বিন্দি, তুই লাদু শেখের আখক্ষেতে গেলি কেন?
ক্যানে, হামার বকরির লাগি ঘাস কাটতে।
তোর বকরি কয়টারে?
দুইটা।
তুই মানুষ একটা বকরি দুইটা কেন রে?
হামার সাথে মজাই কইরবার লাগছিস!
তোর হাতে কাস্তে। কাস্তে দিয়ে কী করিস?
ক্যানে, হামার বকরির লাগি ঘাস কাটি।
কাস্তে দিয়ে আর কী করিস?
হামার সাথে ফের মজাই কইরবার লাগছিস। বিন্দি কিছুটা ক্ষেপে গেল।
দে তোর কাস্তেটা, দাঁতগুলির ধার দেখি?
না, হামার দাউলি কাঁহাকেও দিই না।
এবার বল, আখক্ষেতে কী হয়েছিল রে? শফিক চোখ টিপে হাসে।
হামাক দ্যাখে ও আইলো।
ও কে?
ও যি রুস্তম।
কোন রুস্তম?
ও যি, সোহরাব জাইরোর ব্যাটা রুস্তম। পাঁঠার পাঁঠা।
ওহ। রুস্তম তোকে কী বলেছিল?
বললো যি, হামার সাথে চল্। হামি কহিনু, কুণ্ঠে যাবো। ও বলে আখক্ষেতে। আমি কহিলাম, আখক্ষেতে ক্যানে যাবো? ও বলে, মজাই দেখবি। তারপরে হামি গেনু।
ও বললো আর তুই চলে গেলি!
বা রে! ও বললে যে।
ও বললেই তুই যাবি?
হামি কি জানি, ঐ জাইরো আমাক লিয়া...। বিন্দি লজ্জায় জিভ কাটে।
তোকে নিয়া কী? বল, নাহলে বিচার হবে কী করে?
তুও যি হামার সাথে মজাই করবার লাগছিস। তু বিচার করবি?
করবো তো। বিচার এখনি করবো? তুই বল আগে, রুস্তম তোকে কী মজাই দেখাল।
তু মজাই করছিস। হামি তোর বাপ চেরম্যানের কাছে গেনু। বলেই বিন্দি হাঁটতে উদ্যত হয়।
দাঁড়া, বলে শফিক বিন্দির সামনে এসে দাঁড়াল। তুই যাচ্ছিস কোথায়? বিচার এখানেই হবে এবং এখনি হবে। চেয়ারম্যান লাগবে না। রুস্তমকে ডাকল শফিক। এই রুস্তম, শালা রামপাঁঠা এদিকে আয়।
রুস্তম দাঁড়িয়ে ছিল একটি খেজুর গাছের আড়ালে, সেখান থেকে শিকারি বিড়ালের মতো জিভ দিয়ে ঠোঁট চেটে ভুরু নাচিয়ে বের হয়।
ও-রি! তু তো ঐ জাইরো চদলের বন্ধু! তু তো বিচার করবি না! হামার সাথে মজাই করলি খালি খালি! বলে বিন্দি হাঁটা ধরে।
চলে যাচ্ছিস কেন? মাতব্বর ডেকে আনলাম বিচারের জন্যে, আর তুই চলে যাচ্ছিস. এইবার তোর বিচার হবে। দাঁড়া। রুস্তমকে হাতে ইশারা দিল শফিক।
শালা চদল! জাইরোর বন্ধু জাইরো! জাইরোর পয়দা জাইরো! সাপের মন্ত্রোচ্চারণের মতো বিড়বিড় করে হাঁটছে বিন্দি। রুস্তম শফিকের বন্ধু, এ কথা ওর মনে ছিল না। মুখ থেকে একদলা থুথু ফেলে বিন্দি। হাতের কাস্তেটা দিয়ে বাতাস কেটে কেটে কিছুক্ষণ হাঁটার পরে পেছনে পায়ের শব্দ শুনতে পেল। পিঠ ফিরে দেখে, ওরা বিন্দিকে অনুসরণ করে হাঁটছে। বিন্দি হাঁটলে ওরা হাঁটে, বিন্দি দাঁড়ালে ওরা দাঁড়ায়। একবার ইচ্ছে করেই গাড়ির ব্রেক কষারমতো আচমকা দাঁড়িয়ে গেল বিন্দি। ওরাও তাই করে। দূরত্ব মাত্র কয়েক ধাপ। গতকালকে রুস্তমকে চিনেছে, আজকে সঙ্গে যোগ হয়েছে শফিক। ও কি রুস্তমের মতো, নাকি ওর চেয়ে বড়ো পশু। বিন্দির সামনে বাঁশঝাড়, বাঁশঝাড়ের মাঝখান দিয়ে ভূতুড়ে রাস্তা, রাতের মতো অন্ধকার, লোকেরা ভয়ে এ পথে আসে না সচরাচর। বিন্দি কখনও ভয় পায় না। বন-বাদাড়ে ঘোরাফেরা ওর নেশা। কী হবে, তাই ভেবে প্রস্তুতি নিতে একটি জায়গায় স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে গেল বিন্দি। দাঁড়িয়ে গেল শফিক-রুস্তম। কাস্তে দিয়ে কচুগাছের পাতার উপরে এলোমেলো কুপিয়ে টুকরো টুকরো করার ফাঁকে ফাঁকে শেয়ালের মতো দাঁড়িয়ে থাকা রুস্তম-শফিকের দিকে তাকিয়ে ভাবে বিন্দি, এই শেয়াল দুটি একসাথে শিকার খেতে অভ্যস্ত, নাকি একজন খেয়ে উচ্ছ্বিষ্ট হলে অন্য জনে খায়। ওরা কি শিকার ধরে আর খায়, নাকি শিকারকে বশে এনে ধীরে ধীরে খায়। বিন্দি নিশ্চিত, বাঁশঝাড়ের রাস্তার মধ্যে পা ফেললেই শেয়াল দুটি বাঘেরমতো ঝাঁপিয়ে পড়বে শিকারে উপরে। বিন্দি আর নড়ে না, ওরাও আর এগোচ্ছে না। অবশ্য ভেবেও কোনো লাভ নেই। কারণ, বিন্দির ডানে-বায়ে আর কোনো রাস্তা নেই, পেছনে দুই শিকারি। বাঁশঝাড়ের রাস্তায় পা বাড়াতেই হয় বিন্দিকে। কয়েক ধাপ হাঁটার পরে আর হাঁটতে পারে না, হাঁটু ভেঙে আসছে ভয়ে, বাধ্য হয়ে দাঁড়িয়ে গেল। এবার ওরা বিন্দির পিঠের উপরে অজগরের মতো শ্বাস ফেলে। মাছ জালে আটকে গেছে, এখন আর ছটফট করে লাভ নেই।
ঘুরে দাঁড়িয়ে বিন্দি বলে, হাঁরে চেয়ারম্যানের ব্যাটা, তু-ও!
শফিক গম্ভীরমুখে বলে, হারামজাদা রুস্তমটার একটা বিচার করতে হবে না। এই দেখ ধরে এনেছি। তুই বল, কী বিচার করবো?
বিন্দি সরল মনে বলে, হামি কী বইলবো। তুর ধর্মে যা ধরে তাই বিচার কর। তুই চেরম্যানের ব্যাটা, অল্যায্য বিচার করবি না কিন্তু।
তাইতো, কি বিচার করা যায়? শফিক অস্থিরভাবে পায়চারি করে।
বিন্দি বিরক্ত হয়ে বলে, বিচার কইরলে তাড়াতাড়ি কর। হামার বকরি দু-টা খিদে লিয়ে কাঁদছে। ঘাস আনতি যাতি হবি।
শফিক এবার রুস্তমের দিকে তাকিয়ে চোখ পাকিয়ে বলে, বিন্দির সামনে যা। ক্ষমা চা।
বিচারপ্রার্থীর মতো মাথা নিচু করে ধীর পায়ে হেঁটে বিন্দির মুখোমুখি দাঁড়াল রুস্তম।
বিন্দি, ও শালা তোর সাথে কি করেছে বল, কঠিন বিচার হবে।
এই জাইরো বলুক। হামি কি বইলবো। হামি কি দোষ করেছি? বিন্দি রুস্তমের দিকে তাকিয়ে বলে।
এবার রুস্তমের দিকে তাকিয়ে চোখ টিপে শফিক। রুস্তম, তুই বল, বিন্দির সাথে কী করেছিস? কিভাবে করেছিস?
শিকারি শেয়াল অথবা বাঘ যেমন শিকারের কণ্ঠনালিতে কামড় বসিয়ে প্রথম প্রচেষ্টাতেই মাটিতে আছড়ে ফেলে এবং শিকারের শব্দ করার শক্তি নষ্ট করে ফেলে, ঠিক সেই কৌশলেই রুস্তম বিন্দির গলা টিপে ধরে। দুটি বাঁশের ফাঁকে শুইয়ে ফেলে। বিন্দির হাতে কাস্তেটা ছিটকে পড়ে কয়েক হাত দূরে। ওর পরনের শাড়ি দিয়েই মুখ ও দুই হাত বেঁধে ফেলে। শুধু চোখ দুটি খোলা থাকে। বিন্দির শরীরের শক্তি নেহায়েত কম নেই। কালো ও হৃষ্টপুষ্ট শরীরের একজন যুবতীকে শুইয়ে কাজে নামার জন্যে যে প্রস্তুতির দরকার, সেই রকম প্রস্তুতি ওদের দুজনের ছিল না বলে যথেষ্ট বেগ পেতে হয়। বিন্দি শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে উঠে যাবার চেষ্টা করায় এবং হাত-পা নাড়ানাড়ি করায় রুস্তম ভয়নক বিরক্ত ও অধৈর্য হয়ে ওঠে—কাজের সময় এতো ডিস্টার্ব ভালো লাগে না। ওর পা দুটি বেঁধে দে তো শফিক। রুস্তমের কাঁধের উপরে ছিল লুঙ্গি। সেখান থেকে এনে বিন্দির দুই পা একসাথে করে বেঁধে দিল শফিক। রুস্তম রেগে গেল, হারামজাদা, তুই কি গরু! দুই পা একসাথে বেঁধে দিলে কাজ হবে কী করে? খোল্। দুই পা দুই বাঁশের সাথে বেঁধে দে।
লুঙ্গি যে একটা, দুই পা বাঁধি কী করে? শফিক বলে।
শফিককে খুন করে ফেলতে ইচ্ছা করে রুস্তমের। বিন্দিকে ছেড়ে উঠতে পারলে তাই করত। শালা, তুই অন্ধ নাকি! তোর পরনের লুঙ্গি দেখতে পাচ্ছিস না? এই ধরনের কাজে শফিকের হাতেখড়ি আজ। রুস্তম ওর কথায় ওঠে-বসে, এখন রুস্তম ওকে ধমকাচ্ছে। লুঙ্গি খুলতে গড়িমসি করছে দেখে ক্ষুধার্ত রুস্তমের আর সহ্য হয়নি। বিন্দিকে ছেড়ে দিয়ে ছুটে গিয়ে একটানে শফিকের লুঙ্গি খুলে ফেলে। এই ফাঁকে বিন্দি উঠে দাঁড়াতে গিয়ে ব্যর্থ হয়। দ্বিতীয় চেষ্টার আগেই রুস্তম ছুটে এসে দুই পা দুই বাঁশে বেঁধে ফেলে। অতিরিক্ত খিদে নিয়ে বেশি খাওয়া যায় না। রুস্তম শফিকের উপরে ভীষণ বিরক্ত। শালা বলদ, তোকে নিয়ে আর যদি কোনো কাজে যাই তবে আমার নাম পাল্টে দিস। নে, তাড়াতাড়ি কাজে নাম্।
শফিকের কাজ শেষ হয়নি। বাঁশঝাড়ের গহিনে মচমচ শব্দ হচ্ছে। রুস্তম চমকে ওঠে, কিসের শব্দ? কিসের শব্দ রে শফিক? কাজের মধ্যে কথা বলায় শফিক ভীষণ বিরক্ত। রুস্তমকে ধমক মারে, শেয়াল-টিয়াল হতে পারে, চুপ করে থাক। বিন্দির চোখ দুটি হলুদ বাল্বের মতো মিটমিট করছে। ও আর এখন নড়াচড়ার চেষ্টা করে না। চোখ দুটিকে সার্বক্ষণিক খোলাই রেখেছে। শুকনো পাতার মচমাচানির শব্দ আরো স্পষ্ট হয়। রুস্তম ভয় পেয়ে গেল। শেয়াল না হয়ে মানুষও হতে পারে। বাঁশ কাটতে না হয় পায়খানা করতে আসতে পারে।
শালা কুকুর! আন্ধাগিঁট লাগছিস নাকি! এদিকে কেউ আসছে বলে মনে হচ্ছে। শফিককে তাগাদা দিল রুস্তম।
শফিকের কাজ এখন চরম মুহূর্তে। এখন রুস্তমকে খুন করে ফেলতে পারে। শফিক লাফাচ্ছে হাঁফাচ্ছে। এর ফাঁকেই বলে, আসুক, আসুক, যে শালাই আসুক খুন করে ফেলবো, শালাকে খুন করে ফেলবো। মচমচ শব্দ আরও নিকটে ঠেকলে রুস্তম শফিককে বলে, শালা রাক্ষস! তুই তো দেখছি কুকুরের চেয়েও অধম। ওঠ্, ওঠ্, বলে শফিকের হাত ধরে টানে।
এখন শফিকের উঠতে বাধা নেই। হুঁশ ফিরে আসায় উঠেই দৌড় দিল। বিন্দির পা থেকে লুঙ্গির গিঁট খুলতে খুলতে পেছন থেকে ডাকে রুস্তম, ঐ শালা, ঐ লুচ্ছা শালা, ন্যাংটা হয়েই যাবি বাড়ি।
ফিরে এসে লুঙ্গি নিয়ে দৌড় দেবার জন্যে যেই না জোরে পা ফেলে শফিক, সেই পা গিয়ে পড়ে বিন্দির কাস্তের উপরে। বকের গলারমতো লম্বা, দাঁতাল ও সরু কাস্তের উপরের অর্ধেকটাই ঘ্যাচাং করে ঢুকে যায় শফিকের পায়ের ভেতরে। ও মা গো বলে চিৎকার দিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে শফিক। রুস্তম অনেকদূর চলে গিয়েছিল। চিৎকার শুনে পেছনে তাকায়, দেখে, শফিক মাটিতে গড়াগড়ি খাচ্ছে। রুস্তম প্রথমে ভেবেছিল, বিন্দি বোধহয় আঘাত করেছে। তাই, বাঁশের একটি কঞ্চি ভেঙে নিল হাতে।
বিন্দি পূর্ববৎ শুয়ে আছে।
শফিক একবারই জোরে চিৎকার দিয়েছে। দ্বিতীয় চিৎকার দেয়নি। দাঁত কামড়ে আছে। শফিককে গরু জবাই করার মতো চিৎ করে শুইয়ে ফেলে রুস্তম। কাস্তেটার হাতল ধরে মোচড় দিয়ে জোরে টান দিতেই অর্ধেক থেকে ভেঙে গেল।
শফিক চিৎকার করে, কুত্তার বাচ্চা কুত্তা, করলি কী! এখন তো পা কাটতে হবে।
রুস্তম বলে, চল এখান থেকে পালাই। এই অবস্থায় দেখলে বিপদ! লুঙ্গিটাকে কোনোমতে কোমরে প্যাঁচ দিয়ে রুস্তমের কাঁধে ভর দিয়ে এক ঠ্যাঙে লাফাতে লাফাতে শফিক কোন দিকে যাচ্ছে, বিন্দি চোখ মেলে দেখার চেষ্টা করে। ওরা চোখের আড়াল হলে উঠে বসে। ধস্তাধস্তিতে হাতের বাঁধন আলগা হয়ে গেছে অনেক আগেই। ও ইচ্ছে করেই লাশের মতো পড়ে আছে। উঠে দাঁড়াতে গিয়ে দুই বার টাল খায়। কাপড়টা শরীরে প্যাঁচিয়ে নিল। কাস্তের অর্ধেকটা হাতে নিতে গিয়ে দেখে মাটিতে তাজা রক্ত। তলপেটে ব্যাথা ও প্রসাবের বেগ একইসঙ্গে অনুভব করায় আর এক পা এগোতে ইচ্ছা করে না। শফিকের রক্তের উপরেই প্রসাব করে তলপেট খালি করে বিন্দি। এবার প্রচণ্ড ব্যথা অনুভব করে ঘাড়ে ও বুকে। পা দুটি বেঁধে রেখেছিল বলে অবশ হয়ে গেছে।
অর্ধেক কাস্তে হাতে নিয়ে বাঁশ ধরে ধরে পথে এসে দাঁড়ায় বিন্দি। এই সময় এই পথ দিয়ে যাচ্ছিল চেয়ারম্যানের বিপক্ষ দলের নেতা জয়নুল। বিন্দিকে দেখেই মোটরসাইকেলের গতি মন্থর করে হাসিমুখে বলে, বিন্দি, ভালো আছিস? বিন্দির বিশেষ কোনো সাড়া নেই। মাতালের মতো টাল খেয়ে খেয়ে হাঁটছে। গ্রামের কিছু বখাটে লম্পট ছেলে সহজ-সরল সাঁওতাল মেয়েদের আড়ালে পেলেই সর্বনাশ করে। জয়নুলের এবার সন্দেহ হয়। মোটরসাইকেল দিয়ে বিন্দির পথ আগলে দাঁড়ায়। কি রে, তোর কি হয়েছে? তোর কাস্তে ভাঙা কেন?
বিন্দি হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে, হামার হাত-পা বাঁধি...। তার বাদে হামার দাউলির আদ্দেকটা লিয়ে গেইলো। হামার বকরি দুটা খিদে লিয়ে কাঁদছে, হামি ঘাস কাইটবো কি দিয়ে? শরীরের বেসামাল টাল সামলে কথা বলে বিন্দি।
বলিস কি রে! কোন লাফাঙ্গা এ কাজ করেছে। উত্তেজনায় মোটরসাইকেল বন্ধ করে দিল জয়নুল।
ঐ যে রুস্তম চদল, আর চেয়ারম্যানের ব্যাটা, ঐ চদলটার নাম কি? ঐ জাইরোটার নাম কি? জাইরোর পয়দা জাইরোটার নাম কি? পাঁঠার পয়দা পাঁঠা! বিন্দি চোখ টেনে জয়নুলের দিকে তাকায়। দেখে, ওরাও দুই জন। ভয়ে হাঁটু ভেঙে আসে বিন্দির। ওরাও যদি...। এবার মরণ। বিন্দির চোখের সামনে অন্ধকার।
শফিক? চেয়ারম্যানের ব্যাটা শফিকের কথা বলছিস? জয়নুল ভীষণ উদ্গ্রীব হয়ে বলে। বিন্দি মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানালে লাফিয়ে ওঠে, এই তো! ঘুঘু ধরার ফাঁদ পাইছি। শালাকে ছাই দিয়েও ধরা যায় না। জনগণের সামনে সাধু সাজে! কান টানলে মাথা আসবে। সঙ্গীছেলেটিকে বলে, তুই বিন্দির পেছনে পেছনে চেয়ারম্যানের বাড়ি পর্যন্ত যা, আমি এদিক দিয়ে লোক পাঠাই। আজকেই বিচার হবে। একদিন দুদিন দেরি হলেই শালা ক্রিমিনাল ঘটনাকে উল্টা দিকে ঘুরিয়ে দেবে।
প্রথমে বাঁশঝাড় এবং পরে আখক্ষেতের ভেতর দিয়ে, কখনও কাঁধে নিয়ে, কখনও মরা গরু টানার মতো টেনে শফিককে নিয়ে রুস্তম যখন চেয়ারম্যান বাড়িতে পৌঁছায়, ঠিক তখনি বিন্দিও বাড়ির উঠোনে পা ফেলে। চেয়ারম্যান বাড়িতেই ছিল। ঘটনাটি কী ঘটেছে তার বুঝতে বিলম্ব হয়নি। কিন্তু বিন্দির পেছনে জয়নুলের এক চেলাকে দেখে আতঙ্কে কেঁপে ওঠে, সর্বনাশ!
অর্ধেকটা কাস্তে হাতে নিয়ে সরাসরি বিন্দি হাজির হওয়ায় শফিক-রুস্তম ঘটনাটিকে অস্বীকার করতে পারে না। কিন্তু এখন শাসনের সময় নয়। ডেকে নিয়ে এক মুঠোতে যে কয়টি আসে সে কয়টি পাঁচ শ টাকার নোট রুস্তমের হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলে চোখ রাঙিয়ে বলে, খবরদার, এক মাসের মধ্যে গ্রামে ফিরবে না। আমি তোমার বাপকে সামাল দেবো।
বাড়ির পেছন দিয়ে আখক্ষেত ধরে উধাও হয়ে গেল রুস্তম।
চেয়ারম্যানের একটি গোপন ঘর আছে। ঘরটি মাটির নিচে। এখন রাজনীতি করলে এই ধরনের গোপন আস্তানা দরকার পড়ে। শফিককে সেই ঘরে ঢুকিয়ে তালা দিয়ে দিল। কিন্তু জলজ্যন্ত বিন্দিকে কী করবে? আলাভোলা মেয়ে, টাকা দিয়ে মুখচাপা দিতে গেলে উল্টো আরো বিপদ। জয়নুলকে নিশ্চয় সব খুলে বলেছে। ইচ্ছে করছে ছেলেকে খুন করে এখনি কবরে পাঠায়, বিড়বিড় করে বলে, হারামজাদা, গেলি তো গেলি, কাস্তেটা পায়ের মধ্যে ঢুকিয়ে আনলি কেন? এখন তো অস্বীকার করেও পার পাবো না। শফিককে ঘরে তালা দিয়ে এসে দেখে, বিন্দি উঠোনে নেই। কোথায় গেলো, বিন্দি কোথায় গেলো?
চেয়ারম্যানের স্ত্রী বলে, নষ্টা মেয়েমানুষ! উঠোনে হাত-পা ছেড়ে দিয়ে খুঁটি গেড়ে বসেছিল। ঘাড় ধাক্কা দিয়ে রাস্তায় তুলে দিয়ে এসেছি।
কাস্তেটা? ভাঙা কাস্তেটা কোথায়? চেয়ারম্যান ভয়ানক অস্থির।
ওর কাস্তে ও-ই হাতে করে নিয়ে গেছে। চেয়ারম্যানের স্ত্রী বলে।
এ কী করলে? কাস্তেটা এখন তো...! উফ্! হাতে-নাতে প্রমাণ! খাড়ায়া আছো কেনো, দেখো গিয়ে বিন্দি কতোদূর গেলো!
চেয়াম্যানের স্ত্রী দৌড়ে রাস্তায় এসে দেখে, বিন্দি বেশিদূর যায়নি। কিন্তু কাস্তে ওর হাতে নেই। জয়নুলের চেলা ছেলেটি কাস্তেটা হাতে নিয়ে বিন্দির সাথে সাথে হাঁটছে।
আট-দশটি উন্মত্ত মোটরসাইকেল ঝড়ের বেগে বাড়ির ওঠোনে প্রবেশ করলে ভয়ে আঁতকে ওঠে চেয়ারম্যান, কিন্তু নিজেকে স্বাভাবিক করতেও সময় নেয়নি। বৈঠকখানায় বসে কাগজপত্র ঘাঁটাঘাঁটি ব্যস্ততার ভান করে এবং চেহারায় গাম্ভীর্য ভাব ফুটিয়ে তোলে। যে ছেলেরা এসেছে তারা কেউ-ই চেয়ারম্যানের সামনে দাঁড়িয়ে তোতলানো ছাড়া স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে পারে না। কিন্তু এখন তাদের শরীরের হাবভাব অন্যরকম। ওদের একজন কোনপ্রকার ভণিতা ছাড়াই বলে, তাহলে শালিসটা বিকেলেই সেরে ফেলেন।
চেয়ারম্যান গম্ভীর মুখে বলে, কার শালিস? বিকেলে কাউন্সিলে শালিস আছে।
এইসব বাদ দেন। এই শালিসটা জরুরি? একজন বলে।
কিসের শালিস, সেটাই তো তোমরা বলছো না। চেয়ারম্যান বলে।
শফিকের? ওদের একজন বলে।
চেয়ারম্যান কাগজপত্র নাড়তে নাড়তে বলে, কোন শফিক?
আপনার ছেলে। সাঁওতাল মেয়ে বিন্দির সর্বনাশ...। একজনের কথা শেষ না হতেই ওদের চারজনের মধ্যে সবচেয়ে অল্পবয়সী যে সে ধৈর্য হারিয়ে ফেলে, আপনি সরকারি দল করেন, আবার চেয়ারম্যান হয়েছেন, তাই বলে কি গ্রামের সব মেয়েমানুষ...?
ছেলেটি কথা শেষ করতে পারেনি, ফাঁদে পড়া বাঘেরমতো ভয়ানক গর্জন করে ওঠে চেয়ারম্যান। বেয়াদব! স্পর্ধা কতো? কার সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলছিস টের পাচ্ছিস না। আমার ছেলে তিনদিন ধরে বাড়ি নেই, সোহরাবের ছেলে রুস্তমের সাথে কক্সবাজার সমুদ্র দেখতে গেছে। আর তোরা এখানে এসেছিস নাটক করতে! ভোটে হেরেও তোদের শয়তানির স্বভাব গ্যালো না! আগে আসল শয়তানটারে দেখে নেবো, তারপর তোরা।
পরিস্থিতি সম্পূর্ণ উল্টে গেল। চেয়ারম্যানের রুদ্রমূর্তি দেখে ওরা পড়িমরি করে বেরিয়ে গেল।
শফিক কোথায় চিকিৎসা নিচ্ছে, এ খবর জানতে শহরের হাসপাতাল, ক্লিনিক ও আশেপাশের গ্রামের হাতুড়ে ডাক্তার পর্যন্ত খোঁজখবর নিয়েছে। জয়নুল নিশ্চিত, ছেলেকে বাড়ির মধ্যেই কোথাও লুকিয়ে ফেলেছে চেয়ারম্যান। কোনো একসময় তো ছেলেকে বাড়ি থেকে বের করবেই। এতো বড়ো কাস্তের অর্ধেকটাই তো ভেঙে রয়েছে।
শফিকের এক পা ফুলে তিন পা হয়ে গেল। শহরে নেবার উপায় নেই, গ্রামের কোনো হাতুড়ে ডাক্তার ডাকারও উপায় নেই। বাড়ি থেকে বের করাই অসম্ভব। চারিদিকে জয়নুলের চ্যালারা ওঁৎ পেতে আছে। কাজের লোকদের বিশ্বাস নেই। গভীর রাতে চেয়ারম্যান নিজেই অপারেশনে নামে। তরকারি কাটার দাউ গনগনে আগুনে পুড়িয়ে শফিকের ঊরুর উপরে এক পা তুলে দিয়ে গরুর ডাক্তারের মতো এক ঘণ্টা অপারেশন চালিয়ে বিন্দির কাস্তের অর্ধেকটা বের করে আনে। এই সময় শফিক বেহুঁশ হয়ে পড়েছিল।
কয়েকদিনের মধ্যেই শফিকের পায়ে পচন ধরে। গ্যাংগ্রিনের দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে। মাছির ওড়াউড়ি বেড়ে যায়। আর লুকিয়ে রাখা কী করে সম্ভব? পচন দ্রুত ছড়িয়ে পড়বে সর্বাঙ্গে। পা-টা কেটে ফেলতেই হবে।
|
ReplyForward |
আপনার মতামত লিখুন :