বঙ্গবন্ধুর ভাষণের ভাষা
ড. শ্যামল কান্তি দত্ত
ভাষণ এবং ভাষা দুটি শব্দের-ই উৎপত্তি সংস্কৃত ধাতু √ভাষ্ থেকে। অভিধানে ভাষণ শব্দের প্রাথমিক অর্থ: উক্তি, বাক্য বা বচন। বিবর্তনমূলক বাংলা অভিধান-এ ভাষণ মানে: ১. ভাষা, ২. কথন, ৩. কথা ও ৪. বক্তৃতা। যদিও বর্তমানে বিবৃতি বা বক্তৃতা অর্থেই ভাষণ শব্দটি বাংলায় বহুল প্রচলিত ও অভিধানসিদ্ধ। বর্তমান প্রবন্ধে বক্তৃতা অর্থেই ভাষণ শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। বঙ্গবন্ধু আবাল্য জোরালো ভাষায় বক্তৃতা করতেন এবং তাঁর বক্তৃতা ছাপা হলে খুশি হতেন। বলা বাহুল্য বঙ্গবন্ধুও ভাষণ দিতে গিয়ে: ‘বক্তৃতা করা’ কথাটই বলতেন। যদিও ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে তাঁর ঐতিহাসিক বক্তৃতা ‘৭ মার্চের ভাষণ’ হিসেবেই বহুল পরিচিত এবং আলোচিত। ভাষণ আসলে বোধ ও বিশ্বাসের সম্মিলিত প্রকাশ; বাগ্মিতা তার অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। ভাষণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ভাষার ব্যবহার, ভাষা-কৌশলের প্রয়োগ। তাই ভাষণ বিশ্লেষণ মূলত ব্যক্তির ভাষার বিশেষত্ব বিশ্লেষণ। অভিধানে ভাষা শব্দের প্রাথমিক অর্থ ভাব প্রকাশক উক্তি বা সংকেত। তবে বর্তমান আলোচনায় ভাষা বলতে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের (১৯২০-১৯৭৫) বিভিন্ন ভাষণের বাচনভঙ্গি, তাঁর ব্যবহৃত শব্দাবলী-বাক্য-বাক্যাংশ ও তাঁর নিজস্ব ভাব প্রকাশের রীতি বা শৈলী (স্টাইল) বিবেচিত হবে। অর্থাৎ, ভাষণের ভাষাশৈলী বিশ্লেষিত হবে। বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘ফাঁসির মঞ্চে যাওয়ার সময় আমি বলব- আমি বাঙালি, বাংলা আমার দেশ, বাংলা আমার ভাষা।’ বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রেরণায় সৃষ্ট বাংলাদেশের ভাষা-পরিস্থিতি অনুধাবনের জন্য তাই বঙ্গবন্ধুর ভাষণের ভাষা সম্পর্কে ধারণা থাকা আবশ্যিক বলেই আমাদের বিশ্বাস। এছাড়া এ আলোচনা মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে আরও শাণিত করে পাঠকের উপলব্ধিকে নতুন মাত্রায় উন্নীত করবে।
বাগ্মী জননেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান একজন সম্মোহন সৃষ্টিকারী ভাষণকার। ‘স্কুলজীবন থেকে সম্মোহনী শক্তির ভাষার মায়াজালে সবাইকে কাছে টানতে পারতেন। ... গুরুসদয় দত্ত (১৮৮২-১৯৪১) প্রবর্তিত ব্রতচারী প্রশিক্ষণ নিয়ে সহপাঠী ও প্রতিবেশিদের নিয়ে নাচগান করতেন।’ সাংস্কৃতিক চর্চার সাথে সাথে সাংগঠনিক দক্ষতা ও ভাষণ দানে পারঙ্গমতা অর্জন করেন বলে অনুমান করা যায়। ভাষণদানকারীকে বাংলা ভাষার অভিধানে বলা হয় ভাষণকার বা বক্তৃতাকার। বাংলা ভাষায় আগেকার দিনে বক্তৃতা বিশেষ্যপদকে ক্রিয়া বানাতে ‘বক্তৃতা করা’ মিশ্রক্রিয়া লেখা হতো। অক্ষয়কুমার দত্ত’র ভাষায় পাওয়া যায়: ‘তিনি অধিকসংখ্যক ভাষায় সৎপ্রণালীর সহিত লিখিতে ও বক্তৃতা করিতে পারিতেন’ (অক্ষয়, ১৮৪২)। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বক্তৃতা বিশেষ্যপদের সাথে দেওয়া ক্রিয়া যোগ করে সংযোগমূলক মিশ্রক্রিয়া ‘বক্তৃতা দেওয়া’ বানিয়ে বক্তব্য রাখা অর্থে লিখলেন: ‘এ বিষয়ে বক্তৃতা দেওয়া বৃথা’ (রবীন্দ্রনাথ ১৮৯৪)। রবি ঠাকুরের সাহিত্যিক প্রভাবে প্রমিত বাংলায় এবং পশ্চিমবঙ্গের আঞ্চলিক ভাষায় বক্তৃতা দেওয়া ক্রিয়াপদটি বহুল প্রচলিত রূপ লাভকরে। বঙ্গবন্ধু তাঁর ভাষণে কলকাতার কথ্যভাষার ক্রিয়ারূপটি ব্যবহার করেননি। তিনি তাঁর ভাষণে ব্যবহার করলেন প্রাচীন বাংলার সাধুভাষা রীতির ও পূর্ববাংলার বা বাংলাদেশের কথ্য লোকভাষায় বহুল ব্যবহৃত বুলিভাণ্ডার থেকে নেওয়া ‘বক্তৃতা করা’ ক্রিয়াপদটি:
‘ভাইয়েরা ও বোনেরা আমার, বক্তৃতা করার আমার কিছুই নাই। ...আমি বক্তৃতা করতাম যে, ভুঁড়িওয়ালা যদি আল্লাহ্ আমারে দিন দেয় তোমাদের ভুঁড়ি আমি কাইটা দেব। ওই ভুঁড়ি আমি কাইটা দিচ্ছি। আমি বক্তৃতা করতাম যে, ...আমি এখন বক্তৃতা করা ভুলে গেছি’ (২৬ ডিসেম্বর, ১৯৭২, যশোর, পৃ. ১৮৮-১৯৩)।
অবশ্য মাঝে মধ্যে ‘বক্তৃতা করা’র পরিবর্তে: ‘বক্তব্য দেওয়া’ মিশ্রক্রিয়া কিংবা ‘ভাষণ’ বিশেষ্যপদটিও ব্যবহার করতেন:
ক. ‘বেশি সময় আমি বক্তব্য দিতে চাই না’ (২৬ জুন, ১৯৭২, নোয়াখালী, পৃ. ৯৩)।
খ. ‘এ ভাষণ বাঙালি জনগণের জন্য, আজ আমি দুঃখ ভারাক্রান্ত মনে আপনাদের সামনে দাঁড়িয়েছি’ (১৮ আগস্ট, ১৯৭৪, ঢাকা, পৃ. ৩০৩)।
এ ভাষা ব্যবহারের মধ্য দিয়ে তিনি যেমন পশ্চিম বাংলা ও পূর্ব বাংলার ভাষারীতির সমন্বয় সাধন করেছেন তেমনি প্রাচীন বাংলার ঐতিহ্যকে ধারণ করে বর্তমান প্রয়োগের সাথে মিলিয়ে দিয়েছেন।
বঙ্গবন্ধু তাঁর ভাষণ শুরু করতেন ‘ভায়েরা আমার’ সম্বোধন করে। তবে ১৬ জানুয়ারি ১৯৭২ ঢাকায় বক্তৃতা শুরু করতে গিয়ে প্রথম ব্যবহার করেন: ‘আমার ভাইয়েরা ও বোনেরা’। এর পর ১৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৭২ ঢাকায় জাতির উদ্দেশে ভাষণ শুরু করতে ব্যবহার করেন: ‘দেশবাসী ভাই ও বোনেরা আমার’। এখানে বঙ্গবন্ধুর আন্তরিকতা ও অন্তরঙ্গ-আত্মীয়তাবাচক শব্দ ‘ভাই-বোন’ ব্যবহার খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি প্রিয় দেশবাসীকে নিজের পরিবারের সদস্য ভাই ও বোন বলে সম্বোধন করে তাঁর ভাষণ শুরু করতেন। তিনি যেমন দেশের মানুষকে ভাই-বোন বলে সম্বোধন করতেন তেমনি দেশবাসীও তাঁকে ‘মুজিব ভাই’, ‘শেখ সাহেব’, ‘লিডার’ সম্বোধনে ডাকতেন। তবে ২৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯ এর পর তাঁকে তাঁর কর্মী-সহকর্মীগণ ‘বঙ্গবন্ধু’ সম্বোধনে কথা বলতেন। তবুও বঙ্গবন্ধু তাঁর ‘মুজিব ভাই’ সম্বোধনটি খুব ভালোবাসতেন, এমনকি ‘জাতির জনক’ উপাধি পাওয়ার পরেও। এ সম্পর্কে আবদুল গাফফার চৌধুরী লিখেছেন: কেউ ভুলেও তাকে মুজিব ভাই ডেকে ফেললে দেখতাম, তাঁর চোখেমুখে আনন্দের প্রতিভাস। মনে হতো তিনি যেন আপন সত্তায় ফিরে গেছেন। এ তাঁর দেশবাসীর প্রতি ঘনিষ্ঠতা আর আন্তরিকতার অনন্য নিদর্শন। আর এই আন্তরিকতার গুণেই তিনি ৭ই মার্চের ভাষণে বলেন:
‘... তোমরা আমার ভাই, তোমরা ব্যারাকে থাকো, কেউ তোমাদের কিছু বলবে না। কিন্তু আর আমার বুকের ওপর গুলি চালাতে চেষ্টা করো না।’ (পৃ. ১৬)।
কাজেই সৈন্যদের প্রতি সাধারণ শ্রোতা পক্ষের সর্বনাম ‘তোমরা’ ব্যবহার আর অসঙ্গত বা অপ্রশাসনিক ঠেকে না। তিনি বাক্যের শুরুতেই ‘আমার ভাই’ সম্বোধন করে আত্মীয়তার বন্ধনে জড়িয়ে নেন বলেই মানী পক্ষের ক্রিয়াপদের পরিবর্তে সাধারণ শ্রোতপক্ষের ক্রিয়াপদ ব্যবহারও এখানে বিসদৃশ বলে মনে হয় না। বস্তুতপক্ষে স্থান ও পাত্র ভেদে যথোপযুক্ত ভাষার অর্থাৎ সর্বনাম ও ক্রিয়াপদের ব্যবহার; এও তাঁর ভাষিক বিশিষ্টতার নজির। একই সঙ্গে এসকল শব্দ জনগণের প্রাধান্য নিশ্চিত করার সঙ্গে সঙ্গে যূথবদ্ধতাকেও নির্দেশ করে। বাংলা ভাষায় শ্রোতা পক্ষের সর্বনামের তিনটি রূপের মধ্যে মধ্যম বা সাধারণ রূপটিই কথ্য ভাষায় আড্ডায় বেশি ব্যবহৃত। এমনকি বিধাতার কাছে প্রার্থনায়ও এরূপ অর্থাৎ ‘তুমি’ ব্যবহার করা হয়। বঙ্গবন্ধু তুমির বহুবচন ‘তোমরা’ ব্যবহার করে একদিকে ঘনিষ্ঠতা নির্দেশ করেন, অন্য দিকে পাকিস্তানের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এটি তাঁর কঠোর নির্দেশও বটে। এটি একদিকে যেমন তাঁর ভাষার দক্ষতা তেমনি তাঁর রাজনৈতিক দক্ষতাও বটে। একারণেই দেখা যায় বঙ্গবন্ধু ঘরোয়া আলোচনায় ঘনিষ্টার্থক বা তুচ্ছার্থক শ্রোতাপক্ষের সর্বনাম ব্যবহার করতেন। আর বক্তৃতায় নিজ ভাষা-শৈলীর গুণেই কদাচিৎ দু'একটা ঘনিষ্টার্থক শ্রোতাপক্ষের ক্রিয়াপদ ব্যবহার করে ভাষণে বৈঠকি ঢং আনতেন।
আবার ১৯৭১ সনের ২১ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৯৭৫ সনের ৮ মার্চ পর্যন্ত প্রায় প্রতিটি ভাষণ শেষ করেছেন ‘খোদা হাফেজ’ বা ‘আসসালামু আলাইকুম’ বলে এবং ‘জয় বাংলা’ শ্লোগান দিয়ে। অথচ বঙ্গবন্ধুর নির্মম হত্যাযজ্ঞের পরেই খন্দকার মোশতাক আহমদ জাতির উদ্দেশে বেতার ভাষণ শেষ করেন ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’ ধ্বনি দিয়ে। এর কিছুদিন পরেই নির্দেশ আসে বেতারে ‘খোদা হাফেজ’ বলা যাবে না, ‘আল্লাহ্ হাফেজ’ বলতে হবে। কেননা, খোদা আরবি নয় ফারসি শব্দ; তাদের মতে: আল্লাহ্তালাকে আরবি ‘আল্লাহ’ ছাড়া নাকি আর কোনো শব্দে ডাকা যাবে না ! এভাবে এদেশের মানুষের মন থেকে বঙ্গবন্ধুর নাম-নিশানা এমনকি তাঁর ব্যবহৃত প্রতিটি শব্দও মুছে দেওয়ার ঘৃণ্য চেষ্টা হয়েছে, ধর্মের দোহাই দিয়ে; ধর্মান্ধতার বিষবাষ্প ছড়িয়ে। অন্যভাবে বললে, বঙ্গবন্ধুর ব্যবহৃত এই শব্দগুচ্ছের মধ্যে একটা উদার অসাম্প্রদায়িক চেতনা মিশে আছে, যা রক্ষণশীল-ধর্মান্ধ ও পশ্চাৎপদ-পাকিস্থানপন্থীরা মেনে নিতে পারেনি। আজকের দিনে তাই বাঙালি সমাজকে ওই পশ্চাৎপদতার হাত থেকে রক্ষা করতে চাইলে বঙ্গবন্ধুর উদার-অসাম্প্রদায়িক ভাষা-শৈলীর কেবল গবেষণা-অধ্যয়ন করলেই চলবে না, এর বহুল প্রচলনের বা প্রয়োগের পদক্ষেপও নিতে হবে।
বঙ্গবন্ধু তাঁর ৭ই মার্চের ভাষণের শেষে ‘খোদা হাফেজ’ বা ‘আসসালামু আলাইকুম’ বলেননি। ভবিষ্যতের দৃঢ় প্রত্যয়ের ঘোষণা ‘জয় বাংলা’ শ্লোগান দিয়ে ভাষণ শেষের আগে তিনি বলেন: ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’। সাংবাদিকের ভাষায় এ হচ্ছে: বেতারে দুই লাইনের প্রক্লেমেশন অব ইনডিপেনডেন্স নয়, ডিক্লেয়ারেশন অব ওয়ার। সেদিন রেসকোর্সের ময়দানের মঞ্চে উপস্থিত কামাল হোসেনও স্বীকার করেন যে জাতীয় চার নেতার অন্যতম তাজউদ্দীনের হাতে লিখিত ভাষণের যে খসড়া ছিল তাতেও এমন কথা ছিল না। কামাল হোসেনের ভাষায়: তাঁর ভাষণের যে অংশটা চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে- ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’ -এটা ওনার কথা। তিনি চমৎকারভাবে কবিতার মতো করে বলেছেন। আর তাই, অধ্যাপক আনিসুজ্জামান যথার্থই মনে করেন: সর্বশক্তি দিয়ে আক্রমণ করতে প্রস্তুত পাকিস্তান সেনাবাহিনীর মরণাস্ত্রের মুখে দাঁড়িয়ে এমন বাক্য বলতে অসামান্য সাহসের প্রয়োজন হয়। সে সাহস তাঁর ছিল। অবশ্য সেই সাহসের অনেকটাই তিনি সংগ্রহ করেছিলেন অসহযোগ আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী মানুষের তেজোদীপ্ত ও স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিবাদ থেকে। এই প্রতিবাদী চেতনাই তাঁর ভাষাকে দিয়েছে বজ্রকণ্ঠের উপমা আর তিনি হয়েছেন বাংলার সংগ্রামী জননেতা। বাঙালির প্রতিবাদকে মুখের ভাষায় ধারণ করে তিনি বঙ্গবন্ধু। আর মুক্তির সংগ্রাম ঘোষণা সে তো ওঙ্কারধ্বনি; তাই তিনি জাতির পিতা।
এখানে মাত্র নয়টি শব্দের একটি প্রমিত বাংলা ভাষার বাক্যে চারবার ‘সংগ্রাম’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন বঙ্গবন্ধু। ‘সংগ্রাম’ সংস্কৃত ভাষা থেকে আগত বাংলা শব্দ। পনেরো শতক থেকে ব্যবহৃত এই শব্দের আভিধানিক অর্থ: যুদ্ধ (সং.), আন্দোলন (সং.), বিপ্লব (সং.)। এর আরও কিছু প্রতিশব্দ বাংলায় প্রচলিত আছে, যেমন: রায়ট (ইং.), দাঙ্গা (ফা.), লড়াই (মুণ্ডারি, অস্ট্রিকজাত হিন্দি), সমর (সং.), হাঙ্গামা (ফা.) ইত্যাদি। কিন্তু বঙ্গবন্ধু একবারও অন্য কোনো শব্দ ব্যবহার করেননি। যুদ্ধ, লড়াই বা সমর শব্দ ব্যবহার করলে বক্তাকে যুদ্ধ ঘোষণার অভিযোগ দেওয়া যেত, বিপ্লব ব্যবহার করলে, তাকে বিপ্লবী বা বিদ্রোহী বলে দমন করা যেত। সংগ্রাম এখানে সুনির্দিষ্ট অর্থে বক্তার সুনির্বাচিত শব্দ। প্রতিটি বাঙালি বুঝলো যুদ্ধের ঘোষণা; পাকিস্থানীরা ভাবলো আন্দোলন। আমরা জানি, আন্দোলন মানে আলোড়ন বা খোঁজাখুঁজি। ভাষার জন্য বাঙালির ভাষা-আন্দোলন, কিন্তু মুক্তির জন্য সংগ্রাম। শহুরে মানুষ বইপত্রে মুক্তিযুদ্ধ কিংবা সামরিক শাসকেরা স্বাধীনতা-যুদ্ধ লিখলেও, গ্রামের সাধারণ মানুষ কিন্তু এখনও ‘মুক্তি সংগ্রাম’-ই বলেন। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময়কাল প্রসঙ্গে আমার মা প্রায়ই সিলেটি উপভাষার বুলিতে বলেন: ‘সংগ্রামর বছর তর জন্ম’। অর্থাৎ সিলেটের আঞ্চলিক ভাষায় ১৯৭১ খ্রি. মানে ‘সংগ্রামর বছর’। গ্রামের লোকভাষাতেও মুক্তিযুদ্ধ ‘সংগ্রাম’ নামে অভিহিত। অবশ্য, মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী পক্ষের লোকজন ১৯৭১ সালকে বলেন ‘গন্ডগোলের বছর’। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে বিরোধিতাকারী দলের মুখপত্র দৈনিকের নাম যদিও সংগ্রাম, তবে আজও আলবদরের বংশধরেরা ‘মুক্তি’ কথাটি মুখে আনেন না। মুক্তবুদ্ধি চর্চার ঘোর বিরোধী তারা। খুব কৌশলী হলে তাঁরা স্বাধীনতার কথা বলেন। অথচ ঐ একটি বাক্যের দিকে তাকালেই স্পষ্ট হয়: এখানে বক্তার কাছে পরিষ্কার: স্বাধীনতা লাভ করলেই সংগ্রাম শেষ হয়ে যাবে না, মুক্তির সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হবে। কেননা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও লক্ষ্য যে ওই ‘মুক্তি’। তাইতো ২৩ মার্চ ১৯৭১ বঙ্গবন্ধু তাঁর ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে দেওয়া সংক্ষিপ্ত এক কাব্যিক ভাষণে বলেন: ‘দরকার হয় আরও রক্ত দেবো, কিন্তু বাংলার মানুষকে আর পরাধীন থাকতে দেবো না। আপনাদের মুক্তি না হওয়া পর্যন্ত আমার সংগ্রাম চলবে’ (পৃ. ১৮)। এই ভাষণেও বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা ও মুক্তির কথা বলেছেন। বাঙালিকে রক্তদানের জন্য প্রস্তুত করে রেখেছেন। অথচ আক্ষরিক অর্থে মনে হয় তিনি মুক্তিযুদ্ধে আহ্বান জানানোর প্রমাণ অদৃশ্য করে রেখেছেন তাঁর ভাষাশৈলীর মুন্সীয়ানায়।
বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ডাক দিয়েছিলেন মুক্তির লক্ষ্যে। তাঁর রাজনৈতিক দর্শনও তা-ই। বঙ্গবন্ধুর প্রতিটি ভাষণে রয়েছে বাংলাদেশের জনগণের মুক্তির গান। সদ্য স্বাধীন দেশে ভাষণ দিতে গিয়েও তিনি তা বার বার বলেছেন: ‘আমি রাজনীতি করেছিলাম আমার সাড়ে সাত কোটি মানুষের মুক্তির জন্য। এখন আমার রাজনীতি মুক্ত হয়েছে। আমার অর্থনীতি মুক্তি প্রয়োজন। এইটা না হলে স্বাধীনতা বৃথা হয়ে যাবে’ (২৮ জুন, ১৯৭২, সিলেট, পৃ. ১০০)। অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী’র ভাষায় বলতে হয়: ‘মুক্তি। মুক্তির ওই লক্ষ্যকে সামনে রেখেই একাত্তরের যুদ্ধ, ...যুদ্ধের পেছনে যে-চেতনা সেটা মুক্তির, যে-মুক্তির একটা সংজ্ঞা পাওয়া গেছে চার রাষ্ট্রীয় মূলনীতিতে। ...এল দূরবর্তীদের শাসন তখনই সম্ভব হয়েছে মূলনীতির সংশোধন। মুক্তির জায়গায় এসেছে স্বাধীনতা। ...জনগণ সংগ্রাম করেছে কিন্তু মুক্তি পায়নি। ...কিন্তু মুক্তির সংগ্রাম চলছে। সরবে নয়, নীরবে। তাকে চলতেই হবে, নইলে আমাদের ভবিষ্যৎ কী, দাঁড়াবার জায়গা কোথায়?’ এই দাঁড়ানোর জায়গার জন্যই আমাদের জানতে হবে বঙ্গবন্ধুর ভাষণের ভাষাশৈলী। কেননা এ কেবল ভাষা কিংবা শব্দমাত্র নয় এযে মুক্তির চেতনা। ৭ মার্চের ভাষণেও তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, ‘রক্ত যখন দিয়েছি রক্ত আরো দেবো। এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাল্লাহ্।’ এই ‘ইনশাল্লাহ্’ আরবি শব্দ। এর অর্থ যদি আল্লাহ চাহেন। সঙ্গত কারণে মুসলিম বনেদি পরিবারের সন্তান হিসেবে তাঁর স্বভাব-চরিত্রে ইসলামি আমল-আখলাকের ছাপ থাকবে, সেটি স্বাভাবিক ও প্রত্যাশিত। আর তাই বাংলা বাক্যবন্ধে এই অনন্বয়ী অব্যয়ের অনায়াস ব্যবহার বঙ্গবন্ধুর ভাষণে পাওয়া যায়: ‘ইনশাল্লাহ্ বাংলা রাষ্ট্রভাষা হয়েছে। ...ইনশাল্লাহ্ রক্ত যখন দিতে শিখেছি, বাঙালি তার দাবি আদায় করবে’ (২১ ফেব্রুয়ারি, ১৯৭১, ঢাকা, পৃ. ১১-১৩)।
এখানে লক্ষণীয়, বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা এই আরবি অনন্বয়ী অব্যয় পদ বা আবেগ-শব্দ ব্যবহার করে কেবল জোর নিশ্চয়তাই প্রদান করেননি, এদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের পবিত্র ধর্মীয় ভাষার শব্দ ব্যবহার করে তাঁদের মধ্যে আশাবাদ জাগাতে চেয়েছেন। এমনকি ধ্বংসের ভাষিকচিত্র তুলে ধরে ধ্বংসস্তুপের ওপর দাঁড়িয়েও ভরসার বাণী শোনান; দৃঢ় আত্মপ্রত্যয় নিয়ে ঘোষণা করেন: ‘গুদামের চাল ধ্বংস করেছে, রাস্তাঘাট নষ্ট করেছে, বাস-ট্রাক পোড়ায়ে দিয়েছে, পোর্টের মধ্যে জাহাজ ডুবিয়ে দিয়েছে। রেললাইনকে ধ্বংস করে গেছে। সব করে গেছে। কিন্তু একটা জিনিস করতে পার নাই ভুট্টো সাহেব। সেটা হলো বাংলার মানুষের ইমান আর বাংলার মানুষের শক্তি। মানুষের শক্তির সামনে কেউ দাঁড়াতে পারে না’ (৩ জুলাই, ১৯৭২, কুষ্টিয়া, পৃ. ১০৪)। এই মানুষের শক্তির প্রতি ইমান বা বিশ্বাসই তাঁকে অসাম্প্রদায়িক করেছে, মানবিক করেছে, সর্বোপরি মানুষের মুখের মিশ্রভাষা বা আরবি-ফারসি-ইংরেজি-সংস্কৃত মিশ্রিত বাংলা ভাষা ব্যবহারে প্রেরণা দিয়েছে।
বঙ্গবন্ধু ইসলামিয়া কলেজে পড়াশোনার কয়েক বছর কলকাতায় ছিলেন। এ ছাড়া বাকি সময় কাটিয়েছেন গোপালগঞ্জে কিংবা ঢাকায়; আরও স্পষ্ট করে বললে পূর্ব বাংলায় বা বর্তমান বাংলাদেশে। তাঁর রাজনীতিও বাংলাদেশের মানুষের জন্য। সুতরাং, তাঁর ভাষণের দর্শক-শ্রোতাও বাংলাদেশের সাধারণ মধ্যবিত্ত-নিম্নবিত্ত খেটে খাওয়া জনসাধারণ। ফলে প্রমিত বাংলায় ভাষণ দিতে দিতেই আচমকা তিনি ব্যবহার করতেন বাংলাদেশের মানুষের কথ্যভাষার ক্রিয়াপদগুলো। সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন সহযোগী অধ্যাপক প্রশ্ন রেখেছেন: ‘বঙ্গবন্ধু তাঁর ৭ই মার্চের ভাষণে বলেন: দাবায়া রাখতে পারবা না; যদি পুরা ভাষণ নোয়াখালীর আঞ্চলিক ভাষায় দিতেন, তা হলে কি খুব ভালো হতো ? আসলে প্রশ্নটা হওয়া উচিত এই রকম- কোনো বিশুদ্ধ আঞ্চলিক ভাষায় কি এই ভাষণ হতে পারত? আমার তো ধারণা, পারত না। কোনো অন্য রকম জনগোষ্ঠীর সামনে অন্য কোনো পরিস্থিতিতে সম্পূর্ণ আঞ্চলিক ভাষায় কোনো মহাকাব্যিক ভাষণ হতেও পারে।’ আসলে বঙ্গবন্ধু কোনো আঞ্চলিক ভাষায় ভাষণ দেননি। কোনো ভাষণের কোনো একটি পূর্ণ বাক্যও বাংলাদেশের নির্দিষ্ট কোনো আঞ্চলিক ভাষায় উচ্চরণ করেননি। কেবল কিছু ক্রিয়াপদ তাঁর বজ্রকণ্ঠে ধ্বনিত হয়েছে: পূর্ববাংলার মানুষের কথ্যভাষা বা লোকভাষা থেকে উঠে এসে। এগুলোকে বড়জোর বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিভাষা বা নিভাষা বলা যেতে পারে; পুরোপুরি আঞ্চলিকভাষাও নয়, কিংবা অপভাষাও নয়। তাঁর তর্জনীর মতো নিঃসঙ্গ-স্থির-তীব্র একেকটি ক্রিয়াপদ যেনো:
‘আমি আমার ৭ কোটি লোকেরে যাবার বেলায় কিছুই দেবার পারি নাই। ...বিশ্বাস করেন যেদিন আমি পাকিস্তান থেইকা ফিরা আইসা, আমার ইচ্ছা ছিল না যে আমি প্রধানমন্ত্রী হই। ...আমার শতকরা ৬০ জন পুলিশকে মাইরা থুইয়া গেছে। ...আমি মিথ্যা কথা বলে আমি মানুষকে ধোঁকা দিবার পারবো না। ...যাতে চাটার দল যাতে চাটা না খাইতে পারে সে দিকে খেয়াল রাখবেন’ (২ এপ্রিল, ১৯৭২, ঠাকুরগাঁও, পৃ. ৬১-৬৬)।
স্বভাবজাত বাগ্মিতা, প্রত্যুৎপন্নমতিতা এবং সুস্পষ্টভাবে ভাবনা-চিন্তা ব্যক্ত করার কারণে শেখ মুজিবুর রহমান আওয়ামী লীগের নানা সভা এবং সম্মেলনে বিপুল জনসমাবেশ তৈরিতে সক্ষম হতেন। বঙ্গবন্ধুর সব বক্তৃতা রকবার শিল্প ও জনগণকে আকৃষ্ট করবার কৌশলের অন্যসম উপাদান ঐ সাধারণ মানুষের ভাষার বা লোকভাষার ক্রিয়াপদগুলোর ব্যবহার। বঙ্গবন্ধুর ব্যবহৃত এসব ক্রিয়াপদগুলোর কাব্যিক ব্যবহারকে আমলে আনা হয়নি আজও। অথচ বাংলা ভাষানীতি প্রণয়নে কিংবা বাংলা ভাষা-পরিকল্পনা করতে জাতির জনকের ভাষাদর্শন ও ভাষা-শৈলী গুরুত্বপূর্ণ দিঙনির্দেশনা হতে পারতো। বাঙালি শৈলীবিজ্ঞানী দেখিয়েছেন: মুখের ভাষা বা গদ্যের ব্যাকরণে পদগঠনের নিয়ম যে কবিতার ভাষায় সব সময় মানা হয় না, ব্যত্যয় ঘটিয়ে নতুন নতুন প্রয়োগ সৃষ্টি করা হয়, তার দৃষ্টান্ত-
সাধারণ গঠন কাব্যিক গঠন
গাহিতে [-ইতে] গাহিবারে [-ইবারে]
থামাইয়া [-ইয়া] থামায়ে [-এ]
বঙ্গবন্ধুর ব্যবহৃত ক্রিয়াপদের গঠনেও এমন প্রয়োগ প্রচুর। সাধারণ গঠনে ‘দেখিয়ে [-ইয়ে] দিতে [-তে] চাই’, ‘নিতে [-তে] পারে’ ক্রিয়াপদগুলোকে বঙ্গবন্ধু বলেন: ‘দেখায় [-আয়] দিবার [-ইবার] চাই’ (পৃ. ২১), ‘নিবার [-ইবার] পারে’ (পৃ. ১৬)। এই গঠনগুলোতে উপর্যুক্ত ‘গাহিবারে’ [-ইবারে] কাব্যিকগঠনের সাদৃশ্য বিদ্যমান। আবার, সাধারণ গঠনে ‘দাবাইয়া’ [-ইয়া] বা ‘দাবিয়ে’ [-ইয়ে], ‘দেখাইয়া’ [-ইয়া] বা ‘দেখিয়ে’ [-ইয়ে] ক্রিয়াপদগুলোকে বঙ্গবন্ধু বলেন: ‘দাবায়ে’ [-এ] (পৃ. ১৯), ‘দেখায়ে’ [-এ] (পৃ. ১১)। এই গঠনগুলোতে উপর্যুক্ত ‘থামায়ে’ [-এ] কাব্যিকগঠনের সাদৃশ্য অস্বীকার করা যায় না। অন্যদিকে ‘দাবায়ে’ অসমাপিকা ক্রিয়ার মধ্যে বাঙালির বিদ্রোহ যে একটি দাবানলের মতো বিস্ফোরণোন্মুখ সে ব্যঞ্জনাও ব্যক্ত হয়। শৈলীবিজ্ঞান বলে: ব্যক্তিগত প্রবণতা, সামাজিক ও সাহিত্যিক প্রেরণার জন্য ভাষা ব্যবহারকারী সব সময় গতানুগতিক বিধি মেনে চলেন না; প্রচলিত শৃঙ্খলা বা রীতি থেকে সরে আসেন। এই সরে আসা যদি সাহিত্য সৃষ্টিতে অপরিহার্য হয় তাহলে ব্যকরণের নিয়ম লঙ্ঘন অশুদ্ধি না হয়ে তা লেখকের নিজস্ব শৈলী রূপে প্রতিষ্ঠিত হয়। রবীন্দ্রনাথের ‘ছেলেভুলানো ছড়া’য় অনেক উদাহরণ মেলে। যেমন: ‘খোকা এল বেড়িয়ে। / দুধ দাও গো জুড়িয়ে\ / দুধের বাটি তপ্ত। / খোকা হলেন খ্যাপ্ত / খোকা যাবেন নায়ে। / লাল জুতুয়া পায়ে’ এখানে ‘হলেন’, ‘যাবেন’ ক্রিয়াপদ এবং ‘জুতুয়া’ বিশেষ্যপদে ব্যাকরণের লঙ্ঘন যেমন অশুদ্ধি নয় রবীন্দ্রনাথের শৈলী। তেমনি বঙ্গবন্ধুর ব্যবহৃত উপর্যুক্ত ক্রিয়াপদগুলোও যে তাঁর শৈলী সে কথা বলবার অপেক্ষা রাখে না।
অবশ্য বঙ্গবন্ধুর ভাষণের কিছু কিছু ক্রিয়াপদে গোপালগঞ্জের তথা ফরিদপুরের আঞ্চলিক ভাষার গঠন বৈশিষ্ট্যও দুর্লভ নয়। তবে ভাষা ও উপভাষার ব্যবধান যেহেতু বোধগম্যতার মাপকাঠিতে বিচার্য এবং ফরিদপুরের উপভাষা মান বাংলা ভাষার নিকটবর্তী উপভাষা। বাংলাদেশের আঞ্চলিক ভাষাভাষীর মধ্যে বোধগম্যতার দিক দিয়ে সবচেয়ে দূরবর্তী উপভাষা হচ্ছে সিলেট-নোয়াখালী-চট্টগ্রামের উপভাষা। বাংলাদেশের জনগণের বা বাংলাভাষী জনগণের কথ্যভাষা থেকে দূরবর্তী আঞ্চলিক ভাষার নয় বলে বঙ্গবন্ধু ব্যবহৃত এসব ক্রিয়াপদ বোধগম্যতার মাপকাঠিতে উৎরে যায় বরং এগুলোর কাব্যিক বৈচিত্র্য ও ব্যঞ্জনা বড় হয়ে ওঠে।
বঙ্গবন্ধু কেবল ৭ মার্চের ভাষণেই পঁয়তাল্লিশ বার ‘না’ ব্যবহার করেন এবং অন্তত সাত বার ‘নাই’ ব্যবহার করেন। এ প্রসঙ্গে ভাষণের ভাষাতাত্ত্বিক আলোচনা গ্রন্থে পাই: ভাষণের দু-একটি ক্ষেত্রে নঞর্থক ‘নাই’ ক্রিয়াপদের সাধু বা পূর্ণ রূপ চলিত ভাষায় অর্থাৎ কথ্যরূপে ব্যবহার করে এ অঞ্চলের প্রয়োগ বিশিষ্টতার স্বরূপ আরেকবার চিহ্নিত করেছেন। আমাদের বক্তব্য ‘নাই’ ক্রিয়াপদ নয়; ক্রিয়াবিশেষণ পদাণু, এর ব্যবহার বঙ্গবন্ধুর ভাষণে ‘দু-একটি’ নয়; অসংখ্য বার, আর এটি আঞ্চলিক নয় কাব্যিক প্রয়োগ। প্রমাণ স্বরূপ বলা যায়: নহে > নয়, নহি > নই ইত্যাদি নেতিবাচক ক্রিয়া এর সাদৃশ্যে অনেকে নাই > নি, না ইত্যাদি ক্রিয়াবিশেষণ পদাণু কে ক্রিয়াপদ ভেবে ভুল করছেন। প্রমিত বাংলা ব্যাকরণে: পদাণু হচ্ছে আপাত অর্থহীন পদখণ্ড যা পদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে বিশেষ ঈঙ্গিত বা অর্থ প্রকাশ করে। চলিত ভাষায় বা প্রমিত ভাষায় বহুল ব্যবহৃত ‘নেই’ / ‘নি’ এর সাধু ভাষার রূপ ‘নাই’। পূর্ব বাংলা তথা বর্তমান বাংলাদেশের আঞ্চলিক ভাষাতেও ব্যবহৃত হয় ‘নাই’। কথাসাহিত্যিক সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর (১৯২২-১৯৭২) লালসালু (১৯৪৮) উপন্যাসের ভণ্ড পীর মজিদ বলে : অমন করি হাঁটতে নাই। ... অমন করি হাঁটতে নাই বিবি, মাটি-এ গোস্বা করে। তাঁর চাঁদের অমাবস্যা (১৯৬৪) উপন্যাসেও ‘নাই’র ব্যবহার বিদ্যমান। উপন্যাসের শুরুতে তিনি লিখেন: ‘শীতের উজ্জ্বল জ্যোৎস্নরাত, তখনো কুয়াশা নাবে নাই। বাঁশঝাড়ে তাই অন্ধকারটা জমজমাট নয়। ... শুয়েও শুয়ে নাই। ... যুবতী নারীর হাতপা নড়ে না। ... অবশ্য বাঁশির আওয়াজ সে শোনে নাই’। এখানে তিনি না, নাই, ও নয় তিন রকম পদই ব্যবহার করেছেন; তবে কথাসাহিত্যে তিনি বাংলাদেশের নির্দিষ্ট কোনো আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহার করেননি। তবু ‘নাই’ যে কেবল আঞ্চলিক রূপ নয় বরং এটি যে না এর কাব্যিক রূপ তার প্রমাণ মেলে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কিংবা কবি সুফিয়া কামাল রচিত কবিতায়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘সোনার তরী’ কবিতাতে আছে :
আর আছে- আর নাই, দিয়েছি ভরে
ঠাঁই নাই, ঠাঁই নাই- ছোটো সে তরী
আমারি সোনার ধানে গিয়েছে ভরি।
এনসিটিবি প্রকাশিত ‘উচ্চ মাধ্যমিক বাংলা সংকলন’ বইয়ে সংকলিত কবি সুফিয়া কামালের ‘তাহারেই পড়ে মনে’ কবিতায় ‘নাই’, ‘নি’ ও ‘না’ এর ব্যবহার রয়েছে : শুনি নাই, রাখিনি সন্ধান / ...নাই হল, না হোক এবারে-/ ... করে নাই অর্ঘ্য বিরচন? বাংলা গানেও ‘নাই’ এর ব্যবহার রয়েছে প্রচুর; যেমন, বাংলা সিনেমার একটি জনপ্রিয় গান : ‘নাই টেলিফোন, নাইরে পিয়ন, নাইরে টেলিগ্রাম, / বন্ধুর কাছে মনের খবর কেমনে পৌঁছাইতাম।’ বাংলা কাব্যভাষার ‘নাই’ পদ সিলেটি উপভাষার কথ্য ভাষাতেও ব্যবহৃত হয় হরদম। এতে সিলেটি উপভাষাকে কাব্যিক ভাষা বলে মনে হয়। সুতরাং বঙ্গবন্ধুর ভাষণে বহুল ব্যবহৃত ‘নাই’ পদাণুটি যে আঞ্চলিক নয় কাব্যিক এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায়।
বঙ্গবন্ধু যখন বলেন: ‘জীবনের তরে রাস্তাঘাট যা যা আছে আমি যদি হুকুম দিবার নাও পারি, তোমরা বন্ধ করে দেবে’ (৭ মার্চ ১৯৭১, রেসকোর্স, ঢাকা, পৃ. ১৬)। তখন পুরোপুরি কাব্যিক পদ শ্রোতার কান বা পাঠকের দৃষ্টি এড়ায় না। সমালোচকের ভাষায়: ‘তরে’ -এ কাব্যিক পদটির প্রয়োগ দুঃসাহসী, অব্যর্থ ও এখন পর্যন্ত একমেবাদ্বিতীয়ম্। ‘তরে’ পদান্বয়ী অব্যয় বা অনুসর্গ । কামিনী রায়ের (১৮৬৪-১৯৩৩) কবিতায় পাই ‘সকলের তরে সকলে আমরা/প্রত্যেকে আমরা পরের তরে’। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরে গানে-কবিতায়ও তরে ব্যবহৃত হয়, তবে পুনশ্চ (১৯৩২) কাব্যগ্রন্থ থেকে ত্রিশের কবিদের প্রভাবে কবিগুরুও পদ্যের বিশেষ ভাষারীতি ত্যাগ করবার চেষ্টায় ‘তরে’ ‘মোরে’ জাতীয় শব্দ গদ্যে ব্যবহৃত হয় না বলে পরিত্যাগ করেন। সুতরাং ‘তরে’ অনুসর্গটি যে কাব্যিক তাতে কোনো সন্দেহ থাকে না। আর বঙ্গবন্ধুর ভাষণে এর বিকল্প কোনো শব্দও এ বাক্যের উপযুক্ত মনে হয় না। তাই বঙ্গবন্ধুর এই গদ্যবাক্যে কাব্যিক প্রয়োগরীতি তাঁর আরেকটি শৈলী বটে।
আটষট্টি হাজার গ্রাম নিয়ে গড়ে ওঠা যে বাংলাদেশ, সে দেশের শহুরে মানুষের ভাষায় তথা প্রমিত ভাষায় ভাষণ দিতে গিয়ে বঙ্গবন্ধু তাঁর গ্রামীণ লোকসমাজকে স্মরণে রেখে বার বার মিশ্রশব্দ ও সমার্থক শব্দ ব্যবহার করেছেন। যেমন: ‘দুনিয়ার ইতিহাসে স্বাধীনতার সংগ্রামে এতো লোক আত্মাহুতি, এত লোক জান দেয় নাই’ (১০ জানুয়ারি, ১৯৭২, ঢাকা, পৃ. ২০)। এখানে ‘আত্মাহুতি’ তৎসম শব্দের গ্রামীণ সমাজে বহুল ব্যবহৃত সমার্থক ‘জান’ আরবি শব্দ। এভাবে শহর-গ্রামকে মিলিয়ে দিতে যেমন তিনি তৎসম-আরবি শব্দকে একই পঙক্তিতে বসিয়েছেন অনায়াসে, তেমনি ইংরেজি-বাংলা শব্দ বা বাক্যাংশ ব্যবহার করেছেন অবিরাম। যেমন: ‘...কলগুলোকে রাষ্টীয়করণ করা হয়েছে। কাজ করতে হবে। এগুলোর উৎপাদন করতে হবে। প্রডাকশন বাড়াতে হবে’(২৯ মার্চ, ১৯৭২, চট্টগ্রাম, পৃ. ৫৮)।
কিংবা, ‘৭ মার্চ আমি বাংলার মানুষকে ডাক দিয়েছিলাম, ২৫ মার্চ বাংলার মানুষকে হুকুম দিয়েছিলাম’ (০৮ মার্চ, ১৯৭৫, টাঙ্গাইল, পৃ. ৩৪৬)। এভাবে কখনও বাংলায় বলে আবার ইংরেজিতে বলেন, কখনও ইংরেজিতে বলে আবার সহজ বাংলায় বলেন। আবার বাংলায় ডাক দেওয়ার কথা বলেই আরবি হুকুম দেওয়ার কথা বলেছেন। এখানেও তিনি শহর ও গ্রামবাংলার মানুষের কথা মাথায় রেখে নাগরিক ভাষা আর বহুল প্রচলিত লোকভাষা মিশিয়ে তাঁর ভাষণের ভাষায় ব্যবহার করেছেন।
বাংলা গদ্যসাহিত্যে বৈঠকী ঢং প্রথম নিয়ে আসেন প্রমথ চৌধুরী (১৮৬৭-১৯৫৪) তাঁর সবুজপত্র (১৯১৪) পত্রিকায় প্রকাশিত বীরবলী ঢংএর গদ্যে। বঙ্গবন্ধুর ভাষণের ভাষাতেও সে বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান। মানুষকে তাঁর ভাষণের সাথে সক্রিয় করতে ভাষণে তিনি ওয়াজ ফরমানোর মতো করে বৈঠকী ঠাঁট কিংবা আড্ডার ঢং ব্যবহার করেছেন: ‘... জাতিকে গঠন করার সংগ্রামে আপনারা আমার সঙ্গে আছেন কি না, হাত তোলেন, আমি দেখতে চাই। হাত নামান। হাত নামান, হাত নামান, ঠিক আছে’ (০৩ জুলাই, ১৯৭২, কুষ্টিয়া, পৃ. ১০৬)। এভাবে জনগণের সাথে ভাষণের মাধ্যমে সংযোগ স্থাপন করা; অন্যকথায় ভাষণকারের সাথে ভাষণের দর্শককে সম্পৃক্ত করবার কৌশল বঙ্গবন্ধুর ভাষাশৈলীর অন্যতম বৈশিষ্ট্য। বঙ্গবন্ধু তাঁর ভাষণের প্রতিটি ঘটনায় জনগণকে সম্পৃক্ত করেছেন, জনগণের হয়ে কথা বলেছেন। তাই বঙ্গবন্ধুর ভাষণে কথোপকথনের ঢং-এ কিছুক্ষণ পরপর ‘আপনারা’, ‘ভায়েরা’ ইত্যাদি সম্বোধন পাওয়া যায়। কারণ, একজন জননেতা কথা বলতে গিয়েও জনগণের সাথে মিশে গিয়ে তাঁদের সাথে সংযোগ স্থাপন করতে চাইবেন এটাই স্বাভাবিক।
বাংলা ভাষায় শব্দনির্মাণের এলাকায় ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত একটি উপায়: শব্দের দ্বিত্ব। এই শব্দের দ্বিত্বের মাধ্যমে নানা বিচিত্র অর্থ প্রকাশিত হয়ে থাকে। শব্দদ্বিত্ব বলতে শুধু একই শব্দের বা পদের পুনরাবৃত্তি বোঝায় না। অনুকার শব্দও শব্দদ্বিত্বের অন্তর্গত। এই অনুকার শব্দের ব্যবহারও বঙ্গবন্ধুর ভাষণে প্রচুর। যেমন: ‘এর মধ্যে কোনও কিন্তু ফিন্তু নাই’ (পৃ. ৩২ ও ৩২১)। ‘গদি-ফদি আমি চাই না’ (পৃ. ৬৫)। ‘ফুটফাট চুপচাপ ফুঁসফাঁস করেন’ (পৃ. ৯৬)। ‘দেশের জন্য কাজ করো, বড় বড় বক্তৃতা ফক্তৃতা বাদ দাও’ (পৃ. ১০১)। ‘অস্ত্র টস্ত্র’ (পৃ. ১০৫), ‘শহরে ফহরে’ (পৃ. ১০৬), ‘চোর চোট্টা’ (পৃ. ১০৮), ‘বুইঝা সুইঝা চল’ (পৃ. ১৬৮), ‘আমার কছে দাবিদুবি নাই। আমি ওই প্রধানমন্ত্রী টধানমন্ত্রী মানিটানি না’ (পৃ. ১৯১), ‘ভিক্ষাটিক্ষা’ (পৃ. ১৯৮), ‘হত্যা-ফত্যা’ (পৃ. ১৯৯) , ‘কারখানা ফারখানা’ (পৃ. ২০১)। ‘ফাঁসি-টাঁসি, কবর-টবর’ (পৃ. ২০৮), ‘দাবায়ে দুবায়ে’ (পৃ. ২৩৮), ‘উল্টাপাল্টা’ (পৃ.২৩৯), ‘তাই ছেলেরা নকল আর চলবে টলবে না’ (পৃ. ৩৪৭), ‘ভয়-টয় আমি করি-টরি খুব কম’ (পৃ. ৩৪৯), ‘কিন্তু টিন্তু নাই’ (পৃ. ৩৫০)। দ্বিরুক্ত শব্দ বা শব্দের পুনরাবৃত্তির ব্যবহারও তাঁর ভাষণের লক্ষ্যণীয় শৈলী: ‘গটর গটর মদ খাইয়া পড়ে থাকেন আর ইসলাম ইসলাম করেন’ (পৃ. ৯৫)। বাংলা ভাষায় বেশ কিছু ধ্বন্যাত্মক শব্দ আছে যেগুলি রূপে যমজ, অর্থাৎ দুটি সমান উপাদানে গঠিত বলে মনে হয়, কিন্তু আসলে এগুলো দ্বিত্বের উদাহরণ নয়। ফলে এগুলির অর্ধাংশ যেমন কোনো অর্থের প্রকাশ করে না, তেমনি তার প্রয়োগও সম্ভব নয়। এইগুলোকে বলে যমজ ধ্বন্যাত্মক শব্দ। এ জাতীয় শব্দের প্রয়োগও বঙ্গবন্ধুর ভাষণের ভাষায় ব্যাপক: ‘এখনও ঘুচুর ঘুচুর ফুচুর ফুচুর বন্ধ হয় নাই’ (পৃ. ১৯৯)। ভাবের বৈচিত্র্য প্রকাশে একই শব্দ অথবা প্রায় সমার্থক অথবা বিপরীতার্থক শব্দ পরপর দুবার পূর্ণরূপে অথবা ঈষৎ পরিবর্তিত রূপে প্রয়োগ হওয়াকে পুনরুক্তি বা শব্দদ্বৈত বলে। শব্দটি দুবার উচ্চারণের মধ্য দিয়ে ধ্বনিগত ও প্রতিধ্বনিগত হয়ে কানে প্রবেশ করে ও অর্থটি গভীর থেকে গভীরতর ও ব্যাপক হয়। বঙ্গন্ধুর ভাষণেও সে-গুণ ব্যাপক বিদ্যমান। এসবের ব্যবহার তাঁর ভাষণের ভাষাকে যেমন শ্রুতিমধুর ও ধ্বনি-ব্যঞ্জনাময় করেছে, তেমনি বক্তব্যকে করেছে সহজ ও প্রাণবন্ত।
একাত্তরের সাতই মার্চের ভাষণে ব্যবহৃত শব্দের পরিসংখ্যানে দেখা যায়:
বঙ্গবন্ধু সবচেয়ে বেশি: একশতেত্রিশ বার ব্যবহার করেছেন বক্তা পক্ষের বা উত্তম পুরুষের সর্বনাম (আমার ৪০, আমি ৩৬, আমরা ২৭, আমাদের ২৪, আমাকে ৬ বার)। তার পরেই ৪৫ বার ‘না’ ক্রিয়াবিশেষণ পদাণু এবং ৩১ বার আছে মানী শ্রোতা পক্ষের বা সম্ভ্রমাস্মক মধ্যম পুরুষের সর্বনাম (আপনারা ১৯, আপনাদের ৬, আপনি ৫, আপনার ১) তোমরা ও তোমাদের এই দুটি সাধারণ মধ্যম পুরুষের সর্বনাম চারবার করে ব্যবহার করলেও এর পরে বহুল ব্যবহৃত শব্দ: ‘করে’ ও ‘হবে’ যথাক্রমে ছাব্বিশ বার এবং ঊনিশ বার। দেশের সমস্যাকে তিনি নিজের সমস্যা মনে করেছেন বলেই আমার-আমি-আমরা ইত্যাদি ব্যবহার করেছেন শতাধিক বার আর অন্যায়-অবিচার মানবেন না বলেই ‘না-নাই’ উচ্চারণ করেন প্রবল দ্রোহে প্রায় অর্ধশত বার; অথচ প্রবল ক্ষোভের মধ্যেও পশ্চিমা শাসকগোষ্ঠীকে আপনি বলতে ভোলেননি। অতীত ইতিহাস আর বর্তমান শাসকগোষ্ঠীর নিপীড়ন-নির্যাতন বর্ণনা করতে বার বার এসেছে ‘করে’ ক্রিয়াপদ। আর ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা ও স্বপ্ন বর্ণনায় বার বার এসেছে ‘হবে’ ক্রিয়াপদ। বঙ্গবন্ধুর অন্যান্য ভাষণেও শব্দের অনুপাত অনেকটা একই। তবে বঙ্গবন্ধুর ভাষণসমগ্রে ব্যবহৃত শব্দের পরিসংখ্যান-অনুপাত নিয়ে আরও বিস্তৃত গবেষণা সম্ভব।
শামসুর রাহমানের ‘স্বাধীনতা তুমি’ কিংবা আবু জাফর ওবায়দুল্লাহর ‘আমি কিংবদন্তির কথা বলছি’ কবিতার মতো বঙ্গবন্ধুর ভাষণেও একই ধাঁচের বাক্যের বারংবার ব্যবহার পাঠক-শ্রোতাকে নাড়া দেয়। তাঁর ভাষণের ভাষায় এই কাব্যিক পুনরাবৃত্তির নমুনা প্রচুর দেখা যায়: ‘ভুলে যেয়ো না, এই বাংলা তিতুমীরের বাংলা। ভুলে যেয়ো না, এই বাংলা সূর্যসেনের বাংলা। ভুলে যেয়ো না এই বাংলা নেতাজি সুভাষচন্দ্রের বাংলা। ভুলে যেয়ো না এই বাংলা ফজলুল হকের বাংলা। ভুলে যেয়ো না এই বাংলা সোহরাওয়ার্দীর বাংলা’ (০৫ ফেব্রুয়ারি, ১৯৭২, কলকাতা, পৃ. ৩০)। বঙ্গবন্ধু এই ধারাবাহিক উপস্থাপনের মধ্যদিয়ে বাঙালির ইতিহাস, আবেগ আর আগামীর স্বপ্ন-সম্ভাবনাকে একত্রে শিল্পরূপ দান করেছেন, তাঁর নান্দনিক ভাষার কৌশল প্রয়োগের মাধ্যমে। তিনি যেমন নান্দনিক ভাষণদানে দক্ষ, তেমনি বিক্ষুব্ধ জনতার সামনে বিপ্লবী-বিদ্রোহী সুরে ভাষণ দিতেও তিনি পিছাপা হননি। ১৯৪৯-এর ১১ অক্টোবর ঢাকার আরমানিটোলায় আওয়ামী মুসলিম লীগের জনসভায় খাদ্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির প্রতিবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, ‘একজন অন্য একজনকে খুন করলে তার ফাঁসি হয়। যে নূরুল আমীন শত শত লোককে খুন করেছে তার কী হওয়া উচিত ? তাকে এই জনতার আদালতে বিচার করে গুলি করে মারা উচিত।’ এমন উত্তেজনাপূর্ণ বক্তৃতা করতে করতে গালি দিতেও ভুলতেন না তিনি। ভদ্রলোকেরা মনে করেন গালি মানেই অশ্লীল ও অশোভন। তবে ভাষাবিজ্ঞানী মাত্রেই স্বীকার করেন: ‘গালিগালাজে একধরনের মানসিক উত্তেজনা প্রশমন বা রিলিজ হয়। এই গালাগাল থেকে অ্যারিস্টটলীয় না হোক অন্য ধরনের মোক্ষণ বা ক্যথারসিস যে হয় তার প্রমাণ সকলের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা থেকেই পাওয়া যাবে।’ সুতরাং প্রকাশ্যে বিশেষত জনসভায় ভাষণে গালি দিতে পারাও এক ধরণের বাচিক শক্তি। বঙ্গবন্ধুর সে শক্তিরও কমতি ছিল না। শত্রুকে যুদ্ধে-রাজনীতিতে, আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে আক্রমণের পাশাপাশি বাচিক আক্রমণেও তিনি সদা সচেষ্ট থেকেছেন, ঘৃণার তীব্র বাক্যবাণ ছুড়েছেন অবিরত: ‘এই নরপশুরা বাংলার সম্পদ নিয়ে খুশি হয় নাই, আমার গ্রামকে গ্রাম ছারকার করে দিয়ে গেছে। এরা মানুষ না এরা অমানুষ। অমানুষ বললেও ভুল হবে। নমরুদ ফেরাউন যে অত্যাচার করে নাই, হিটলার মুসোলিনি যে অত্যাচার করে নাই, চেঙ্গিস খাঁ যে অত্যাচার করে নাই, এই নরপশুর দল বাংলার গ্রামে-গ্রামে, হাটে-হাটে বাজারে-বাজারে সে অত্যাচার করেছে’ (১০ মে, ১৯৭২, পাবনা, পৃ. ৮৬)। এখানে বঙ্গবন্ধু বস্তিবাসীর ব্যবহৃত গালি ব্যবহার করেননি, বরং মধ্যবিত্ত বাঙালির পারিবারিক ঝগড়ায় বহুল ব্যবহৃত পশুনামবিশিষ্ট মেটাফরের গালি ব্যবহার করেছেন। সাধারণ জনগোষ্ঠীর ধর্মীয় শব্দ ব্যবহার করেছেন। বিশ্ব-ইতিহাসের বিভিন্ন হিংস্্র চরিত্রকেও ব্যবহার করেছেন। গালিতেও কবিতার মতো রূপকের প্রচুর প্রয়োগ লক্ষণীয়। এখানে পশুনামবাচক শব্দ ও তীব্রতর শব্দের অর্থের প্রসার ঘটে মানুষের উপর তার আরোপের ফলে। তবে সকলেই জানেন সবশ্রেণির মানুষের গালির ভাণ্ডার যেমন এক নয়, তেমনি সব জায়গায় একই রকম গালির ব্যবহারও বাস্তবসম্মত নয়। অনেক সময় বরং, ‘যদি সোজা করে না বলা হয়, যদি তাতে অলংকার থাকে উপযুক্তমতো, তাতেই কাজ দেয় বেশি। জ্ঞানের ভাষায় চাই স্পষ্ট অর্থ; ভাবের ভাষায় চাই ইশারা, হয়তো অর্থ বাঁকা করে দিয়ে।’ তাই ভাষাকে আলংকারিক করে বাঁকিয়ে-ঘুরিয়ে আবরণ দিয়ে বলার মধ্যেই বক্তার শৈলী বা মুন্সীয়ানা ফুটে ওঠে: ‘যুদ্ধের সময় তোমার পশ্চিম পাকিস্তানের মুসলমান নামধাররি সৈনিকরা আমার বোনদের ধরে নিয়ে বাংকারে রেখেছে। হাজার হাজার মহিলাদের আমরা উদ্ধার করেছি। কত বড় পশু তোমার লোক। তোমরা মানুষ? তোমরা মানুষের বাইরে। তোমরা অসভ্য। তোমাদের গালি দেওয়ার ভাষা বাংলাতে নাই উর্দুভাষায় থাকতে পারে’ (২৬ মার্চ, ১৯৭২, ঢাকা, পৃ. ৫৪)।
এভাবে ধর্ষিতা মা-বোনদের কথা তিনি আবরণ দিয়ে বলেছেন পাশবিক নির্যাতনের শিকার। গালি দিতে দিতেও ক্ষোভ না মিটলে মাতৃভাষার অক্ষমতার কথা অনুমান করেছেন। আবরণ দিয়ে রূপক দিয়ে বলেছেন: ‘ভুঁড়িওয়ালা’,‘সাদা কাপড় পরা’ কিংবা ‘চাটার দল’ ইত্যাদি। এই ব্যক্তিগত বাগর্থ পরিবর্তন আর কিছুই নয়; এক ধরনের অর্থ সংক্রম- নিজের উদ্দিষ্ট অর্থটি অন্য একটি শব্দে আরোপ করা। এগুলি অবশ্যই ব্যক্তির নিভাষা-এর অন্তর্গত, তা সমগ্র ভাষায় ব্যাপক ও স্থায়ী প্রভাব সৃষ্টি করে না। এ অনেকটাই ব্যক্তিগত সম্পর্কের কারণেও সৃষ্ট হতে পারে। যেমনটা তিনি সমকালীন তিন সাংবাদিক বন্ধু: ফয়েজ আহমদ, এবিএম মূসা ও আবদুল গাফফার চৌধুরী কে নাম দিয়েছিলেন যথাক্রমে আপদ, বিপদ ও মুসিবত। ভাষণেও বঙ্গবন্ধু ব্যাপক রূপক ব্যবহার করতেন। যেমন, মহান ভাষাদিবস উপলক্ষ্যে কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে আয়োজিত জনসভায় ভাষণে বঙ্গবন্ধু বলেন: ‘আজ শহিদ দিবসে শপথ নিতে হবে, যে পর্যন্ত না ৭ কোটি মানুষ তাঁর অধিকার আদায় করতে না পারবে সে পর্যন্ত বাংলার মা-বোনেরা বাংলার ভাইয়েরা আর শহিদ হবে না, গাজী হবে’(২১ ফেব্রুয়ারি, ১৯৭১, ঢাকা, পৃ. ১১)। গাজী মানে যুদ্ধজয়ী বীর। এই রূপকের মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধু বিজয়ের বহু পূর্বেই এক বিজয়ী বাঙালি জাতিকে নির্দেশ করেছেন। এভাবে রূপককে শুধু সাহিত্যের অলঙ্কারে সীমাবদ্ধ রাখেননি বঙ্গবন্ধু। একে তিনি বাঙালিকে উদ্দীপিত করবার হাতিয়ার হিসেবেও ব্যবহারের দক্ষতা দেখিয়েছেন।
তাই বলে সোজাসাপ্টা কথা বলবার সাহস যে হারাননি সে কথাও মনে রাখা দরকার। তাঁকে সোজা ভাষায় স্পষ্ট করেও বলতে শুনি: ‘আমি আপনারা অসন্তুষ্ট হবেন না আমি সোজা কথা বলি যদি কিছু সংখ্যক আমার দেশের অ্যাডমিনিস্টেটর যারা আছেন তারা আর কিছু শ্রমিক নেতারাই গোলমাল সৃষ্টি করেন শ্রমিকদের আমি দোষ দিবার পারি না’ (৪ ডিসেম্বর, ১৯৭৪, ঢাকা, পৃ. ৩১৮)। আবার, আবরণ যখন আরও আলংকারিক হয় তখন মুখের কথাই সাহিত্যিক উপমায় সমৃদ্ধ ভাষার রূপ লাভ করেছে। বাংলার প্রকৃতি থেকে নেওয়া এমন উপমাযুক্ত বাক্যও বঙ্গবন্ধুর ভাষণে বিস্তর: ‘এই বাংলা যেমন পলি মাটির বাংলা, চৈত্র মাসের প্রখর রৌদ্রের সময় এই বাংলার মাটি এমন শক্ত হয় যার আঘাতে অনেকের মাথা ছিন্ন ভিন্ন হয়ে যায়’ (০৫ ফেব্রুয়ারি, ১৯৭২, কলকাতা, পৃ. ৩০)। সদ্য স্বাধীন দেশের অস্বস্থিকর অবস্থা বর্ণনাতেও তিনি চমৎকার উপমা ব্যবহার করেন: ‘আমার দশা হয়েছে গায়ে কাপড় দেয়ার মতো। মাথায় দিলে পাও খালি, পাও দিলে গলা খালি’ (২৯ মার্চ, ১৯৭২, চট্টগ্রাম, পৃ. ৫৯)। রূপসী বাংলার কবি জীবনানন্দ দাশ এর মতে ‘উপমাই কবিত্ব’। বঙ্গন্ধুর ভাষণে তাঁর কবিত্বগুণ বাংলার রূপময় প্রকৃতিকে ভিত্তিকরেই গড়ে উঠেছে। বাংলার প্রকৃতিই যেন তাঁর ভাষাকে করেছে অলঙ্কারসমৃদ্ধ। ভাষা ও সাহিত্যের অলঙ্কার সম্পর্কে ভাষাতাত্তি¡কের অভিমত এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য: ‘যে গুণ দ্বারা ভাষার শক্তি-বর্ধন ও সৌন্দর্য-সম্পাদন হয় তাকে অলঙ্কার বলে। মনুষ্য দেহে সুন্দর অলঙ্কার ধারণে যেমন তাহার সৌন্দর্য-বৃদ্ধি হয়, তদ্রুপ বিশেষ বিশেষ সুন্দর ভঙ্গীময় প্রকাশে ভাষার উপযোগিতা ও অন্যান্য গুণ আরও ফুটিয়া উঠে, এবং তাহাতে ভাষা শ্রোতার শ্রবণ-শক্তি ও বোধ-শক্তি, ধারণা-শক্তি ও ভাবনা-শক্তির পক্ষে সুখকর ও সাহায্যকর হইয়া থাকে।’ আর তাই, বঙ্গবন্ধুর ভাষণের ভাষার এই অলঙ্কারময়তা আজও তাঁর ভাষণকে বাঙালির কাছে সুখকর করে রেখেছে। কাব্যভাষার আকেটি শৈলী অনুপ্রাসও তাঁর ভাষণে বিস্তর দৃশ্যমান: ‘কিন্তু দুঃখের বিষয়, আজ দুঃখের সঙ্গে বলতে হয় ২৩ বছরের করুণ ইতিহাস, বাংলার অত্যাচারের, বাংলার মানুষের রক্তের ইতিহাস, ২৩ বছরের ইতিহাস, মুমূর্ষু নর-নারীর আর্তনাদের ইতিহাস, বাংলার ইতিহাস এদেশের মানুষের রক্ত দিয়ে রাজপথ রঞ্জিত করার ইতিহাস।’ (০৭ মার্চ, ১৯৭১, ঢাকা, পৃ. ১৪)। এই একটিমাত্র বাক্যে ৬ বার ইতিহাস শব্দের ব্যবহারে ধ্বনি-ব্যঞ্জনা আর অনুপ্রাস সৃষ্টির সাথে সাথে ২৩ বছরের পাকিস্তানী উপনিবেশের ইতিহাস রেসকোর্সের দর্শক-শ্রোতার রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রতিধ্বনিত হয় যেনো বক্তব্যের ভাষিক ঐশ্বর্যে।
সাংবাদিক এবিএম মূসা তাঁর মুজিব ভাই (২০১২) গ্রন্থে আব্রাহাম লিংকনের গেটিসবার্গ ভাষণ, উইনস্টন চার্চিলের যুদ্ধকালীন একটি বেতার ভাষণ এবং শেখ মুজিবুর রহমানের সাতই মার্চের ভাষণের অপূর্ব মিল দেখিয়ে মন্তব্য করেছেন: তবে রেসকোর্স ময়দানের ভাষণটি ছিল আমার মতে আরও অনেক বেশি সুদূরপ্রসারী, অনেক বেশি তাৎপর্যপূর্ণ এবং ভাষার মাধুর্য ও বাক্যবিন্যাসের বিচারে অনেক মধুর। ... তাই সাতই ভাষণ পড়তে হবে, বিশ্লেষণ করতে হবে আবেগ দিয়ে নয়। একাত্তরের পটভূমিতে প্রতিটি শব্দ, বাক্য ব্যঞ্জনাকে উপলব্ধি করতে হবে। এর সাথে যোগ করতে চাই বঙ্গবন্ধুর প্রতিটি ভাষণই সমকালের প্রেক্ষাপটে উপলব্ধি করতে হবে এবং লব্ধ ধারণার নির্মোহ প্রয়োগ ঘটাতে হবে একালে। তবেই বাংলাদেশ পৌঁছাতে পারবে আরও সুন্দর আলোকিত এক সকালে। কেননা, কাবেদুল ইসলামের ভাষায়: ঐতিহাসিক এ ভাষণ নানা কারণে আমাদের জাতীয় জীবনে অতীব তাৎপর্যপূর্ণ, এবং এর প্রভাবও অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী। ভাষণটির যেমন রয়েছে অপরিসীম রাজনৈতিক গুরুত্ব ও বহুমাত্রিক মাহাত্ম্য, তেমনি ভাষা ও ব্যাকরণগত দিকগুলোও এর বৈচিত্র্যপূর্ণ ও শিক্ষাপ্রদ । ... তাঁর জীবনের এই শ্রেষ্ঠ ভাষণ ও কথাকাব্যে ভাষাশিল্পের এক অসাধারণ জাদু স্ফুরিত হয়েছে। জাদুর এই জীয়নকাঠি পারে বাংলা ভাষাকে আজকের এই অবমাননাকর অবস্থা থেকে মুক্ত করে মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করতে।
বায়ান্নোর একুশে ফেব্রুয়ারির আগে থেকেই বঙ্গবন্ধু কারা হাসপাতালে থেকে বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষার সংগ্রামে অংশ নেন। ১৬ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ থেকে অনশন শুরুর ঘোষণা দেওয়াতে তাঁকে ফরিদপুর কারাগারে পাঠিয়ে দেয় সরকার এবং অসুস্থ হয়ে পড়াতে গণদাবির মুখে ২৭ ফেব্রুয়ারি তাঁকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। শেখ মুজিবুর রহমান ২৭ এপ্রিল (১৯৫২) ঢাকা বার এ্যাসোসিয়েশনে অনুষ্ঠিত সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা কর্মী পরিষদের সম্মেলনে উপস্থিত হন এবং আলোচনায় সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। সভায় তিনি বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে গণভোটের প্রস্তাব করলে তা সভায় সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়। সে দিনের ভাষণে বঙ্গবন্ধু বলেন: ‘দীর্ঘ আড়াই বছর কারাবাসের পর আপনাদের সামনে উপস্থিত হয়েছি। আপনারা যখন ভাষা সংগ্রামে লিপ্ত ছিলেন, আমি তখন কারাগারে অনশনরত। আপনারা সংঘবদ্ধ হোন, মুসলিম লীগের মুখোশ খুলে ফেলুন। এই মুসলিম লীগের অনুগ্রহে মওলানা ভাসানী, অন্ধ আবুল হাশিম ও অন্য কর্মীরা আজ কারাগারে। আমরা বিশৃঙ্খলা চাই না। বাঁচতে চাই, লেখাপড়া করতে চাই। ভাষা চাই... মুসলিম লীগ সরকার আর ‘মর্নিং নিউজ’ গোষ্ঠী ছাড়া প্রত্যেকেই বাংলা ভাষা চায়।’ একই বক্তব্যে বঙ্গবন্ধু সোহরাওয়ার্দী কর্তৃক বাংলাকে আঞ্চলিক ভাষা হিসেবে মর্যাদা দানের সুপারিশের বিরোধিতা করে যুক্তি উপস্থাপন করেন। লক্ষণীয়, শেখ মুজিব তাঁর নেতাকেও বাংলা ভাষা সম্পর্কে আঞ্চলিক ভাষা করার সুপারিশের পরিপ্রেক্ষিতে বিরোধিতা করতে ছাড়েননি। এ থেকে শেখ মুজিবের দৃঢ়চিত্ততা ও নেতৃত্বের স্বাক্ষর মেলে। ... একটি বিষয় রীতিমতো চমকে দেয়ার মতো যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যে সোহরাওয়ার্দীকে রাজনৈতিক গুরুর সম্মান দিতেন বাংলা ভাষার প্রশ্নে তিনি তাঁর সঙ্গেও দ্বিমত পোষণ করেন। বাংলা ভাষার প্রতি কী অসাধারণ দরদ থাকলে কেউ এমন ব্যতিক্রমী সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। আর তাই অনায়াসে বলা যায় বঙ্গবন্ধুর বাংলা ভাষার প্রতি প্রেম তাঁর রাজনীতির তাঁর ভাষণের মূল শক্তি।
বঙ্গবন্ধুর ভাষণের ভাষার আলোচনায় প্রমাণিত হয়: তিনি তাঁর মাতৃভাষাকে অর্থাৎ সেসময়ের পূর্ববাংলার বা বর্তমানের বাংলাদেশের মানুষের কথ্যভাষাকে তাঁর ভাষণের ভাষায় ঠাঁই দিয়েছেন নিপুণ দক্ষতায়। তিনি কেবল বাংলা ভাষাভিত্তিক জাতিরাষ্ট্র জন্মদেননি, বাংলা ভাষাকেও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিয়ে গেছেন। মাতৃভাষা ব্যবহারে বাঙালির হীনমন্যতা বিতাড়িত করেছেন। বাংলা ভাষার বিস্তৃতিও ঘটিয়েছেন দেশে বিদেশে বাংলায় ভাষণ দিয়ে। ভাষা ব্যবহার করে বক্তারা কী করতে চান, তাঁদের উদ্দেশ্য বা বিবক্ষা কী, সেই অনুযায়ী ভাষার কয়েকটি কাজ বা ভূমিকা নির্দেশ করেছিলেন রোমান ইয়াকবসন প্রমুখ ভাষাবিজ্ঞানীরা। সেগুলি হল: ১. নির্দেশাত্মক বা জ্ঞাপনাত্মক; ২. আবেগাত্মক; ৩. সৌজন্যাত্মক; ৪. প্রেরণাত্মক; ৫. ভাষাবীক্ষা বা অধিভাষাত্মক এবং ৬. কাব্যিক । বলা বাহুল্য, বক্তার ভাষাব্যবহারের এই পৃথক পৃথক লক্ষ্য অনুযায়ী তাঁর উদ্দিষ্ট অর্থের চরিত্রও বদলাবে। অথচ বঙ্গবন্ধুর ভাষণের ভাষায় বক্তার লক্ষ্য মোটেই পৃথক নয়, অনেকটাই যেন মনে হয় ভাষার উপর্যুক্ত ৬টি ভুমিকাই তাঁর ভাষণগুলো ধারণ করে আছে। যেমনটা কবি বলেন, ‘একটি কথার দ্বিধাথরথর চূড়ে / ভর করেছিল সাতটি অমরাবতী;’ তেমনি যেনো বঙ্গবন্ধুর এক-একটি ভাষণ ভাষার ছয়টি কাজকেই তোলে ধরে। বঙ্গবন্ধু যখন ‘২৩ বছরের করুণ ইতিহাস’ বলেন, ৯ মাসের মুক্তিযুদ্ধকালীন নির্যাতনের কথা বলেন, ‘বাংকার থেকে মা-বোনদের’ উদ্ধারের কথা বলেন তখন তিনি নির্দেশাত্মক বা বর্ণনাত্মক বা জ্ঞাপনাত্মক ভাষা-ভূমিকার উদাহরণ সৃষ্টি করেন। আবার যখন তিনি ‘দুঃখ ভারাক্রান্ত মন নিয়ে’ বলেন, ‘আপনারা সবি জানেন এবং বোঝেন’ কিংবা ‘কী অন্যায় করেছিলাম?’ (পৃ. ১৪), তখন অতি আচমকা তাঁর ভাষার ভূমিকা আবেগাত্মক হয়ে ওঠে। তাঁর সৌজনাত্মক ভাষা ব্যবহারের দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় যখন তিনি ভাষণ শুরুতে ‘ভায়েরা আমার’ (পৃ. ১৪) কিংবা ‘আমার ভায়েরা ও বোনেরা’ (পৃ. ২৫) এমন শিষ্ট সামাজিক সম্ভাষণ দিয়ে ভাষণ শুরু করেন তখন; সৌজন্যমূলক এসব সম্বোধনে ঐ শব্দগুলোর অর্থেরও বিস্তার ঘটেছে। এমনকি ভাষণ শেষ করতে গিয়ে তিনি যেমনটা বলতেন ‘আসসালামুআলাইকুম’, ‘খোদা হাফেজ, জয় বাংলা’ (পৃ. ৬৬, ৩০৮, ৩১১, ৩৫০) তখনও মূর্ত হয়ে ওঠে সৌজন্যমূলক ভাষার ভূমিকার নমুনা। কেননা, এ শব্দগুচ্ছ সামাজিক সংহতি সৃষ্টি ও বজায় রাখার জন্য ব্যবহৃত। তবে প্রেরণাত্মক বা প্রবর্তনাত্মক ভাষাব্যবহার বঙ্গবন্ধুর ভাষণে বহুল: ‘আপনারা নিশ্চই বিশ্বাস করেন এবং জানেন শহিদের রক্ত কোনো দিন বৃথা যায় নাই, ...আপনারা প্রস্তুত হয়ে যান’ (২১ ফেব্রুয়ারি, ১৯৭১, ঢাকা, পৃ. ১৩)।এই বাক্যগুলো আক্ষরিক জ্ঞাপনের চেয়ে আরও বেশি কিছু করে, ফলে নিছক বাগর্থতত্ত্বের এক্তিয়ার অতিক্রম করে যায়। কেননা, ভাষাবিজ্ঞানীমাত্রেই জানেন, প্রবর্তন-প্রক্রিয়ার লক্ষ্য হলো শ্রোতার ইচ্ছার পরিবর্তন ঘটানো, জ্ঞানের নয়। মুক্তিযুদ্ধের আগের ভাষণগুলোতে বঙ্গবন্ধু তাঁর ভাষার এই ভূমিকাকে কাজে লাগিয়ে বাঙালি জাতিকে মুক্তিযুদ্ধে উদ্বুদ্ধ করেছেন; ভেতো-ভীতু বাঙালির শুধু ইচ্ছাকেই পরিবর্তন করেননি; এঁদের বীর বাঙালিতে রূপান্তরিত করেছেন। অন্যদিকে মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জনের পরে বিভিন্ন ভাষণে বঙ্গবন্ধু ভাষার অধিভাষাত্মক ভূমিকাকে কাজে লাগিয়ে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধানের চারটি মূলনীতিকে ভাষাবীক্ষণের জন্য প্রস্তুত পরিভাষার মতো করে বিশ্লেষণ করেছেন। বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের ইতিহাস থেকে ধর্মের নামে রাজনীতি করে রাজাকার-আলবদর পয়দার প্রমাণ তুলে ধরে বাংলাদেশ থেকে সাম্প্রদায়িক রাজনীতি বন্ধ করতে চেয়েছিলেন। আর তাই ইতিহাস ও ধর্মগ্রন্থের নজির দেখিয়ে একজন অর্থতাত্ত্বিকের মতো রাষ্ট্রের চারটি আদর্শকে অব্যর্থ ভাষায় তিনি ব্যাখ্যা করেছেন তাঁর ঐসময়ের ভাষণগুলোতে।
রাষ্ট্রের চারটি মূলনীতিকে পরিভাষা বিবেচনা করে বঙ্গবন্ধু এর সংজ্ঞা দিয়েছেন বার বার; আক্ষরিকভাবে ব্যাখ্যা করেছেন সহজ ভাষায়। অথচ, বঙ্গবন্ধু যখন বলেন, ‘ঐ যে বলেছিলাম লাল ঘোড়া, ২০ তারিখের পর বাংলার মাটিতে লাল ঘোড়া দৌড়াবে, আমি বলে দেবার চাই’ (১৮ মার্চ, ১৯৭৩, ঢাকা, পৃ. ২৭৬)। তখন উক্তিটিকে আক্ষরিক অর্থে গ্রহণ করবার উপায় থাকে না; আবার তার আক্ষরিক অর্থকে পুরোপুরি অগ্রাহ্য করবারও সুযোগ থাকে না। এরকম ভাষার কাব্যিক প্রয়োগ তাঁর বক্তৃতায় বিস্তর বিদ্যমান। শুধু তাই নয় বক্তৃতায় কবিতার উদ্ধৃতি দিতেও তিনি কুশলতা দেখিয়েছেন। স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরে (১০ জানুয়ারি, ১৯৭২) রেসকোর্স ময়দানের প্রথম ভাষণেই তিনি বলেন: ‘কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, সাত কোটি বাঙ্গালেরে (সন্তানেরে) হে বঙ্গজননী (মুগ্ধ জননী), রেখেছো বাঙালি করে মানুষ করোনি। কবিগুরুর কথা মিথ্যা প্রমাণ হয়ে গেছে। আমার বাঙালি আজ মানুষ। ... আজ আমি বক্তৃতা করতে পারছি না। আপনারা বুঝতে পারেন। নম নম নম সুন্দরী মম, জননী জন্মভ‚মি, গঙ্গার তীর সিক্ত সমীর, জীবন জুড়ালে তুমি। আমার জীবন আজ যখন আমি ঢাকায় নামছি। তখন আমি চোখের পানি ধরে রাখতে পারি নাই’ (পৃ. ২০-২১)। কবিতার ব্যবহার তাঁর কনেণ্ঠর মাধুর্যে-আবেগে দর্শক-শ্রোতাকে আবিষ্ট-অভিভ‚ত করে রাখতো। তাই বলা যায়, তাঁর ভাষণের ভাষা যেনো হ্যামিলিয়নের সেই বাশিওয়ালার সুর। তরুণ গবেষকের মতে, বঙ্গবন্ধুর কণ্ঠে উচ্চারিত শব্দমালাকে অনুসরণ করে বাংলার মানুষ নিজেদের সর্বস্ব দেশের জন্য বিলিয়ে দিয়েছিলেন। যে মানুষটির ভাষণ থেকে একটি জাতির জন্ম তাঁর ভাষণে জাদু-রহস্যের চাবিকাঠি এর ভাষা। আফসোস হয় সেই শব্দমালার আদর্শ আমরা আজও পরিপূর্ণ প্রয়োগে অসমর্থ।
বাংলাদেশ এখন বক্তৃতার দেশ বললে খুব ভুল হবে না নিশ্চই। নেতারা বলতে ভীষণ ভালোবাসেন। গর্জন শোনা যায় প্রচুর। কিন্তু যে বক্তৃতা মানুষকে জাগায়, অন্ধকারে পথ দেখায় সে বক্তৃতা কই? উত্তর খুঁজতে একটু পেছন ফিরে তাকাতেই হয়। আর তখন একজনই তর্জনী উঁচিয়ে সামনে দাঁড়ান। তিনি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। দেশে শুধু নয়, বহির্বিশ্বেও অনেক গুরুত্বপূর্ণ বক্তৃতা করেছেন তিনি। অথচ তাঁর ৭ই মার্চের ভাষণ নিয়ে যথেষ্ট আলোচনা বিশ্লেষণ হলেও, তার অন্য শতাধিক ভাষণ নিয়ে কোনো আলোচনা বিশ্লেষণ তেমন চোখে পড়ে না। এমনকি আলোচিত ৭ই মার্চের ভাষণেরও সমাজভাষাবৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ বা শৈলীবিজ্ঞানসম্মত সর্বাঙ্গসুন্দর পরিপূর্ণ কোনো আলোচনা হয়েছে বলে মনে হয় না। প্রত্যাশা করা যায় অচিরেই এধরণের আলোচনায় অনেকেই এগিয়ে আসবেন। তাঁদের আলোচনায় তাত্ত্বিকতার সাথে বাস্তবতার বা বর্তমান সমস্যার সমাধানের পথ প্রদর্শিত হবে। এতে বাংলাদেশের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলাভাষা প্রতিষ্ঠিত হবে পূর্ণগৌরবে। প্রণীত হবে ভাষানীতি; এর ভিত্তিতে গৃহীত হবে ভাষা-পরিকল্পনা। উন্নতি হবে বাংলাদেশের শিক্ষার মানের। দেশে ভাষার ক্ষেত্রে বৈষম্যমূলক শিক্ষাব্যবস্থা দূর হবে। বাংলা ভাষার অর্থনৈতিক গুরুত্ব বাড়লে দেশে ভাষাগত সাম্য প্রতিষ্ঠিত হবে। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা বিনির্মাণের পথে বাংলাদেশে এগোবে আরও কয়েক ধাপ।
সূচক শব্দ: মানভাষা, লোকভাষা, উপভাষা, নি-ভাষা, মাতৃভাষা, রাষ্ট্রভাষা।
লেখক: কবি, ভাষাবিজ্ঞানী
সহকারী অধ্যাপক (বাংলা)
চিটাগাং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার কলেজ,
সিইউএফএল, চট্টগ্রাম - ৪০০০
ফোন: ০১৭১২-১৩০৭৪৭
আপনার মতামত লিখুন :