরুণীরা সন্ধ্যায় তাদের রূপ-যৌবনের সুভাস নিয়ে ফোটে, তার বুভুক্ষু তৃষ্ণা নিবারণ করে রাতে, আর সকালেই বাসি ফুলের মতো ঝরে পড়ে। কারণ, সে চির যৌবনের দেবতা। আর বাসি ফুলে যৌবন দেবতার পূজা হয় না। তার যুক্তি, ফুল ফুটলে ওকে যেমন মালা গেঁথে সার্থক করতে হয়, তেমনি রাত্রি শেষে সে মালা ফেলেও দিতে হয়। তার প্রমোদকাননের নারীর নিয়তিও মালায় গাঁথা ফুলের মতোই। রাতের বাসি ফুলের মালা আঁকড়ে যারা থাকে তার বিচারে তাদের যৌবনও মরে গেছে। তার এই কাজকে প্রধানমন্ত্রী কৃষ্ণা চরম নিষ্ঠুরতা, হৃদয়হীনতা, মনুষ্যত্ব বিবর্জিত বললে, সে বলেছে, ‘আমি মনুষ্যত্বের পূজা করি না, কৃষ্ণা। আমি যৌবনের পূজারী! ফুল আর হৃদয় দলে চলাই আমার ধর্ম। তাই গতরাতে তার অনুরাগে যে নারী বিকশিত হয়েছে, সেই সকালে ফুলমালা নিয়ে এলে নিষ্ঠুর আচরণ করে ফিরিয়ে দিল মীনকেতু :

মেয়েটি : রাজা, কাল রাতে তোমার অনুরাগ দিয়ে আমায় বিকশিত করেছিলে । আমার সে বিকশিত ফুলের অর্ঘ্য তোমায় দিতে এসেছি। তুমি বলেছিলে...

মীনকেতু : (হাসিয়া) সুন্দরী, রাত্রে তোমায় যে কথা বলেছিলুম, তা রাত্রের জন্যই সত্য ছিল। দিনের আলোকেও তাহা সত্য হবে এমন কথা ত বলিনি। রাত্রে যখন কাছে ছিলে, তখন তুমি ছিলে কুমুদিনী, আমি ছিলুম চাঁদ। এখন দিন যখন এল, তখন আমি হলুম সূর্য, তুমি এখন সূর্যমুখী, কমলের! যাও! চলে যাও! বিকশিত হয়েছ, এখন সারাদিন চোখ বুঁজে থেকে সন্ধ্যেবেলায় ঝরে পড়ো ! যাও! ম্লনমুখে দু’চোখ ঢাকিয়া মেয়েটির প্রস্থান)

মীনকেতুর রাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কৃষ্ণাও একজন নারী। প্রধানমন্ত্রীত্বের এই পদকে কৃষ্ণা নারীত্বের অপমান বলেই মনে করে থাকে, ‘আমি জানি সম্রাট, নারী জাতিকে অবমাননা করার জন্যই আমায় একজন নারীকে-আপনার রাজ্যের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব দিয়ে বিদ্রƒপ করছেন। অথবা এ হয়ত আপনার একটা খেলা! কিন্তু সম্রাট আপনার যা খেলা, তা হয়ত অন্যের মৃত্যু!’ তাই কৃষ্ণা প্রধানমন্ত্রী হয়েও নিশীথিনী। রাজার কাছে নীরবে আসে নীরবেই চলে যায়। মীনকেতুর ভুলে যাওয়া শৈশব সাথী প্রধানমন্ত্রী কৃষ্ণা। রাজার প্রমোদ কাননের আর সব নারীর মতো সে নিজেও মীনকেতুর প্রেমের কাঙাল। দুর্বার আকর্ষণ অনুভব করে অন্তরে। যদিও কৃষ্ণার কাছে রাজা মীনকেতু সুদূরের আকাশের কলঙ্কিত চাঁদের মত, আলেয়ার মত, মায়ামৃগের মত ছলনা। কেননা এই যৌবন দেবতাকে কৃষ্ণা ভাল করেই চিনেছে এবং জেনেছে। বিশেষ কোন নারীর জন্য সে নয়। নারীর হৃদয় দলে যাওয়াটাই তার ধর্ম। তারপরও কৃষ্ণার জীবনের পরম আনন্দ হল, এই মিথ্যা মায়ার পেছনে, ছলনার পেছনে ঘুরে ফেরা। কৃষ্ণা প্রধানমন্ত্রীর মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করলেও প্রেমের ক্ষেত্রে রাজার প্রমোদকাননের নারীদের সমধর্মা। প্রেমের ক্ষুধা নিষ্ঠুর, নিমর্ম, দুর্নিবার-অপ্রতিরোধ্য। পুরুষের প্রেমের এত নিষ্ঠুরতা, অস্থিরতা স্বচক্ষে দেখেও কৃষ্ণার প্রবল আকর্ষণ, বাস্তবে প্রেমের সর্বগ্রাসী রূপেরই প্রতিফলন ঘটেছে।

রাজ্যের প্রধান সেনাপতি চন্দ্রকেতু কৃষ্ণার প্রেম প্রার্থী। সে কৃষ্ণার শৈশব সাথী। প্রেম বঞ্চিত কৃষ্ণা রাজা মীনকেতুকে বলেছিল, নিষ্ঠুর, হৃদয়হীন, মনুষ্যত্বহীন। কৃষ্ণাকেও একই অপবাদ দিল সেনাপতি চন্দ্রকেতু ‘কৃষ্ণা কি নিষ্ঠুর তুমি। প্রকৃতঅর্থে প্রত্যেক প্রেমিক-প্রেমিকাই পরস্পরের কাছে একই সঙ্গে পাষাণ ও কোমল, দস্যু ও বন্ধু। চন্দ্রকেতু ও কৃষ্ণা দু’জনের অন্তরেই প্রার্থীত প্রেম না পাওয়ার বিষাদ বেদনা। চন্দ্রকেতুর হাতে আছে তরবারি আর বাহুতে শক্তি। জোর করে কৃষ্ণাকে ছিনিয়ে নিতে পারত সে কিন্তু তা সে করবে না। হৃদয় দিয়েই জয় করতে চায়।

কৃষ্ণা :   যুদ্ধ- জয় আর হৃদয়-জয় সমান সহজ নয় সেনাপতি ।

চন্দ্রকেতু : বেশ কৃষ্ণা, আমিও না-হয় হৃদয়ের ওই রাঙা রণভূমে পরাজিত হয়েই লুটিয়ে পড়ব! কিন্তু সেই পরাজয়ই হবে আমার শ্রেষ্ঠ যুদ্ধজয়। আমি জানি আজ আমি যেমন করে তোমার পায়ে লুটিয়ে পড়ছি তুমিও সে দিন পরাজিত- আমার বিদায়- পথের ধুলোয় লুটিয়ে পড়বে; কিন্তু সে দিন আমি তোমারই মত উপেক্ষা করে চলে যাব নিরুদ্দেশের  পথে।

কৃষ্ণা চরিত্রের মধ্যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘রক্তকরবী নাটকের নন্দিনীর কিছুটা ছায়া দৃশ্যমান। নন্দিনীর মতোই নারী হৃদয়ের চিররহস্যে ঘেরা কৃষ্ণার হৃদয়। নন্দিনী যেমন শক্তির প্রতীক রাজার প্রতি আকর্ষণ আনুভব করে, আবার অনাথ রঞ্জনের প্রতিও। একদিকে প্রেমের প্রতীক রাজা মীনকেতু এবং অন্যদিকে শক্তির প্রতীক প্রধান সেনাপতি চন্দ্রকেতুর প্রেমের দ্বৈত অনুভূতি কৃষ্ণাকে অন্তর্দ্বন্দ্বে ফেলে দেয়। আর কৃষ্ণার এই দ্বন্দ্বই ‘আলেয়া’ নাটকের নাটকীয় পরিবেশ সৃষ্টি করেছে অনেকাংশে।

কৃষ্ণা চরিত্র নাটকীয় পরিবেশ সৃষ্টি ও দ্বন্দ্ব সংঘাতের অনেকখানি সহায়তা করেছে। তার অন্তরের দ্বৈত অনুভূতি-একদিকে শক্তি, সৌন্দর্য ও বিরাটত্বের প্রতি আকর্ষণ, অন্যদিকে চন্দ্রকেতুর প্রেমের প্রতি মানবিক দুর্বলতা অনেকখানি জীবন্ত ও স্বাভাবিক করে তুলেছে। তার হৃদয়ের আত্মিক সত্তার অন্তদ্বর্›দ্ব, আলেয়া নাটকে অনেকখানি শিল্প চাতুর্য দান করেছে।

রাজা মীনকেতুর গান্ধা-রাজ্যে আক্রমণ করেছে যশলক্ষ্মীর মায়াবিনী রানী জয়ন্তী। বিরাট তেজ ও শক্তির অধিকারী রানী। তার এই রাজ্য আক্রমণের উদ্দেশ্য রাজ্য জয় নয়। রাজাকে জয় করা এবং নারীর শক্তির পরীক্ষা দেওয়া। রানী জয়ন্তী নিজেই বলেছে :

হাঁ, মীনকেতু গর্ব করে ঘোষণা করেছিল সে নিখিল পুরুষের প্রতীক। যৌবন- সাম্রাজ্যের সম্রাট। ফুল আর হৃদয় দলে চলাই নাকি ওর ধর্ম। আমি জানাতে চাই, যৌবন শুধু পুরুষের নাই। ওদের যৌবন আসে ঝড়ের মত, তুফানের মত বেগে ; নারীর  যৌবন আসে অগ্নিশিখার মত রক্তদ্বীপ্তি নিয়ে। আমি জানাতে চাই, পুরুষের পৌরুষ দুর্দান্ত যৌবনকে যুগে যুগে নারীর যৌবনই নিয়ন্ত্রণ করেছে। নারীর হাতের লাঞ্ছনা-তিলকই ওদের নিরাভরণ রূপকে সুন্দর করে অপরূপ করে তুলেছে। মীনকেতু যদি হয় নিখিল পুরুষের প্রতীক, আমিও তাহলে নিখিল নারীর বিদ্রোহ ঘোষণা-তার বিরুদ্ধে-নিখিল পুরুষের বিরুদ্ধে।

রানী জয়ন্তী মরু-নটী। ঝড়ের বেগে মীনকেতুর সীমান্তবাহিনীকে পরাজিত করে রাজধানীর অভিমুখে ছুটে আসে। আক্রমণকারী একজন নারী, তাই প্রধান সেনাপতি চন্দ্রকেতু অস্ত্র ধরে নি। সহ-সেনাপতি পরাজিত হয়ে এসে যা বলেছে, তাতে রানী জয়ন্তীর বাহিনীর গতিরোধ করার শক্তি মীনকেতুর কেন, পৃথিবীর কোন সেনানিরই নেই। করণ রানী নারী নয়, মায়াবিনী ও আগুনের শিখা। মীনকেতুর পরাজিত সেনাপতিকে রানী বন্দি করে নি । সে বন্দি করবে স্বয়ং রাজাকে। আর এ জন্যই তার এই অভিযান। নারীর শক্তির কাছে চরম পরাজয়ের লজ্জা স্বীকার করতে হবে মীনকেতুকে। এ কথা জেনে রাজা মীনকেতু উচ্ছ¡সিত হয়ে ওঠে। চিরকালের চিরবিজয়নী এই নারীর অপেক্ষাতেই ছিল যৌবনরাজ। এই নারীর কাছে আত্মসমর্পণই তার বিজয়। সুন্দরের কাছে পরাজয়ের আনন্দে রাজা মীনকেতু তার দেশবাসীকেও জড়িত করেছে। রানীকে সংবর্ধনা দিতে সাম্রাজ্য জুড়ে উৎসবের আয়োজন চলে।

নারীর হাতে, সুন্দরের হাতে, এ আমারই পরাজয়, তোমাদের সম্রাটের পরাজয়, যৌবনের রাজার পরাজয়। এখনই ঘোষণা করে দাও, আমার রাজ্য জুড়ে উৎসব চলুক, আনন্দের সহস্র দ্বীপালি জ্বলে উঠুক। বলে দাও আজ তাদের রাজাকে পরাজিত করে তাদের রাজলক্ষ্মী সাম্রাজ্যে প্রবেশ করছে। আমার এই রাজসভা এখনি উৎসব প্রাঙ্গণে পরিণত হোক। রানী জয়ন্তীর প্রধান সেনাপতি উগ্রাদিত্য কুৎসিত, দানবীয় আকৃতির। রানীর বোন চন্দ্রিকা যাকে বলেছে ‘আদিকালের বর্বর’ এবং ‘বনের পশু’। তারপরেও চন্দ্রিকা উগ্রাদিত্যের দানবীয়রূপকেই ভালোবাসে। উগ্রাদিত্যের মতো শক্তির পৌরুষই নারীর কাম্য। নারী তার সাধনা দিয়ে এই শক্তিকে বশে এনে বিজায়নী দেখতে চায় নিজেকে। চন্দ্রিকা বলেছে, পাথুরে পৌরুষকে নারীত্বের ছোঁয়া দিলেই মহাপুরুষ হয়ে উঠবে। কিন্তু উগ্রাদিত্যের দানবীয় শক্তির উৎস রানী জয়ন্তী। বিনা যুদ্ধে রাজা মীনকেতুর পরাজয় রানী জয়ন্তী মানলেও উগ্রাদিত্য মানবে না। উগ্রাদিত্যের ভেতরের কুৎসিত-লোভাতুর রূপ, এ সত্য জানতে পেরে ক্ষুব্ধ রানী আত্মরক্ষার্থে তলোয়ার তুলে দিল রাজা মীনকেতুর হাতেই। উগ্রাদিত্য পরাস্ত হয় এবং প্রাণ হারায় মীনকেতুর হাতে। উগ্রাদিত্যের মৃত্যুর পরেই রানী  জয়ন্তীর ভাবান্তর ঘটে। কারণ উগ্রাদিত্যই ছিল তার শক্তি, লোভ ও ক্ষুধা। আর এই শক্তি-ক্ষুধা নিয়েই রাজা মীনকেতুকে জয় করতে এসেছিল সে। উগ্রাদিত্যের জাগতিক ক্ষুধা-তৃষ্ণা মিশ্রিত পৌরুষ এবং রাজা মীনকেতুর সর্বগ্রাসী প্রেম, এই দুই-ই চায় জয়ন্তী। রাজাকে জয় করে প্রেম পাওয়ার পথ সুগম হলেও উগ্রাদিত্যকে হারিয়ে সেই প্রেমের ক্ষুধা-তৃষ্ণা-লোভ আর নেই। সে এখন ভাগ্যবিড়ম্বিতা রিক্তা সন্ন্যাসিনী। মুহূর্তেই রানী জয়ন্তী হয়ে গেল মণিহারা শাপের মতই শক্তি হারা এক সামান্য নারী। তাকে নিয়ে রাজা মীনকেতু সুখি হতে পারবে না। নাটকের শেষে চন্দ্রিকা এসে জানাল, উগ্রাদিত্যের প্রাণ প্রতিষ্ঠার তপস্যা সে শুরু করেছে। রানী জয়ন্তী ফিরে গেল বটে কিন্তু সেই দুর্বার প্রবৃত্তির তাড়না জাগলে আবার আসার প্রত্যয়ও জাগিয়ে গেল। এ প্রসঙ্গে আবদুল কাদিরের মূল্যায়ন তাৎপর্যপূর্ণ:

কিন্তু এই পৃথিবীর সর্বত্রই দেখা গেছে, জয়ন্তীরা প্রবৃত্তিরূপিনী হয়ে মত্তদর্পে একাধিপত্য দাবী করে, তখন সেই কুৎসিত উগ্রাদিত্যটা রুচি-সুন্দর পুরুষের তীব্র আঘাতে অন্তর্ধান করে। উগ্রাদিত্যটাকে সম্পূর্ণ বশীভূত করতে পারে যে জয়ন্তীরা, তারাই হয় মীনকেতুদের হৃদয়-রানী, তারা যেমন নর্মবধূ, তেমনই মর্মবধূ ; যেমন কামনার সহচরী, তেমনই আত্মার আত্মীয়। মুহূর্তের জন্য প্রবৃত্তির ঐশ্বর্য হতে কোন নারী যদি হয় রিক্তা, সেই শক্তির পুনরাবির্ভাবে নারী হয় আবার পুরুষের জীবন-ক্ষ্মী। পুরুষের পৌরুষ এবং নারীর প্রবৃত্তি, এ দুইয়ের ভূমিকা নাটিকাটিতে অপূর্ব রসমূর্তি লাভ করেছে। 

‘আলেয়া নাটকটিকে অনেকেই রূপক-সাংকেতিক নাটকের পর্যায়ে ফেলে থাকেন। প্রফেসর রফিকুল ইসলাম বলেছেন ‘এক অর্থে ‘আলেয়া’ নাটকটিও রূপক, যৌবন ও সৌন্দর্যকে চিরদিন ধরে রাখা যায় না, কায়াহীন ভালবাসা নিয়ে যারা তৃপ্ত নয় তারা চিরদিন যৌবন ও সৌন্দর্য্যরে পূজারী। মীনকেতু পৌরুষের প্রতীক আর সৌন্দর্য্যরে প্রতীক জয়ন্তী চিরন্তন নারীর প্রতীক এই দুই শক্তির সংঘাতের ফল মিলন নয় বিচ্ছেদ।’  রূপক-সাংকেতিক নাটকে যে অসীমের তৃষ্ণা এবং গানে ও কথায় মিস্টিক পরিবেশ তৈরি হওয়ার কথা, তেমনটি হয়ে ওঠে নি ‘আলেয়া’ নাটকে। তবে কৃষ্ণার রহস্যময় আচরণে এবং রাজা মীনকেতুর সৌন্দর্য উপভোগের অতৃপ্ত মনোভাবের মধ্যে কিছু পরিমাণ রূপক ব্যঞ্জনা বিদ্যমান।

‘আলেয়া’ নাটিকার অন্যতম ঐশ্বর্য হল গান। নাটকের ২৮টি গানের প্রত্যেকটিই নাট্যকাহিনি রূপায়ণে সহায়তা করেছে। ‘আলেয়া’ নাটকের অভিনয় দেখে বুদ্ধদেব বসু যে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছিলেন, তা তাৎপর্যপূর্ণ।

বাঙালী গীতিরসিক জাতি। গান না থাকলে বাঙলা নাটক চলে না... নাট্যনিকেতন পুরনো প্রথা লংঘন করে নিজস্ব নূতনরীতি প্রতিষ্ঠা করতে উদ্যোগী। তাই সেখানে যখন গীতিনাট্য খোলা হল আমরা দেখতে পেলাম নজরুল ইসলামের আলেয়া। গীতিনাট্য লেখার যোগ্যতা জীবিত বাঙালী লেখকের মধ্যে নজরুল ইসলামের চেয়ে বেশী আর কারো নেই। প্রথমতঃ তিনি কবি, তা ছাড়া তিনি সুরশিল্পী। বাঙলা সঙ্গীতে তিনি সম্পূর্ণ একটি নূতন ঢং প্রবর্তন করেছেন। হিন্দী রাগরাগিনী ভেঙে, মিশিয়ে নানারকম সুর সৃষ্টি করতে তিনি ওস্তাদ। এই নজরুলের আলেয়া এমন একটা জিনিষ হয়েছে যা অত্যন্ত যড়ি নৎড়ি থেকে আরম্ভ করে সাধারণ দর্শক পর্যন্ত সবাই উপভোগ করেছেন, আলেয়া রূপক নাট্য; তার বিষয় বস্তু হচ্ছে নরনারীর প্রেম। গল্পাংশ খুব ক্ষীণ; বহু গানের মাঝে মাঝে অল্প ডায়ালগ ছড়ানো। টেকনিকের দিক থেকে একেবারে খাঁটি সঁংরপধষ পড়সবফু গানগুলির ভাষা আর সুর দুই অনিন্দ্যনীয়। নজরুলের যেটুকু  তিনি খুব ভালো করেই করেছেন।   

 

কাজী নজরুল ইসলামের সর্বাধিক জনপ্রিয় এবং অভিনীত নাটক ‘মধুমালা’। পূর্ববঙ্গে প্রচলিত পল্লির রূপকথার কাহিনি অবলম্বনে রচিত নাটকটি। তবে কাহিনিকে নজরুল মনের মতো আধুনিক অপেরা জাতীয় নাটকের উপযোগী করে গড়ে তুলেছেন। বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র  ‘নাট্য ভারতী’র জন্য ভাল নাটকের সন্ধান করছিলেন। এ সময় নজরুল ‘মধুমালা’ নাটকের পাণ্ডুলিপি তাঁর হাতে তুলে দেন। নাটকটিতে সংযোজিত গানের সুরারোপ করেছেন নজরুল নিজেই। বিখ্যাত রঙ্গশিল্পী মনীন্দ্রনাথ ঘোষ (নানুবাবু) পালন করেছিলেন নাটকটির দৃশ্যপট ও আলোক নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব। শ্রীমতী রাধারাণী ও শ্রীমতী হরিমতী ছিলেন প্রধান গায়িকা। এছাড়া ‘সে যুগের নৃত্যগীত-কুশলা অভিনয়দক্ষা’শ্রীমতী সাবিত্রী মধুমালার ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন। আর রাজপুত্রের ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন জহর গাঙ্গুলী। জানা যায়, চল্লিশ রাত মঞ্চস্থ হয়েছিল নাটকটি। নাট্যভারতীর উদ্যোগে ১৯৪৫ খ্রিস্টাব্দে হ্যারিসন রোডে আলফ্রেড মঞ্চে (পরে মঞ্চটি গ্রেস সিনেমায় রূপান্তর হয়) অভিনীত হয়। বলাবহুল্য, নাটকটি ব্যাপক দর্শক প্রিয়তা পেয়েছিল। বিয়োগাত্মক কাহিনি, গতিশীল সংলাপ, গানের সুরের মুর্ছনা সব মিলিয়ে দর্শক নাটকটি দেখে মুগ্ধ না হয়ে পারে নি। বিনয়কৃষ্ণ ভদ্রের বক্তব্য এক্ষেত্রে উদ্ধারযোগ্য :

একথা আমি নিঃসন্দেহে বলতে পারি, বিদগ্ধ সমাজ কাজী সাহেবের এই গীতিনাট্য দেখে বিমুগ্ধ হয়ে আমাদের অবিমিশ্র প্রশংসা করে গেছেন এবং সে-সময় সঙ্গীত রসিক ও শিল্পবোধ সম্পন্ন দর্শক মহল অজস্র অভিনন্দন দিয়েছিলেন আমাদের।

 মধুমালার কথা, পরীদের গান, সংলাপের ভাষা সব কিছু মিলিয়ে-এক মোহময় স্বপ্নাবেশ সূচনা হতো প্রেক্ষাগৃহে। কবির রচনা যে  সার্থক হয়েছিল তা সকলেই স্বীকার করে যেতে বাধ্য হয়েছিল। ‘মধুমালা’ চমৎকার রোমান্টিক নাটক। নাট্যকার নজরুল প্রেমের সুমহান রূপ আঁকতেই মূলত লোক কাহিনিকে বেছে নিলেন। হিমালয়ের পাদদেশে বিশাল বনভূমিতে চৈতালি চাঁদনি রাতে নাটকের প্রথম দৃশ্য রূপায়ণ হয়েছে। এটা পরির রাজ্য। ঘুমপরি ও স্বপনপরি  এ রাজ্যের বাসিন্দা। তারা দু’জনেই নাটকে প্রেমের দূতীর ভুমিকা পালন করে থাকে। তবে এই দুই পরি নিজেরাও যৌবনাবতী। তারা দুজনেই রূপ কুমারের প্রার্থনা করে। যে রূপকুমার দস্যুর মত এসে লুটে  নেবে তাদের কুণ্ঠিত প্রেম। এরি মধ্যে ভুল করে এই মায়াপুরীতে শিকারে আসে কাঞ্চন নগরের যুবরাজ মদনকুমার তার সৈন্য সামন্তসহ। ‘একহাতে মালা তার একহাতে তরবারি’ সমেত ঘুমন্ত কুমারকে দেখ মায়াপুরীর পরীদ্বয় অভিভূত হয়। মানব সন্তান  মদনকুমারের রূপে দু’জনেই মুগ্ধ হয়ে পড়ে।

 স্বপনপরী : (মুদ্রিত যুবককে দেখাইয়া) কি অপরূপ রূপ দেখেছিস ঘুমপরী?

                                       গান

 এরি লাগি তপস্যা কি করে আঁধার রাতি।

 সই দেখলো চেয়ে রূপ সায়রে জ্বলে এ কোনবাতি

 লক্ষ চাঁদের জ্যোস্না হেথা কে রেখেছে পাতি?

    ঘুমপরী : সত্যি স্বপনপুরী! এই পৃথিবীর পাঁকে এমন নন্দন পারিজাত কেমন করে ফুটল তাই ভাবছি। (দীর্ঘনিঃশ্বাস)                        

                                                  গান

 যেন দুধের সাগরে ননী দিয়ে তৈরি লো এর গো

 পৃথিবী কি শিউরে ওঠে এ রাখে যখন পা । 

যুবরাজ  মানব সন্তান। বিধায় তাকে গ্রহণ করতে পারে না দু’জনের একজনেও। ঘুমপরি আগ্রহ প্রকাশ করলেও স্বপনপরি বলেছে, মানব পুত্রকে ভালবাসলে পরিকুলের কলঙ্ক রটে যাবে। কেননা ‘মাটিতে ওদের জন্ম, ওদের বাইরে ভিতরে ধুলোর আবর্জনা।’ ‘বিধাতার বিলাসলক্ষ্মী মদনকুমারের রূপের প্রশংসা উন্মুখ দুই পরিই বিতর্কে জড়িয়ে পড়ে, এর চেয়ে সুন্দর হতে পারে কি না। তুলনা করতেই দুই পরী ময়ূরপক্ষী বিমান চড়ে ঘুমন্ত কুমারকে নিয়ে গেল চারদিকে সাগর ঘেরা স›দ্বীপের রাজকুমারী মধুমালার কাছে। ঘুমন্ত মধুমালার পাশে শুইয়ে রাখল ঘুমন্ত রাজকুমারকে। দুই মানব নর-নারীর রূপের জ্যোতিতে মুগ্ধ পরিরাও। এখানে নাট্যকার  দেখিয়েছেন,  রূপ তৃষ্ণা পরী ও মানুষের অভিন্ন। যে কারণেই দুই মানব-মানবীর মিলন দৃশ্য দেখে পরি রাজ্যের দুই যুবতীর মধ্যে প্রেমের উন্মাদনা জেগে উঠেছে। তাদের দেহের মধুর জ্বালা অনুভব এবং অন্তরে খেলে যাওয়া ঢেউ একান্তই মানবিক। ঘুমপরি বলেছে, ‘মোর বুকের মাঝে সাত সিন্দুর এ কি ঢেউ উথলে’। নাট্যকার বলতে চেয়েছেন, যৌবন যন্ত্রণা অনন্তকালের সর্ব প্রাণির।

নিদ্রিত রাজকন্যা মধুমালার ঘুম ভাঙলে পাশে দেখতে পেল অচেনা পুরুষ শায়িত। আত্মরক্ষার জন্যে হাতে তুলে নিল তরবারি। কিন্তু ঘুমন্ত রাজকুমারের চাঁদমুখ দেখে মুহূর্তেই তরবারি পড়ে গেল সশব্দে। ঘুম ভেঙে গেল রাজকুমারেরও। মৃদভাবে মধুমালা ‘চোর’বলে অভিহিত করলেও  মনে মনে খুশিই হয়। তার প্রমাণ, কোন ভণিতা না করেই অন্তরের অনুরাগ প্রকাশ করেছে এবং প্রেমের প্রস্তাব দিয়েছে। দু’জনের প্রথম পরিচয়ে প্রেম নিবেদনের নাটকীয় কৌশল আধুনিক কোন তরুণ-তরুণীর প্রথম প্রেম নিবেদনের মতোই চমকপ্রদ্।

মদনকুমার : আমি সত্য বলছি- আমায় বিশ্বাস কর দেবী, আমি চোর নই-দেব নই, মায়াবী নই-আমি এই পৃথিবীর মানুষ। আমি কাঞ্চন নগরের যুবরাজ- আমার নাম মদনকুমার। আমার পিতার নাম রাজাধিরাজ দণ্ডধর। আর তুমি- তুমি কে? আমি কি স্বপ্নে চাঁদের দেশে এসেছি? তুমি কি চাঁদের দেশের রাজকন্যা?

 মধুমালা : (বালিকার মত চঞ্চল হাসি হাসিয়া ফুলের পর ফুল ছড়াইতে ছড়াইতে বলিতে লাগিলেন) আমার নাম মধুমালা - আমি সন্দ্বীপের রাজকন্যা - আমার পিতার নাম মহা-রাজাধিরাজ তাম্বুল।

              (রাজপুত্র এইবার নির্ভয়ে হাসিয়া উঠিলেন)

 মদনকুমার : কিন্তু, আমি এখানে এতদূরে তোমার দেশে এই সাগর-ঘেরা দ্বীপে  এলুম কি করে? আমরা বোধ হয় স্বপ্ন দেখছি, না ?

 মধুমালা  : স্বপ্নই যদি হয় -তবে এ মধুর স্বপ্নকে মধুরতর করে নিতে বাধা কি বন্ধু? একটু পরেই ত স্বপ্ন যাবে টুটে -দিনের ফুল উঠবে ফুটে- তুমি চলে যাবে তোমার দেশে আর- আর আমি কাঁদব ঐ সাগরের সাথে চিরদিন চিররাত্রি।

 মদনকুমার: না, না, ও কথা বলো না ! (হাত ধরিতে গিয়ে পিছাইয়া আসিল) আমাদের এই রাত্রি আর শেষ হবে না, স্বপ্ন আর টুটবে না- সেই আশার কথা বল।

 মধুমালা  : তুমি কাছে এসে চলে গেলে কেন? ধর, আমার, হাত ধর, আমার বুক কাঁপছে। মাঝে মাঝে সমুদ্রের গাঙচিল সিন্ধুপোতর ডেকে উঠেছে আর আমার মনে হচ্ছে এখনই বুঝি প্রভাত হয়ে যাবে। (বাতায়নে গিয়া) ঐ দেখ এখনো শুকতারা ওঠে নি- ধর, আমার হাত ধর।

প্রেমের অনুরাগ প্রকাশের ক্ষেত্রে মদকুমারের চেয়ে মধুমালা চৌকস। বুদ্ধিমতী ও সুচতুর এই রাজকুমারী হঠাৎ পাওয়া এই দুর্লভ প্রাপ্তিকে হাত ছাড়া করতে নারাজ। তাই সে-ই  প্রস্তাব করল ‘তুমি আমার বর হও’। এছাড়া অনেকটা স্বউদ্যোগেই মালাবদল করে নিল। মদনকুমার কিছুটা সংকোচগ্রস্ত হলেও মধুমালা কিন্তু পরিপূর্ণ স্বাভাবিকভাবে এ কাজ করেছে। মধুমালা রূপকথার কোন কাহিনির নায়িকা হলেও প্রেমে প্রকাশের ক্ষেত্রে এবং প্রেমের স্বীকৃিতদানের ক্ষেত্রে একবিংশ শতাব্দীর কোন শিক্ষিত মেয়েকেও হার মানিয়েছে।

স্বপ্নের এই মিলন টিকে না বেশি সময়। ‘বিরহের আগুনের পুড়ে ওদের প্রেম খাঁটি হবে’-এই কথা বলে আবার পরিরাই বিচ্ছেদ ঘটিয়ে দিল। ঘুম ভেঙে গেলে দেখে দু’জনেই স্ব অবস্থানেই আছে।  অথচ মিলনের বেশ কতগুলো চিহ্ন রয়ে গেছে তখনও। স্বপ্ন ভেঙে গেলেও তাদের মালাবদল, আংটি বদলের চিহ্ন, সোনার পালঙ্ক সবই বাস্তবের মতোই রয়ে গেল। ফলে স্বপ্নই হয়ে গেল বাস্তবের মতো সত্য। শুরু হয় বিচ্ছেদ বিলাপ। দ্রæত মায়াপুরী ছেড়ে মদনকুমার তার বাহিনীসহ রাজপ্রসাদে ফিরে এল। উদ্ভ্রান্ত মদনকুমারের উন্মাদের মতো প্রলাপ ‘মধুমালা! মধুমালা! আমার মধুমালা।’ এবং রানী পাটেশ্বরীর বিলাপ কাঞ্চননগর রাজপ্রসাদে এক শোকাবহ পরিবেশের সৃষ্টি হয়। একমাত্র সন্তানের এই বিরহ কাতরতা দেখে চিন্তিত রাজা দেবতার আদেশে সপ্তডিঙাসহ ছেলেকে সমুদ্রজলে ভাসিয়ে দিল। রাজ গায়ক সেকের্ন্দা শা রাজাকে আশ্বস্ত করেছে, ‘তুমি ভয় করো না রাজা। ওর উপরে আল্লার রহম হইছে, ও জীবনে বড় পাতায় প্রেম পাইছে - মজনুর মত লায়লিকে পাইছে -ফরহাদের মত শিরীকে পাইছে - এই লায়লিকে যে পায় লা এলাকে পাইতে তার দেরি হয় না।’ কিন্তু দুর্ভাগ্য মদনকুমারকে ছাড়ল না। পথিমধ্যে ঝড়ের কবলে পতিত হয়ে সহজনদের হারিয়ে অজ্ঞান অবস্থায় ঠাঁই পেল  মগরাজ্যের রাজা চিত্র সেনের দরবারে। এখানে আবার সে নতুনতর সংকটের মুখোমুখি হয়। রাজার ‘কুব্জ পৃষ্ঠ নাকমোটা-তোতলা-হাবা-অতি কুৎসিত’ ছেলে বিচিত্র সেনের সঙ্গে ত্রিপুরার রাজকুমারী কাঞ্চনমালার বিয়ের কথা চলছে। সুচতুর রাজা মদনকুমারকে নিজের ছেলে পরিচয়ে বিয়ে দিল ত্রিপুরার রাজকুমারীর সাথে। বিয়ের পর বাসরও হল। মদনকুমার সত্য খুলেও বলল। কিন্তু তাতে লাভ হল না। কাঞ্চন মালা মনে প্রাণে তাকেই স্বামী হিসেবে বরণ করে নিল। ইতোমধ্যে মদনকুমারে মা রানী পাটেশ্বরী এবং রাজা দÐধর কাঞ্চনমালাকে পুত্রবধূ হিসেবে বরণ করেও নিল। এদিকে আবার পরিদের কারসাজিতে মদনকুমার-মধুমালার মিলন ঘটে। কিন্তু এই মিলন নিষ্কণ্টক হল না। কাঞ্চনমালা খুঁজে পেল তাদের। ফলে শুরু হয় ত্রিভুজ প্রেমের সংকট। অভিমানী মধুমালা ‘দিদি তোমাদের সংসারকে আমি লবনাক্ত করতে চাই নে।’ বলে সাগরের জলে ঝাপ দিয়ে আত্মহত্যা করলে সংকটের একটি আপাত সমাধান হয়।

 মধুমালার হঠাৎ এই পরিবর্তন শিল্পসম্মত হয়নি। মধুমালার আত্মহত্যাও যৌক্তিক সময়ে ঘটে নি। দর্শক মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকে না নায়িকার মৃত্যু দেখার জন্যে। এছাড়াও মধুমালার আরও কিছু সংলাপ দরকার ছিল। মনে হয় যেন নাটকটি অসমাপ্তই রয়ে গেল। সময়ের স্বল্পতার কারণে নাট্যকার  যেনতেনভাবে একটা পরিসমাপ্তি টেনেছেন। হঠাৎ কোন জলোচ্ছ্বাসে কিংবা সাগরের পাড় ভেঙে দৈবক্রমে যদি মধুমালার মৃত্যু হত, যে মৃত্যুতে তার নিজের কোন হাত থাকবে না। তবে নাটকের সমাপ্তি হত ক্লাসিক নাটকের আদর্শে। এতে নাটকটির মহিমাও বৃদ্ধি পেত।  

‘মধুমালা’ নাটকে নাট্যকারের মূল বক্তব্য ও উদ্দেশ্য নিহিত রয়েছে মধুমালা চরিত্রের মধ্যে। মধুমালা নাটকের কেন্দ্রিয় চরিত্র। অপ্রত্যাশিতভাবে পাওয়া অচেনা পুরুষকে যেভাবে সে প্রেমের মায়ায় বেঁধে ফেলল, তাতে প্রতীয়মান সে শুধু বুদ্ধিমতীই নয়, কৌশলীও বটে। তার বিরহ বিলাপ মদনকুমারের বিলাপের মতো অর্থহীন নয়। প্রেমের জীয়নকাঠির ছোঁয়ায় মধুমালার নব চেতনার জাগরণ ঘটে। প্রিয় মিলনের দুর্বার আকর্ষণ অনুভব করে অন্তরে। রবীন্দ্রনাথের ‘রাজা’ নাটকের সুদর্শনার মতো লাজ-ভয়-দ্বিধা মুক্ত হয়ে মিলনের জন্য প্রস্তুত হয়। সুদর্শনার মতো মধুমালাও বলেছে ‘লজ্জা? কাকে লজ্জা? ও আমার সই চন্দনা। ওকে আবার লজ্জা কিসের?’ আবার বাবাকে বলেছে, ‘আমি কিন্তু আগে থেকেই বলে রাখছি বাবা, সে এলে আমি এতটুকু লজ্জা করব না। তোমার সামনেই কথা বলবÑরাগ করব-ঝগড়া করবÑঅচ্ছা বাবা বর জিনিসটে কি খুব লজ্জার?’ মধুমালার   এই সব   মান-অভিমান একদিকে যেমন স্বাভাবিক মানবিক প্রেমের ধর্ম, অন্যদিকে ব্যঞ্জনাধর্মীও। প্রেম যখন বড় পরিসরে ঠাঁই নেয়, তখন  মানুষের প্রচলিত আবেগ-অনুভূতির তুচ্ছতামুক্ত হয়ে একমুখী হয়। তখন প্রেমিক-প্রেমিকারাও প্রেমের গন্তব্য সম্পর্কে, প্রেমের প্রাপ্তি ব্যাপারে নিশ্চিত হয়ে ওঠে। তখন তারা হয় একনিষ্ঠ, গভীর প্রত্যয়ী। রাধা-কৃষ্ণ, লাইলি-মজনু, শিরি-ফরহাদ প্রমুখের একনিষ্ঠ গভীর প্রেমের প্রাপ্তি বাহ্যিক মিলন সুখ নয়, বিরহের অনলে পোড়া অনন্ত সুখ। প্রত্যেকেরই প্রেম জ্বেলে দিয়েছে তাদের অন্তরে অনন্ত প্রেমের জ্যোতি। মধুমালার অন্তরেও প্রেমের এই জ্যোতির আবির্ভাব ঘটে থাকে। তাই তার অন্তরে প্রেমিকের আগমনী বাঁশি বেজে ওঠে। দেবতা জেগে ওঠে অন্তরে। মধুমালার নব চেতনার আত্মোপলব্ধি নিম্নরূপ :        

চাঁদ ওঠে সে কোন্ দূর আকাশে, তবু পৃথিবীর সাগরের বুকে জাগে আনন্দের-জোয়ার, সে আর তখন কূলের বন্ধন মানে না। তরঙ্গের পথ মেলে সে উড়ে যেতে চায় আকাশে। চাঁদ ওঠার খবর সাগর কি করে পায়? কোন আঁধার বনে ফোটে ফুল-ভ্রমর কেমন করে জানেত পারে? আমার চাঁদ ওঠেছে দূর-দিগন্তে, তাই ঝিলের জলের কুমুদিনীর মত আমার সারা অঙ্গে জেগেছে না-জানা আনন্দের আবেগ। গোপিনীরা কি করে শুনতে পেল কানুর বাঁশরি? আমি শুনেছি-শুনেছি আমার সুন্দর বাঁশি। নদী যেমন শুনতে পায় সাগরের ডাক, তেমনি তার প্রতিপদক্ষেপে দুলে উঠছে আমার অন্তর। দেবতা জেগেছেন, তাই আমার দেউলের দ্বোয়ার গেছে খুলে, বেদী উঠেছে দুলে।

মধুমালার প্রেমকে শাশ্বত প্রেমের প্রতিমূর্তি করে তুলতে চেয়েছেন নাট্যকার। আর তা করেছেন অনেকটা যান্ত্রিকভাবে। প্রেমের ধারাবাহিক বিকাশ হওয়ার সুযোগ হয় নি। প্রথম পরিচয়েই মধুমালা বলেছিল ‘তুমি চলে যাবে তোমার দেশে আরÑআর আমি কাঁদব ঐ সাগরের সাথে চিরদিন চিররাত্রি।’ এই পরিণতি দেবার  জন্যেই খুব দ্রæত নাট্যকার মধুমালার কণ্ঠ জুড়ে দেন ভারি ভারি প্রেমের সংলাপ। আর এতে প্রেমের বাস্তবতা নষ্ট হয়েছে। সাগর ঘেরা দ্বীপের রাজকন্যার মধুমালার প্রেম সাগরের মতোই বড়, নাট্যকারের এই পূর্ব নির্ধারিত ভাবনার প্রতিফলন ঘটেছে মধুমালার সমুদ্রে তলিয়ে যাওয়ার মধ্য দিয়ে।

কাঞ্চনমালা চরিত্রটিই ‘মধুমালা’ নাটকের সর্বাধিক বিকাশপ্রাপ্ত। কাহিনির নাটকীয়তা আনয়নে কেন্দ্রিয় চরিত্র  মধুমালার চাইতে তার গুরুত্ব অনেক বেশি। আকস্মিক দৈবদুর্বিপাকে পড়ে তার বিয়ে হয়েছে মদনকুমারের সাথে। এই দৈবদুর্বিপাকে ঘটে যাওয়া ঘটনাই তার জীবনে সত্য বলে মেনে নিয়েছে দেবতার দান হিসেবে। তাই বাসর রাতে যখন মদনকুমার বলল  ‘আমি তোমার স্বামী নয়।’ তখনও সে মানতে রাজি হল না। তার স্পষ্ট কথা, ‘এই ত্রিভুবনে আমার স্বামী আর কেউ নেই, হবে না, হতে পারে না।’ মদনকুমার তাকে ত্যাগ করে বটে, তারপরও সে পতিব্রতা স্ত্রীর মতোই স্বামীর বিরহে কাতর হয়ে ওঠে। বিশ্ববিরহিণীর ছায়া ফুটে উঠেছে তার কণ্ঠের গানে :

 তুমি হেসে গেলে বন্ধু তোমার কাঁটার পথে

 কাঁদতে আমায় দেখে গেলে একলা ফুলের রথে \

 ও পথের বন্ধু ! তোমার পথে যদি নিয়ে যেতে

 পথের কাঁটা ঢেকে দিতাম আমার এ বুক পেতে

 আজ সুখের রথে কাঁদি বন্ধু দুখের সাথী হতে

 তোমার দুখের সাথী হতে ।

কাঞ্চনমালা কেবলি ঘরে বসে থাকে না মধুমালার মতো। তার প্রেমের অধিকার প্রতিষ্ঠার পথে নামে। সখি অতসী যখন বলল, অনির্দেশ্য অচেনা পথে কোথায় সে যাবে। তখন কাঞ্চনমালা বলেছে ‘আমার প্রেম’। প্রেমের শিখা অন্তরে জ্বলে উঠলে নারী তখন দুর্গমপথও পাড়ি দিতে পারে। রাধাকে কৃষ্ণের সাথে মিলনের জন্য কাঁটা পোতা পিচ্ছিল পাহাড়ি পথ পাড়ি দিতে হয়েছে। কাঞ্চনমালা রাধার মতোই ঘর ছাড়বে। প্রেমের পাত্রটা মুখ্য নয়, প্রেমটাই মুখ্য। প্রেম পেলে প্রেমের পাত্র এমনিতেই পাওয়া যাবে।

আর আমি তাঁকে খুঁজব না। আগে খুঁজব তাঁর পথ। পথ যদি পাইÑপথের শেষে তাঁকেও পাব। শোন অতসী, ঐ দেখ আমার ফুল-সাজ সব খুলে রেখেছি। আমার শাশুড়ি জোর করে কাল এসব পরিয়ে ছিলেন। বিয়ের রাতে এমন ফুলেরি সাজে সেজেছিলুম। কালও পরে ছিলুম, ঐ আমার শেষ পরা। পরতে কি ইচ্ছে করছিল। মন্দিরে বিগ্রহ নেই অথচ নিবেদনের থালা সাজিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা। যেমন অকারণ  তেমনি করুণ।

প্রেমের ধর্ম পরিপূর্ণ আত্মসমর্পণ। প্রেম পেতে হলে নিঃশেষে আমিত্বকে বিসর্জন দিয়ে আসতে হয়। একনিষ্ঠ প্রেমের এটাই চাওয়া। এই একনিষ্ঠ প্রেমের পরীক্ষায় নামে কাঞ্চনমালা। গভীর রাতে রাজ আভরণ খুলে বিরহিণী বেশে পথে নামার সময় সে যে গানটি গাইল, তাতেও তার নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের কথাই আছে।

  তুমি এতদিনে মরণ টানে টানলে বুকের কাছে

          (ওগো বন্ধু পরান বন্ধু)

 তোমায় দিলাম তোমায় দিলাম

         ত্রিভুবনে যত কিছু আমার প্রিয় আছে।

         (ওগো বন্ধু পরান বন্ধু) \

 আমার বসন আমার ভূষণ আমার কুল মান

 আমার প্রেমের অহঙ্কার গো আমার অভিমান

 তোমায় দিলাম তোমায় দিলাম বন্ধু

 

  (আজ)সকল দিয়ে বিনিময়ে তোমায় শুধু যাচে

  দাসী তোমার তোমায় শুধু যাচে

   ওগো বন্ধু পরম বন্ধু ।

অবশেষে কাঞ্চনমালা খুঁজে পেয়েছে তার প্রেমিক পুরুষকে। নাট্যকার কাঞ্চনমালার বর্ণনা দিয়েছেন এই ভাবে, ‘একবুক সাগর জলে দাঁড়াইয়া গৈরিক বেশধারী এক সন্ন্যাসিনী। তার রূপের জ্যোতিতে আর গৈরিক বসনের, আভায় চারপাশের সব জল গেরোয়া রাঙা হইয়া উঠিয়াছে।’ এত দীর্ঘপথ পাড়ি দিয়ে আজ সন্ন্যাসিনী যার জন্যে, সেই প্রেমিক পুরুষ এখন অন্য নারীর সাথে নিবিড় মিলনের মুহূর্ত উপভোগরত। কাঞ্চনমালার আক্ষেপ, ‘সে তার পথ পেল যখন পথ হারালাম আমি তখন।’ আপাত বিচারে কাঞ্চনমালার এই একপক্ষীয় প্রেম বাঞ্চা কিছুটা বিরক্তির উদ্রেক করলেও ত্রিভুজ প্রেমের নাটকীয়তা তৈরি হয়েছে কাহিনিতে। তাছাড়া সেও নারী। নারীত্বের ঐশ্বর্য স্বামীর অধিকার সে-ই বা ছাড়বে কেন? দৈবদুর্বিপাকে হলেও বিয়েটা তো অসত্য নয়।

শোন, এই মহাসগরে শুয়ে থাকেন যে পাষাণের নরায়ণÑসেই নারায়ণ শিলাকে স্বাক্ষী করে বিবাহের দিন যা বলে ছিলাম আজও আবার তাই বলছি। তুমিই আমার স্বামী, আমার ইহলোক পরলোক জনম জনমের গতিÑপরম পতিÑআমার ধ্যান জ্ঞান তপস্যা, তোমাকেই ধ্রুবতারা করে এই মহাসাগরের মিলন মোহনায় বিনা বাঁধায় এসে পৌঁছেছি (মধুমালার দিকে ফিরিয়া) লক্ষ্মী-নারায়ণকে একসঙ্গে দেখলাম। সত্যিই মালা, তোকে দেখে মনে হচ্ছে যেন সাগর মন্থনের শেষের লক্ষ্মী শ্রী।

নজরুলের অন্য নাটকগুলোর মতোই ‘মধুমালা’তেও রূপক নাটকের আবহ তৈরি হয়েছে। সাগরের বিশালত্ব যেমন সীমাহীন, আকর্ষণ যেমন দুর্নিবার, তেমনি প্রেমের আকর্ষণও এতটাই অপ্রতিরোধ্য যে রাজ্য, রক্তের বন্ধন সব কিছুই গৌণ। ড. সুশীলকুমার গুপ্ত মনে করেন, ‘মধুমালা নাটকে রূপক নাট্যের একটা আভাস পাওয়া যায়। মধুমালার আত্মবিসর্জনের মধ্যদিয়ে নজরুল তাঁর চিরন্তন প্রেম সমস্যা সমাধানের একটা ইঙ্গিত দিয়েছেন। মধুমালার ভিতরেই নাট্যকারের মূল উদ্দেশ্য ব্যক্ত হয়েছে।’

লেখকঃ সহযোগী অধ্যাপক 

বাংলা বিভাগ

নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

Side banner