kalchitro
Bongosoft Ltd.
ঢাকা রবিবার, ৩১ মে, ২০২৬, ১৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

মুখোমুখি কথাশিল্পী চন্দন আনোয়ার


কালচিত্র | আলী রেজা প্রকাশিত: জানুয়ারি ৮, ২০২১, ১২:১০ পিএম মুখোমুখি কথাশিল্পী চন্দন আনোয়ার

বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক চন্দন আনোয়ারের আজ ৪৩তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে কালচিত্রের বিশেষ আয়োজনের এ পর্বে রয়েছে, দীর্ঘ সাক্ষাতকার। সাক্ষাতকার গ্রহণ করেছেন, আলী রেজা। কালচিত্রের পক্ষে দু'জনের প্রতি কৃতজ্ঞতা।

 

মুখোমুখি কথাশিল্পী চন্দন আনোয়ার

আলী রেজা

[চন্দন আনোয়ার, গল্পকার, ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক, গবেষক ও সম্পাদক। জন্ম ১৯৭৮ সালে নাটোরে। কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। তাঁর কর্মজীবন শুরু হয় ডিগ্রি পর্যায়ে কলেজ অধ্যাপনার মাধ্যমে। বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে রাজশাহী কলেজের বাংলা বিভাগে যোগদান করেন। তিনি ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ স্টাডিজ (আইবিএস), রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি আর্জন করেন। বর্তমানে তিনি নোয়াখালি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা পেশায় নিয়োজিত। গল্প-উপন্যাস-প্রবন্ধ মিলিয়ে এ পর্যন্ত চন্দন আনোয়ারের ১৬টি মৌলিক গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়া তিনি বহু মূল্যবান গ্রন্থ সম্পাদনা করেছেন। তাঁর গল্পগ্রন্থ :  প্রথম পাপ দ্বিতীয় জীবন; ২. অসংখ্য চিৎকার ; ৩. পোড়োবাড়ি ও মৃত্যুচিহ্নিত কণ্ঠস্বর, ৪. ইচ্ছামৃত্যু ইশতেহার; ৫. ত্রিপাদ ঈশ্বরের জিভ; ৬. আঁধার ও রাজগোখরা ৭. নির্বাচিত ৩০। উপন্যাস : ১. শাপিতপুরুষ; ২. অর্পিত জীবন।  প্রবন্ধগ্রন্থ : ১. বাংলা ছোটগল্প ও  তিন গোত্রজ গল্পকার : মানিক-হাসান-ইলিয়াস; ২. উজানের চিন্তক হাসান আজিজুল হক; ৩. হাসান আজিজুল হকের কথাসাহিত্য : বিষয়বিন্যাস ও নির্মাণকৌশল; ৪. নজরুলের জীবন ও কর্মে প্রেম; ৫. বাঙালির চিন্তাবিভূতি : সংস্কৃতি, সাহিত্য ও মুক্তিযুদ্ধ; ৬. কথাসাহিত্যের সোজাকথা; ৭. হাসান আজিজুল হক : আলাপন ও মূল্যায়ন।  সম্পাদিত গ্রন্থ : ১. শূন্যদশকের গল্প : গল্পপঞ্চাশৎ; ২. হাসান আজিজুল হক : নিবিড় অবলোকন; ৩. এই সময়ের কথাসাহিত্য ১ম খণ্ড ও ২য় খণ্ড; ৪ হাসান আজিজুল হক সমীপেষু। তাঁর সম্পাদনায় রাজশাহী থেকে প্রকাশিত হয় গল্প-বিষয়ক পত্রিকা ‘গল্পকথা’। সম্প্রতি চন্দন আনোয়ারের মুখোমুখি হয়েছিলেন কবি, প্রাবন্ধিক আলী রেজা। কথা বলেছেন শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি, সমাজ ও রাজনীতির নানা সঙ্গতি-অসঙ্গতি নিয়ে।]

আলী রেজা : বৈশ্বিক মহামারি চলছে। করোনা ভাইরাসের ছোবলে বিপর্যস্ত গোটা বিশ^ বাংলাদেশও করোনার নির্মম শিকারে পরিণত হয়েছে। প্রতিদিন মানুষ মারা যাচ্ছে। জীবন জীবিকা চলছে থমকে থমকে। শিক্ষাক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ধস নেমে এসেছে। আপনি একজন শিক্ষক সময়সচেতন লেখক। এই সময়বাস্তবতায় কেমন আছেন?

চন্দন আনোয়ার : এক মানুষের জীবন একটি নির্দিষ্ট সময়ের পরিধি। সেই পরিধির মধ্যে বসবাসকারী মানুষ তাঁর সময়ের ভাঁজে ও ফাঁদে বিচরণ করেন। আমরা যে সময়ে এসে পড়েছি, সেই সময়ের বৈশ্বিক বাস্তবতায়  যোগাযোগ-প্রযুক্তির এতোটাই বিস্ময় পরিবর্তন ঘটেছে, সুবিশাল পৃথিবীটা এখন ছোট্ট একটি যন্ত্রের ভেতরে প্রবেশ করে বসেছে। এই মুহূর্তে ফেসবুকে বা ইমো অথবা অন্যান্য আন্তর্জাতিক যে মাধ্যমগুলো আছে, তার একটিতে যে পোস্ট দিচ্ছি, বক্তব্য হোক, ছবি বা ভিডিও যাই হোক, পামির মালভূমিতে দাঁড়িয়ে একজন মুহূর্তের মধ্যে পেয়ে যাচ্ছে। এ কী অভাবিত বন্ধন তৈরি হয়েছে, ভাবাটাও কঠিন। পৃথিবীর সকল মানুষ এক জালে বন্দি, ঠিক খেউজালে বন্দি এক পুকুরের মাছের মতো। প্রযুক্তি প্রাবল্য এতোটা ভয়ানক হয়ে উঠেছে যে, পৃথিবীকে, পৃথিবীর ন্যারাচাল স্বরূপকে মানুষটা ভেঙেচুরে গুড়িয়ে একাকার করে ফেলেছে। আজ আর মানুষ কিছুতেই দাবি করতে পারে না, পৃথিবীর উপরে তার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ আছে। প্রকৃতি একটি নির্দিষ্ট সহ্যসীমা পর্যন্ত নীরব থাকে, কিন্তু সীমা লঙ্ঘিত হলে প্রকৃতি বিরূপ আচরণ করে, তার প্রমাণ পৃথিবীর মানুষ সভ্যতার শুরু থেকেই পেয়ে আসছে।  এই যে এতকাল ধরে বলে আসছি আমরা, খুব গর্বের সঙ্গে বলছি, বিশাল পৃথিবীটা একটা গ্রাম, কেতাবি ভাষায় ‘গ্লোবাল ভিলেজ’, তার অর্থ কী? একটি গ্রামের সব মানুষ-ই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে একে অপরের সঙ্গে সম্পৃক্ত, অর্থাৎ একই শরীর আর কি। পৃথিবীর বিশালত্ব, প্রকৃতির সহজাত প্রবণতা ও বিশালত্বকে  ছোট্ট একটি গ্রাম এবং হাতের মুঠোয় নিয়ে এসেছি। তার ফলে আমি আপনি আর কেউ নই অর্থাৎ নোবডি। আপনি আমার উন্নতিকে মেনে নেবেন, কিন্তু আমার দাম্ভিকতাকে তো মেনে নিতে পারেন না। বিজ্ঞান-প্রযুক্তি উত্থান পৃথিবীর কল্যাণের জন্য এবং মানব-সভ্যতার বিকাশের জন্য। ইতোপূর্বে ধর্ম-দর্শনের উদ্দেশ্যও তাই ছিল। প্রযুক্তির দাম্ভিক উত্থান প্রকৃতি একটি সীমানা পর্যন্ত মেনে নিয়েছে, আমার কেন জানি মনে হচ্ছে, এতো বাড়াবাড়ি প্রকৃতি গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছে। আপনি যা কিছুই করুন না কেন, মাটি বাতাস আলো জল প্রকৃতির এই চারটি মৌলিক উপাদান নিয়েই করছেন। এসব নষ্ট করা মানুষের জন্য আত্মঘাতী। মানুষ ভুলে গেছে, মানুষ এই প্রকৃতির অসংখ্য প্রাণির একটি প্রাণী মাত্র, তারাই একমাত্র পৃথিবীর অধিবাসী নয়; মানুষ ভুলে গেছে, বহু প্রজাতির প্রাণীকে প্রকৃতি চিরদিনের জন্য অস্তিত্বহীন করে দিয়েছে। সুতরাং প্রকৃতির উপরে প্রযুক্তির এতোটা দাম্ভিক প্রভাব বিস্তার, মানুষের জন্য কী সুখকর হচ্ছে? আমি জানি না, ভবিষ্যতে কী হবে, কিন্তু এতোটুকু বলতে পারি, এই পৃথিবী অর্থাৎ এই প্রকৃতি মানবপ্রজাতির আশ্রয় ও রক্ষাকর্তা; মানুষের অস্তিত্বের প্রয়োজনেই প্রযুক্তির সীমালঙ্ঘনকে ঠেকিয়ে দিতে হবে।

পৃথিবীর প্রত্যেকটি মানুষ যে কতো নিবিড়ভাবে পরস্পরের সাথে জড়িয়ে আছে, তা-ই জানিয়ে দিল করোনা ভাইরাসের সর্বব্যাপী বিস্তার। আমেরিকা কানাডার নাগরিক হলে নিরাপদ জীবন, আর তৃতীয় বিশ্বের দরিদ্র কোন রাষ্ট্রের নাগরিক হলে তার জীবনের নিরাপত্তা নেই, এই বিশ্বাসের সেতু ভেঙে ফেলেছে। পৃথিবীর সকল নাগরিক সমান এবং প্রত্যেক মানুষের মৌলিক অধিকারগুলোকে সুরক্ষা না করলে, তুমি যতো উন্নত রাষ্ট্রের নাগরিক-ই হও না কেন,  তোমার জীবন নিরাপদ নয়। সীমানা নির্ধারণ করে, কাঁটা তার দিয়ে, সশস্ত্র সীমান্ত-সুরক্ষা বাহিনীর পাহারা বসিয়ে আমরা যে আধুনিক রাষ্ট্রের পরিকাঠামো তৈরি করেছি, তার কানাকড়ি মূল্য নেই প্রকৃতির কাছে। এই চিরায়ত সত্য পৃথিবীর মানুষ বোধহয় এর আগে এমন বাস্তবভাবে এমন নিবিড়ভাবে উপলব্ধি করেনি। রাষ্ট্র আলাদা, কিন্তু জল বাতাস আলো মাটি এসব কী আলাদা করা যায়? অর্থাৎ আমরা পৃথিবীর সকল মানুষ বেঁচে আছি এক প্রকৃতির ছাতার নিচে। আমার জীবন-স্বাস্থ্য-অর্থনীতি অরক্ষিত রেখে অথবা দরিদ্র বলে আমার মৌলিক অধিকার কেড়ে নিয়ে, আমার নিশ্বাসের বাতাস-জল-আলো বিষাক্ত করে, উন্নতবিশ্ব তথা আমেরিকা-ইংল্যান্ড-রাশিয়া প্রভৃতি দেশ স্বাস্থ্য সুরক্ষানীতি তৈরি করবে, শিল্পে বিপ্লব ঘটিয়ে ফেলবে, মরণাস্ত্র তৈরি করবে, অস্ত্র শক্তির বলে নিজের সুখ-স্বার্থে যখন যেখানে ইচ্ছে যুদ্ধ বাঁধিয়ে দেবে, এই বৈষম্য কতোকাল মেনে নেবে প্রকৃতি? করোনা ভাইরাস এসে অন্তত এই সত্যটি জানিয়ে দিয়েছে, তুমি আমেরিকা-কানাডার নাগরিক হতে পারো, তোমার সুখ-স্বাস্থ্য-বিলাসে আমার আপত্তি নেই, কিন্তু তোমার ভুলে যাওয়া উচিত হবে না যে, আমরা একই প্রকৃতির অধীনে আছি, আমার রুগ্নতা আমার অপুষ্টি আমার জীবনের মৌলিক অধিকারগুলো বিপন্ন হলে তোমার দায় আছে।  এই যে এতো কথা বললাম, এর অর্থ এই নয়, করোনা ভাইরাসকে আমাদের জন্য কলাণের মনে করছি। তা নয় কিন্তু। আমার মনে করার সাথে এর কোন সম্পর্ক-ই নেই। শুধু আমার উপলব্ধিগুলো শেয়ার করলাম। 

. রে : আপনি লেখক জীবন শুরু করেছেন গল্প-উপন্যাস দিয়ে এখনো গল্প-উপন্যাসেই আছেন। সৃজনশীল সাহিত্যের এই ধারায় কাজ করেছেন অনেকেই। সময়ের পরিবর্তনে কবিতার ভাব,ভাষা বিষয়বস্তুতে পরিবর্তন ঘটেছে বিস্তর। গল্পের ক্ষেত্রে এই পরিবর্তনটা কীভাবে কতটা ঘটেছে, নাকি ঘটেইনি- ব্যাপারে আপনার মূল্যায়ন কি?

. : লিখছি ছেলে বয়স থেকেই। কিন্তু লেখক হবার সিদ্ধান্ত নিয়ে সচেতনভাবে লিখেছি প্রথমে একটি গল্প-ই। কবিতা নয়। গল্প-কিস্সা শোনার ঝোঁক আমার ছেলেবেলা থেকেই। খেলার চেয়ে গল্পশোনার প্রতিই আমার মনোযোগ ও আনন্দ দুটোই ছিল। আশেপাশের পরিচিতজনদের মধ্যে যারা গল্প-জানতেন বেশি। তাদের সঙ্গেই আমার ভাব-খাতির ছিল, পেছনে ঘুরে বেড়াতাম। বয়সের পার্থক্য বন্ধুত্বের বাধা হয়নি। বেশিরভাগ খাতিরের মানুষ ছিলেন বয়সে বড়। দাদা-বাবার বয়সী মানুষেরাই আমার সাধারণত বেশি বন্ধু হয়েছেন। আমার সবেচেয়ে ঘনিষ্টবন্ধুত্ব গড়ে উঠেছিল যে মানুষটির সঙ্গে তিনি আমার বাবার বিয়ের অনুষ্ঠানে গিয়েছিলেন। গত সপ্তাহে তিনি মারা গিয়েছেন। অবশ্য গল্প-কিসসা শোনার তৃষ্ণা প্রধানত মিটিয়েছে আমাদের বাড়ির মুনিষরা। বিরাট গেরস্থবাড়ি ছিল শৈশবে। অন্তত আট-দশ জন কাজের মুনিষ ছিলই। এছাড়া আশির দশক অর্থাৎ আমার ছেলেবেলার শ্রমজীবী মানুষের বিনোদন ছিল সিনেমা, যাত্রা ও কিসসার আসর। আমাদের আশেপাশের পাঁচ-ছয় গ্রামে টেলিভিশন বলতে ব্যাটারিচালিত সাদাকালো একটি টেলিভিশন ছিল। বাজার সমিতি কি কোনো ক্লাবের ছিল, মনে নেই। রাত হলেই আমাদের বাড়ির বিস্তৃত ওঠোন ভরে যায় গ্রামের মানুষে। কতো বিচিত্র রকমের কিসসা যে শুনেছি, আজও বেশ কিছু স্মৃতিতে আছে। গরমের জ্যোৎস্না রাতে কিসসা শুনে প্রায়শ ঘুমিয়ে পড়েছি ওঠোনে। এই গল্প-কিসসার প্রভাব আমার জীবনে একটি কারণ গল্পের প্রতি প্রথম থেকেই ঝোঁকে পড়া।

মানুষ আমি, সময়ের পরিবর্তনের সাথে প্রকৃতির নিয়মেই প্রতিনিয়ত পরিবর্তন ঘটছে আমার মধ্যে। এই পরিবর্তন শুধু জৈবিক পরিবর্তন নয়, চিন্তাচেতনার পরিবর্তন ঘটেছে। জীবনের অভিজ্ঞতা বেড়েছে, মানুষ চেনার পরিধি বেড়েছে, চতুর্দিকের অনিবার্য বাস্তবতার সাথে পরিচয় হচ্ছে, জীবনের ফাঁদগুলো ক্রমশ নতুনরূপে সামনে উপস্থিত হচ্ছে, অর্থাৎ জীবনের গতিশীলতার সাথে তাল মিলিয়ে নিশ্চয় আমার লেখার মধ্যেও পরিবর্তন এসেছে। এই পরিবর্তন আমি না চাইলেও আসবে। এই পরিবর্তন লেখকজীবনের নিয়তি। অবশ্য এই পরিবর্তন ইতিবাচক বা নেতিবাচক অথবা উর্ধ্বগামী বা নিম্নগামী দু’ভাবেই হতে পারে। যে অর্থেই হোক পরিবর্তন নিশ্চয় ঘটেছে। কী ধরনের পরিবর্তন ঘটেছে, এই সম্পর্কে আমার চেয়ে পাঠক-সমালোচকরাই বেশি বলতে পারবেন।

. রে : সৃজনশীল সাহিত্যে ব্যক্তিসংকট, সমাজসংকট রাষ্ট্রব্যবস্থার নানা দিক উঠে আসে। বাস্তবতার এই দিকটিকে উন্মুক্ত করা একজন লেখকের দায়বদ্ধতার অংশ। কিন্তু একজন লেখক একই সাথে শিল্পীও। তাই সমাজবাস্তবতার চিত্র তুলে ধরতে গিয়ে সাহিত্যের নান্দনিক দিকটি পরিহার করতে পারেন না। সমাজবাস্তবতাকে তুলে ধরতে গিয়ে গল্পের নান্দনিক দিকটিকে গৌণ করে ফেলার  একটি প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে বর্তমানে। নান্দনিকতা নাকি সময়বাস্তবতা- গল্পের ক্ষেত্রে কোনটির গুরুত্ব বেশি বলে আপনি মনে করেন?

. : মানুষের জীবনটা একটা সময় মাত্র। যে মানুষ যত বেশি তাঁর সময়কে ধরতে পারে, সে মানুষ ততবেশি নিজেকে চিনতে পারে। কথাসাহিত্য পরিপূর্ণভাবে সময়-অন্বিষ্ট একটি শিল্পমাধ্যম। এই মাধ্যমটির প্রথম এবং প্রধান দায়-ই হচ্ছে সময়-অন্বিষ্ট ব্যক্তি মানুষের কাছে পৌঁছা, সমকালের অলি-গলিতে বিচরণ করা, সময় ফাঁদ-ভাঁজগুলো সঠিকভাবে চিহ্নিত করা, এসবের ভেতর দিয়ে অতিবাহিত মানুষের জীবন নিয়ে তদন্ত করা, অতঃপর লেখা। সুতরাং সময়ের কাছে দায়বদ্ধতা একজন কথাশিল্পীর জন্য অনিবার্য নিয়তি। সমকালউন বাস্তবতা একজন কথাশিল্পীর চর্চাক্ষেত্র, কিন্তু তিনি শুধু সমকালের মধ্যে নিজেকে এবং তাঁর লেখাকে সীমাবদ্ধতা রাখতে চান না নিশ্চয়। তাঁর চিন্তাপ্রসূত লেখাটি সমকালের হলেও তাঁকে শিল্পের ধর্ম মান্য করতে হয়, কালিক বিষয় ও চিন্তাকে কালোত্তীর্ণ করতে হয়। যে কারণে, একজন কথাশিল্পীর দুটো দায়িত্বই পালন করতে হয়। এই শিল্পিতরূপ দেবার জন্য একজন কথাশিল্পীকে প্রতিটি লেখার পূর্বে অত্যন্ত সতর্ক প্রস্তুতি গ্রহণ করতে হয়। কথাশিল্পী যদি বিষয় ও শিল্পের সমন্বয়ে ব্যর্থ হোন, তাহলে তাঁর সৃষ্টি কিছুকালের মধ্যেই আবেদন হারিয়ে ফেলে, পুনর্পাঠের বাস্তব মূল্য না থাকায় সময়ের আবর্জনা হিসেবে স্থায়ীভাবে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। সময়ের সিলমােহর শরীরের নিয়েই কথাশিল্পকে সময়োত্তীর্ণ হতে হয়। এক অর্থে আন্তর্জাতিক কোন পণ্যের মতোÑনির্দিষ্ট কোন দেশ ও কোম্পানির সিলমোহর পণ্যটির শরীরে, কিন্তু ভোক্তা বিশ্বের সকল মানুষ অর্থাৎ যে কোন মানুষ। এজন্য, প্রকৃত কথাশিল্পী মাত্রই স্বতন্ত্র  ও একক পথের স্বাধীন পথিক, কারণ তাঁর সময় ও বাস্তবতা পূর্বাপর কথাশিল্পীদের তুলনায় সম্পূর্ণ ভিন্ন।

. রে : আপনার ব্যাখ্যার প্রেক্ষিতে এই প্রশ্নটা স্বভাবতই উঠে আসে, একই সময়কালের সকল কথাশিল্পী কী তাহলে একই ধরনের গল্প-উপন্যাস লিখবেন?

. : দেখুন, পৃথিবীর প্রত্যেকটি বস্তুর, কী জীব কী নির্জীব, সবারই যার যার মতো স্বতন্ত্র অস্তিত্ব ও অবয়ব রয়েছে। চিন্তাশীল জীবদের চিন্তাগুলো নিশ্চয় তার নিজের একান্ত। পৃথিবীর কোনো কিছুই যেখানে পুনরাবৃত্তি নেই, সেখানে একজন মানুষের চিন্তার সঙ্গে আরেক মানুষের চিন্তার ও দেখার মিল এক হয় কী করে? তাই প্রত্যেক লেখক সার্বভৌম একটি চোখ নির্মাণ করেন নিজের ভেতর-বাহির দুই জগতে; সেই নির্মিত চোখেই দেখেন তাঁর সময়ের বাস্তবকে। জোয়ে বো’র একটি কথা আমার খুব মনে ধরেছে, পৃথিবীর সৃষ্টি হিসেবে প্রত্যেক মানুষের উচিত পৃথিবীকে মুক্তির পথ দেখানো অর্থাৎ মানুষকে মুক্তির পথ দেখানো। আর এই পথ দেখানোর জন্য সেই মানুষটির উচিত পৃথিবীর বিবেক হয়ে ওঠা। এই বিবেকটাই আসল। একজন মানুষ আরেকজন মানুষ থেকে শরীরী অবয়বেই শুধু আলাদা নন, তার বিবেকটাও আলাদা। যে যার বিবেক মতো তার সময়কে ধরেন এবং মূল্যজ্ঞান করেন। ধরুন, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় ‘পদ্মানদীর মাঝি’ অথবা আর্নেস্ট হেমিংওয়ের ‘দি ওল্ড ম্যান এন্ড দি সি’- যে বাস্তবতা তুলে ধরেছেন অবিকল এই রকম বাস্তবতা ও ভাষার অস্তিত্ব পৃথিবীতে আছে, এটি তাদের স্বতন্ত্র কল্পনার জগৎ, এবং নিশ্চয়, কোন একটি সময় স্থান বাস্তবতাকেই তিনি প্রথমে গ্রহণ করেছেন তার মনোরাজ্যে, সেখানে ফিল্টার করে নিজের বিবেক নিজের ভাষার মোড়কে তা উপস্থাপন করেছেন। একই বাস্ততবতা নিয়ে আমি অথবা আপনি যখন লিখি নিশ্চয় তা এক রকম হবে না। এমনকি মানিক বা হেমিংওয়ের সাথে এক টেবিলে বসে লিখলেও হতো না। আমার যা বলতে চেয়েছি তা হলো, প্রত্যেক কথাশিল্পী তাঁর দেখার বাস্তবকে নিজের ভেতরে পুনর্নির্মাণ করেন, যার স্বল্পাংশ তিনি শব্দে-বাক্যে প্রকাশ করতে পারেন। সুতরাং আমরা যে গল্প-উপন্যাস পড়ি তার কোনোটিই অবিকল বাস্তব নয়, লেখকের জীবনাভিজ্ঞতার আলোকে পুনর্নিমিত বাস্তব এবং সেই বাস্তব অবশ্য পূর্ণাংশ নয়। ফলে, কথাশিল্পী নিয়তিই হলো স্বাতন্ত্র্য আর নিরন্তর নিজেকে অর্থাৎ তাঁর সৃষ্টিবিশ্বকে ভাঙাগড়া মধ্যে দিয়ে এগিয়ে যাওয়া। ইডিপাসের নিয়তি মতো এই নিয়তিকে সে কোনো প্রচেষ্টাতেই ঠেকিয়ে রাখতে পারবে না।      

. রে : সৃজনশীল সাহিত্যের লেখকগণ সাধারণ পাঠকের ভালবাসায় সিক্ত হন। মননশীল লেখকগণ অনেকাংশেই অন্তরালে থেকে যান। কিছু অনুসন্ধানী পাঠক গবেষকরাই মননশীল লেখকদের বাঁচিয়ে রাখেন। আপনি একই সাথে সৃজনশীল  মননশীল লেখক। কোন ক্ষেত্রে কাজ করতে আপনি স্বাচ্ছন্দবোধ করেন এবং সেটা কেন?

. : পাঠকের ভালোবাসা একজন লেখকের বড় প্রাপ্তি বটে, কিন্তু আপনাকে মনে রাখতে হবে, যে সাহিত্য সময়োত্তীর্ণ হয়ে চিরন্তন সাহিত্যে মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত, সেই সৃজনশীল সাহিত্য কী সাধারণ পাঠকের খুব বেশি ভালোবাসায় সিক্ত? আর যে দুর্লভ ভালোবাসা তার ললাটে জুটেছে তার অধিকাংশ কিন্তু মননশীল লেখকের কল্যাণে, মূল্যায়নে। সমালোচনা কিন্তু সাহিত্যের সবচেয়ে কঠিনতম শাখা। এর জন্য এক লেখকের অত্যন্ত তীক্ষè ও উচুঁমাপের প্রতিভার প্রয়োজন হয়। এক অর্থে সমালোচকের ভূমিকার দার্শনিকের ভূমিকার মতো। শেলী, কিটস, বায়রন, টেনিশন, ব্রাউনিং কতো বড় বড় সৃজনশীল লেখকের আবির্ভাব ঘটে উনিশ শতকের ইংরেজি সাহিত্যে, কিন্তু সমালোচক ক’জন আছে? সম্ভবত, ম্যাথো আর্নেল্ড একজন আধুনিক কালের বাংলা সাহিত্যের দুশো বছরে ইতিহাসের দিকে একবার তাকাতে অনুরোধ করছি। বঙ্কিম-মাইকেল থেকে আজকে পর্যন্ত সংখ্যায় যে পরিমাণে বড় কবি-কথাশিল্প-নাটক্যার এসেছেন, তার তুলনায় ক’জন প্রাবন্ধিক পেয়েছেন? দুশো বছরে উল্লেখ করার মতো দশজন প্রাবন্ধিকের নামও আপনি বলতে পারবেন না। এক তিরিশের দশকে কিংবা বাংলাদেশের ষাটের দশকে অনন্ত দশ-বারোজন করে কবি বা কথাশিল্পীর নাম নিতেই হবে, যারা বিশ্বমানের কবি বা কথাশিল্পী। অবশ্যই আপনি নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তিকে যদি বিশ্বমানের লেখক হওয়ার মানদণ্ড  না ধরেন। একজন প্রমথ চৌধুরী বা ফ্রান্সিস বেকনের মানের প্রাবন্ধিকের জন্য কয়েক শ বছরে অপেক্ষার প্রয়োজন হতে পারে। 

. রে : বর্তমানে অনলাইন সাহিত্যচর্চা দারুণ গতিতে চলছে। অসংখ্য অনলাইন গ্রুপ নিয়মিত তাদের কার্যক্রম চালাচ্ছে। সব গ্রুপে অনেক দুর্বল লেখা স্থান পাচ্ছে। অনেক দুর্বল লেখক প্রচার পাচ্ছেন। অনলাইন সাহিত্যচর্চায় নতুন প্রজন্মের আগ্রহও অনেক বেশি। এই অনলাইন সাহিত্যচর্চা বিষয়ে আপনার মতামত জানতে চাই। অনেকেই মনে করেন মুদ্রিত বইয়ের প্রয়োজন ফুরিয়ে যাচ্ছে। বইয়ের পিডিএফ ডাইনলোড করে পড়ার কাজটি চালিয়ে নিচ্ছেন অনেক পাঠক। প্রযুক্তি পাঠকের হাতের মুঠোয় চলে এসেছে। এই পরিপ্রেক্ষিতে মুদ্রিত বইয়ের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আপনার মন্তব্য কী?

. : আন্তর্জালিক সাহিত্যচর্চার ধারা নিয়ে আমার অভিব্যক্তি নিয়ে আমার নিজের মধ্যেই দ্বিধা-জিজ্ঞাসার অন্ত নেই। আমি এখনো পর্যন্ত প্রিন্টেড বই ছাড়া দুই পাতার বেশি পড়তে পারি না। এজন্য কী আমার প্রজন্ম অর্থাৎ সময়কাল দায়ী বুঝতে পারি না। ধরুন, আমার জন্ম সত্তরের দশকের শেষার্ধে, শিক্ষাজীবন ও লেখকসত্তার নির্মাণ বা প্রস্তুতিকাল আশি ও নব্বই দশক অর্থাৎ আমার শিক্ষাজীবন ও লেখকসত্তার নির্মাণকালে আমার হাতে মোবাইল ও ইন্টারনেট আসেনি। আমার মনে পড়ে, দিনের পর দিন লাইব্রেরিতে বসে পড়েছি, হাতে লিখে নোট নিয়েছি। প্রতিদিনের খরচ বাঁচিয়ে সর্বাত্ম চেষ্টা করেছি একটি বই কেনার জন্য। কুষ্টিয়ায় কেটেছে আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবন। তখন দশ টাকায় একটি মোগলাই কিনে খাবার জন্য তরুণ মনটা কী ভয়ানক ছটফট করতো! শহরের ইসলামিয়া কলেজের সামনে একটি মোগলাইয়ের দোকান ছিল। কতোদিন বিকেলে যে সেই দোকানে সামনে দাঁড়িয়েছি মোগলাই কিনে খাবার দুঃসাহস নিয়ে। লোভাতুর চোখে একবার ভাঁজা ফোলা সুস্বাদু মোগলাইগুলোর দিকে যতবার দুঃসাহস নিয়ে এগিয়ে গেছি, ততবারই কোন না কোন বই এসে পথ আটকে দাঁড়িয়েছে। লোভ সংবরণ করে যখন সেখান থেকে ফিরে এসেছি, এবং এভাবে কয়েকদিনের জমানো টাকায় একটা বই কিনে মেসে ফিরছি, তখন বুকের ভিতরে কী যে তোলপাড় চলেছে, এখন আর ভাষা দিয়ে বোঝানোর সামর্থ্য নেই। তখন তিনটি ছবি আমার চোখের উপরে ভেসে উঠত, প্রথমত, ডুবানো তেলে ভাজা ফোলা লোভনীয় মোগলাই, আমার ইয়াসিন আলী স্যারের মুখচ্ছবি, যিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরির বেতনের টাকায় বই কিনে কুলায়নি বলে বাড়ি থেকে মাসে মাসে টাকা নিয়ে আসতেন। এই প্রজন্মের একজন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়ার কাছে আমার জীবনের তথা আমার প্রজন্মের গল্পগুলো হাস্যকর মনে হবে। গত সপ্তাহে-ই একটা মধ্যমানের চাইনিজ রেস্তোরায় গিয়েছিলাম রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই বন্ধু শিক্ষকের সাথে। পাশের টেবিলেই ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়-পড়ুয়া চারটি ছেল। পাশের টেবিল বলে ওয়েটারের মুখে শুনতে পাই, তাদের বিল উঠেছে বারো শ টাকা। আমি চমকে উঠলাম। এই টাকায় কতগুলো বই কেনা যায় ওরা কী জানে? আমার দুই বন্ধু সহকর্মীর একজন আমার মুর্খতা দেখে না হেসে পারেননি। ওরা বই কিনে? কেন কিনবে? গুগুলে সার্চ দিলেই হাজার হাজার বই, টপিকসের অভাব নেই। প্রত্যেকের হাতে দেখেছো কী দামি মোবাইল? এখন প্রশ্ন হচ্ছে, কেন সেই বই কিনবে? কিছুদিন আগে এক সাক্ষাতকারে আমি বলেছিলাম, গুগুল হচ্ছে খাঁজাবাবার দরবার, কেউ ফেরে না খালি হাতে। যা-তা লিখে সার্চ দিলে তার একটা কিছু আপনি পাবেন নিশ্চিত। মোহিতলাল মজুমদার একবার ব্যাঙ্গ করে বলেছিলেন, আধুনিক সভ্যতার কী অগ্রগতি, কল টিপলেই জল পাই। মোবাইলের বা কম্পিটারের কী বোর্ড টিপলে দুনিয়ার সমস্ত জ্ঞান-বিজ্ঞানের এ হেন বিষয় নেই যে, আপনি পাবেন না। আমি এই নিয়ে ভীষণ এক বেকায়দায় পড়েছি। সৈকত আরেফিন, আমার এক লেখকবন্ধু, অনলাইনে সাহিত্যচর্চা বিষয়ে আমার এই দ্বিধাকে নিষ্ঠুরভাবে আক্রমণ করে প্রায়শ। অনলাইনে সাহিত্যচর্চা নিয়ে আমার দ্বিধার শেষ নেই। একটা বাটুন টিপলে যেমন কয়েক পৃষ্ঠার বই পাই মুহূর্তের মধ্যে,  আবার, ডিলিট বাটুন টিপলে চোখের পলকে নাই হয়ে যায় হাজার পৃষ্ঠার বই। এতো সহজে যা পাওয়া, এতো সুলভ যা, চোখের পলকে যা হারিয়ে যায়, তা কী সত্যিই কয়েক হাজার বছরের বইসভ্যতাকে গ্রাস করে নেবে? আমার বিশ্বাস হয় না। অবশ্য, আমার বিশ্বাসে কিছু যায় আসে না, পরিবর্তন যা ঘটার তা তো ঘটবেই। তবে সাহিত্যচর্চা যেভাবেই হোক আমি তাকে স্বাগত জানাই। বই-পত্রিকাকে ছেড়ে বা অস্বীকার করে শুধু অনলাইনে সাহিত্যচর্চা তথা জ্ঞান-বিজ্ঞানে চর্চাকে আমার সমর্থনের জায়গা থেকে আমি প্রত্যাখ্যান-ই করছি। মনীষীরা বলেন, ভাষার অর্থ বাক্য-শব্দের রূপ-রস-গন্ধ আছে। অনলাইনে কী করে আমি এসব পাবো বুঝি না। কারো কাছে প্রশ্ন করে, তার কোন প্রকার সদুত্তরও পাইনি, উল্টো, ব্যাক-ডেটেট বলে কিছু সুহৃদ বন্ধুর কাছে ভর্ৎসনা-ই পাই। এই তো কিছুদিন আগে, ফেসবুকে আমার এক বন্ধু, যিনি প্রকাশক, তাঁর পোস্টে জানলাম, এবারের বইমেলা অনলাইনে হবে? আমি হিসাব মেলাতে পারি নি। অনলাইনে বইমেলার অর্থ কী? অনলাইনে ছবি বা ভিডিও দেখে বই পছন্দ করব, তারপর সেই বই কেনার অর্ডার করব। কুরিয়ার বা ডাকে সেই বই হাতে পাব? হাজারটা বই হাতিয়ে, নেড়ে, প্রচ্ছদ- সূচি-ভূমিকা পড়ে নিজের প্রয়োজনমতো বই কিনে বইয়ের ব্যাগ হাতে সগৌরবে মেলার ভেতর থেকে বেরিয়ে আসার যে অসীম আনন্দ, সেই আনন্দ কী করে দেবে অনলাইন? ছুঁতে পারব না, নেড়েচেড়ে দেখতে পারব না, নতুন বইয়ের গন্ধ নিতে পারব না, এভাবে কী বইমেলা হয়! অবশ্যই, এ যে বাস্তবসম্মত নয়, কর্তা-ব্যক্তিরা বুঝেছেন। উন্নত বিশ্বের এই ধরনের বইমেলার দৃষ্টান্ত ইতোমধ্যে অনেকেই দিয়েছেন বটে, আমি মনে করি, অনলাইনে বইমেলা হতে পারে কিন্তু বই-প্রেমিক প্রকৃত পাঠকের তাতে কিছুতেই তৃপ্তি মিলবে না।  

. রে : ‘তিনিই উত্তম শাসক যিনি বুদ্ধিজীবীদের সান্নিধ্যে থাকেন। আর তিনিই নিকৃষ্টতম বুদ্ধিজীবী যিনি শাসকের সান্নিধ্য কামনা করেন। বর্তমান সময়ে শাসকগোষ্ঠী বা রাজনীতিকদের সঙ্গে বুদ্ধিজীবী বা লেখকদের বিদ্যমান সম্পর্ক এই উক্তিটির সাথে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে আপনি মনে করেন?

. :  ‘বুদ্ধিজীবী’ কথাটির অর্থ  কী  আমি বহু চেষ্টা করেও বুঝতে পারিনি। আমার বুদ্ধির দৌড় যৎসামান্য, তাই ‘বুদ্ধিজীবী’ শব্দটি জটিল মনে হয়। কখনো মনে হয়, এই শব্দের কোনো ব্যাখ্যা হয় না। বুদ্ধি দিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন যিনি তিনিই বুদ্ধিজীবী। এই সংজ্ঞায় ফেললে প্রত্যেক মানুষ-ই শুধু নয়, জীবজগতের সবপ্রাণিই বুদ্ধিজীবী। কারণ, জীবন-জীবিকার জন্য সবাই কমবেশি বুদ্ধি খাটাতে হয়। ধরুণ, একটি গরু, আমারদের বিচারে যার কোন বুদ্ধিই নেই, সেও কিন্তু তার জৈবিক প্রয়োজনগুলো মেটানোর জন্য নানান কৌশল করে। যা হোক, আর যদি আপনি বলেন, শিক্ষা-চিন্তা-চেতনায় গড় মানুষের চেয়ে উন্নত মানুষ, যাদের শ্রম-সাধনা-গবেষণার মাধ্যমে দেশ-জাতি নতুন নতুন দিকনির্দেশনা পায় এবং উত্তরোত্তর উন্নতি সাধিত হয়; তাঁর মেধা জাতীয় সম্পদ, তিনি ন্যায়নিষ্ঠ-সত্যানুরাগী, জাতির দুঃসময়ে তাদের পরামর্শই গুরুত্বপূর্ণ, তাহলে বলবো, এই অর্থে বাংলাদেশে বুদ্ধিজীবী বলে কেউ আছে কিনা আমার সন্দেহ।

একটা দেশের কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-গবেষকদের বিশেষ মর্যদার দৃষ্টিতে দেখা হয়। কারণ, তাদের মধ্যেই আমরা বুদ্ধিজীবী পাই, যাদের উদ্ভাবিত নতুন তত্ত্ব বা চিন্তা আমাদের শিল্প-সংস্কৃতি-জ্ঞান-বিজ্ঞানকে সমৃদ্ধতর করবে। কলেজগুলোর কথা বাদ-ই দিলাম, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর দিকে একবার তাকান তো, আলোকিত মানুষ কতজন আছেন? কাকে বুদ্ধিজীবী বলবেন? দেশের হাজার হাজার বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকদের মধ্যে থেকে ক’জনের নাম দেশের মানুষ জানে, অন্তত শিক্ষিতসমাজ জানে? যার নামই আপনি উচ্চারণ করুণ না, এক মুহূর্তও ভাবতে হবে না, ঝড়ে শেকড় উপড়ে ফেলা ভাঙা গাছের মতো তাঁর মেরুদণ্ড কোন দিকে বাঁকা হয়ে আছে, আর তিনি কোন দিকে ঝুঁকে আছেন? তুচ্ছ তুচ্ছ সুযোগ-সুবিধা-স্বার্থ, রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগ, নিয়োগ বাণিজ্য, সর্বোপরি, গবেষণা বা বুদ্ধির চর্চার মূল্যায়নে নয়, সরকারের আনুগত্যের চরম বহিঃপ্রকাশের উপঢৌকন হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য থেকে প্রধান কয়েকটি পদে বসানো, অতঃপর রাজনৈতিক দল আমগাছকে তালগাছ বললে সমস্বরে চেঁচিয়ে তালগাছ বলে এবং সত্য বলে প্রতিষ্ঠিত করার যে সংস্কৃতি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তৈরি হয়েছে, সেখানে মুক্তবুদ্ধির চর্চা ও গবেষণা করে নতুন নতুন চিন্তার উদ্ভাবন এক প্রকার অপরাধ-ই বটে। গুটি কিছু জ্ঞানপিপাসু শিক্ষক, যাঁরা নিরন্তর শ্রম আর সাধনার মধ্যে আছেন, তারা শ্রম-সাধনার স্বীকৃতি পাবার পরিবর্তে একপ্রকার সংকোচিত হয়ে থাকেন। আমি এক প্রকার আফসোস করে বলেছিলাম আমার বন্ধু সহকর্মীকে,  বিশ্ববিদ্যালয়ের হলের সিট থাকা অবস্থাতেই শিক্ষক হয়ে গেল, জীবনের এমন একটি দুর্লভ সুযোগ পেল, অথচ দেখেন, দু-তিন বছরে একটি অক্ষরও তার বিষয়ে লিখলেন না! ভবিষ্যতে তিনি কী লিখবেন বা কী গবেষণা করবেন, এই বিষয়ে ভীষণ শঙ্কিত আমি। আমার নিবুর্দ্ধিতা দেখে আমার সহকর্মী বন্ধুটির ঠোঁটে মৃদু হাসি ফুটে ওঠে, বলেন, আপনার এই বিষয়ে চিন্তা করার কোনো কারণ নেই। প্রমোশনের ঠিক আগের মুহূর্তে দেখবেন যে ক’টি গবেষণা প্রবন্ধ দরকার ঠিক সে কয়টি গবেষণা প্রবন্ধ প্রস্তুত ও প্রকাশ করে নিয়ে আসবে। প্রমোশনে তাঁর একদিনও দেরি হবে না। ঠিক সময়ে নামের পূর্বে ড. বসবে এবং ঠিক সময়ে প্রফেসর হবেন। এই ভাবনা মাথা থেকে ফেলে দিন। সত্যিই, এই ভাবনা মাথা থেকে ফেলে দিয়েছি। সুতরাং বুদ্ধিজীবী এদেশের কোথায় তৈরি হবে বলুন?

আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের একটি বক্তব্যে শুনেছিলাম, ভালোমানুষেরা এখন নিঃসঙ্গ, নির্বন্ধু, নিভৃতে কাঁদে, অপরদিকে মন্দ মানুষের  দারুণ সঙ্ঘবদ্ধ, ধূর্তামি আর দুর্বৃত্তায়ন দিয়ে সমাজ-রাষ্ট্রের সর্বত্র এখন প্রতিষ্ঠিত। এক শেয়াল হুক্কা হুয়া করে ডাক দিলে হাজারো শেয়াল কিয়া হুয়া কি হুয়া রব তুলে ছুটে আসে। অনুর্বর, স্থুলচিন্তা ও দলান্ধ কতিপয় বাকোয়াজ এখন দেশের বুদ্ধিজীবী। সব চ্যানেলেই তাঁর সরব উপস্থিতি। কথা বলার প্রয়োজন নেই, বসার ভঙ্গি দেখলেই, বড়জোর মুখ হা করলেই বোঝা যায়, তার হৃৎপিণ্ডে কাদের বা কোন দলের সিলমোহর মারা। তিনি মিডিয়ায় এসেছেন জাতিকে জ্ঞান বিতরণ করতে কোন বা গোষ্ঠীর স্বার্থে তার চোখে দিকে তাকালে একজন শিশুও বলে দিতে পারে। কাকে আপনি বুদ্ধিজীবী বলবেন?  কোথায় সেই সত্যবাদী স্পষ্টবাদী মেরুদণ্ড সোজা হিমালয় সমান ব্যক্তিত্ব, যার কথার উপরে দল-মত নির্বিশেষে জাতি নির্ভর করবে। 

. রে : বাংলাদেশের লেখকরা এখন কেমন আছেন? সাহিত্যে লেজুড়বৃত্তি পূর্বেও ছিল। এখনো আছে এবং ক্রমশ বাড়ছে। সাহিত্যে এই লেজুড়বৃত্তি বেড়ে যাওয়ার কারণ কি? আর লেজুড়বৃত্তির সাহিত্য প্রকৃত সাহিত্যের জন্য কতটা ক্ষতিকর?

. : নগর পুড়ালে দেবালয় কী রক্ষা পায়? সবকিছুই আগাগোড়া নষ্ট করে ফেলবেন, শব্দ করে একটি হাঁচি দিলেও বিবিধ ব্যাখ্যা তৈরি করে একটা পক্ষে ফেলে তার বিচার করবেন, দিনে দুপুরে প্রকাশ্যে খুন হলেও আপনি তার পেছনে একটি যুতসই যুক্তি দাঁড় করিয়ে দেবেন, ব্যক্তির মেধাচর্চার ন্যূনতম সম্মান দেখাবেন না, সেই সমাজ ও রাষ্ট্রে কী করে প্রত্যাশা করেন যে, সাহিত্যিকরা সবাই সাধ-সন্যাসী হবে? নজরুল-বেগম রোকেয়া ধর্ম-সমাজনীতি-রাজনীতির পীড়ন নিয়ে যেসব কথা বলেছেন এবং লিখেছেন সেসবের দু’লাইন এখন লিখে দেখুন তো কী হয়? লোভ-লালসার কথা নাই বললাম; আততায়ীর মতো তাড়া ফেরে একটা ভয় কখন কে বলে বসে, এই লেখক ওমুক অনুভূতিতে আঘাত করেছেন? কী লিখেছি, বারবার ঘুরেফিরে পড়ে দেখতে হয়। লেখকের কাজ-ই মানুষের অনুভূতি নিয়ে। আপনার লেখা পাঠকের অনুভূতিতে যদি আঘাত-ই না করবে, পাঠকের অনুভূতিকে যদি আলোড়িত না করবে, আপনার চিন্তার জগতের বিন্যাসকে নতুনভাবে সাজিয়ে তুলতে সাহায্য না করবে, যদি আপনার পচন বা ক্ষতের স্থানগুলো উন্মোক্ত করে না দেখাবেন,  যদি নষ্ট-ভ্রষ্ট পথে চলা ব্যক্তি মানুষের জীবন থেকে সামষ্টিক জীবন, সমাজ, রাষ্ট্র, সভ্যতা, বিশ্ব-প্রকৃতির ফাঁদ-ফাঁক-ফাঁকিগুলোকে চিহ্নিত না হয় লেখকের লেখায়, যদি আপনার লেখা পড়ে পাঠকের মনে সুখ বা ক্রোধ না জন্মে, পরিবর্তনের তাগিদ তৈরি না হয়, তাহলে লেখকের কাজটি কী? লেখকের  কাজ কি সার্কাসের হাতি বা জোকার বা যাদুকরের অথবা ভাঁড়ারের মতো সস্তা আনন্দ-বিনোদন বিতরণ করে পাঠকের মনোরঞ্জন করা? বিগত কয়েক বছরে যে পরিমাণ লেখক ও মুক্তচিন্তার মানুষকের হত্যা করা হয়েছে, এবং যে পরিমাণে আতঙ্ক আর ভয়ের ফাঁদে ফেলে দেয়া হয়েছে, আমার মনে হয়, এক শতাব্দী সময়কাল ধরেও এতো পরিমাণ হত্যাযজ্ঞ চলেনি।

. রে : লেখার ক্ষেত্রে মান পরিমাণ নিয়ে এখন অনেক কথা হয়। এর একটি কারণ হয়তো এটাই যে, এখন অনেক লেখকের পাঁচ শতাধিক বই প্রকাশের পরও পাঠক তাঁকে চিনতে পারেন না। অনেকে দু-চারটি লিখেই আলোচিত হন। বেশি বই প্রকাশিত হওয়ার পরও যাঁরা কম আলোচিত কিংবা অনালোচিত তাঁদের লেখার মান নিয়ে অনেকে প্রশ্ন তোলেন। লেখার মান পরিমাণ নিয়ে আপনার বিশ্লেষণ কী?

. : লেখার মান ও পরিমান নিয়ে বিতর্কটি নিতান্তই তুচ্ছ এবং অকারণ মনে হয়। আমি যে সব খাদ্য এবং যে পরিমাণ খেতে পারব আপনি কী তা পারবেন? এটি প্রকৃতি নির্ধারিত একটি নিয়ম। আপনার শরীরের নিয়ন্ত্রণ প্রকৃতির হাতে। লেখার ক্ষেত্রেও তাই। ইচ্ছে করলেই একজন প্রকৃত লেখক হাজারটা বই লিখে ফেলতে পারেন না। আবার যিনি লিখতে পারেন, তিনি ইচ্ছে করলেই লেখা থামিয়ে দিতে পারেন না। এটি লেখকের প্রকৃতির উপরে নির্ভরশীল, যে প্রকৃতি জীবনের আর দশটি নিয়মের মতোই লেখকের জীবনকে নিয়ন্ত্রন করে। এখন আপনি যদি বেশি লেখার জন্য লেখকের মানহীনতার প্রশ্ন তুলেন অথবা কাঠগড়ায় দাঁড় করান তাহলে রবীন্দ্রনাথকে কোথায় ফেলবেন? মানিক-বিভূতি-তারাশঙ্কর, এমনকি এ সময়কালের সৈয়দ শামসুল হককে কোথায় ফেলবেন?  আবার বেশি লেখেনি বলে ছোট লেখক বা দুর্বল লেখক ধরেন যদি তাহলে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, শহিদুল জহিরের মতো লেখকদের কোথায় রাখবেন? একটি মাত্র বই লিখেও বরণীয় হয়ে আছেন, আবার শ শ বইয়ের লেখকও কালস্রোতে খড়কূটোর মতো ভেসে যাচ্ছে। শিল্পমানে উত্তীর্ণ এবং নতুন বাঁক-চিন্তা সমৃদ্ধ লেখা যদি একজন লেখক বেশি লিখতে পারেন, আমাদের গ্রহণ করতে আপত্তি কোথায়? 

. রে : এবার আপনার লেখার বিষয়ে কিছু জানতে চাই। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজনীতি, ব্যক্তিসংকট, যৌনভাবনা, মূল্যবোধের অবক্ষয়, শ্রেণিশোষণ, চলমান সময় সমাজবাস্তবতা- সবকিছু নানাভাবে উঠে আসে আপনার গল্পে-উপন্যাসে। শিল্পমান, সময়বাস্তবতা নাকি পাঠকের চাহিদা- গল্প লেখার ক্ষেত্রে আপনি কোনটির প্রতি বেশি গুরুত্ব দেন?

. : আমি কেন, যে কোন লেখকশিল্পী-ই, তিনি যখন লিখতে বসেন বা কোনো শিল্পকর্মে হাত দেন তখন তাঁর অন্তর্জগৎ ত্রিকালদর্শীর মতো অতীত বর্তমান ভবিষ্যতে পরিভ্রমণ করে। কথাশিল্পীর কাজ প্রধানত সমকালীন বাস্তবতা নিয়ে এবং ব্যক্তি মানুষের ফাঁদ-ফাঁকি-সংকটগুলো চিহ্নিত করা; সমকালের পাঠকদের তো বটেই, ভবিষ্যতের পাঠকের জন্য ভাবনার বৃত্ত তৈরি করে রাখা, যেন লেখাটি পুনর্পাঠ বঞ্চিত না হয়। এই কাজটি কবিতা-গানের চেয়ে কথাসাহিত্যে করা কিছুটা হলেও কঠিন। কথাশিল্পীর প্রধান দায় তাঁর সময়ের কাছে, কিন্তু কবি এই দায় থেকে অনেকটাই মুক্তি। কালিক বিষয়কে কালোত্তীর্ণ করার দায় অস্বীকার করতে পারেন না একজন কথাশিল্পী। আমার ক্ষেত্রে যা ঘটে তা হলো, ব্যক্তিমানুষ বা সমষ্টির জীবনকে বিপন্ন করে এমন কোন কর্মকাণ্ড, জীবনের শুভ ও কল্যাণ বিরোধী এমন কোন কাজ, সংখ্যাগরিস্ট মানুষের সমর্থন তার প্রতি থাকলেও আমার বিবেচনায় যদি প্রতিপাদ্য হয় কাজটি ঠিক হচ্ছে না, ঠিক তখনি আমি বিষয়টিকে নিয়ে কিছু লেখার তাড়া অনুভব করি। এই তাড়া অনুভব করার একটিই কারণ, মানুষ হিসেবে আমার প্রতিবাদটা জানানো, যদিও আমার একার প্রতিবাদের কিছুই যায় আসে না, তবু আমার বিবেকের কাছে আমি দায়বদ্ধ। এই দায় আমাকে গ্রহণ করতেই হবে। কোন রাজনৈতিক শক্তি বা দল অথবা বিশেষ সংগঠনের সাথে সম্পৃক্তিতা নেই বলে লেখাটিই আমার প্রতিবাদ প্রকাশের একমাত্র অবলম্বন, এবং আমার প্রতিবাদ অন্তত কিছু মানুষের কাছে পৌঁছে দেবার একটি উপায়।

. রে: কোন একটি বিষয় বা অনুভব আপনার মনে সৃষ্টির পরেই লেখার টেবিলে বসেন?

. : অনুভবের পরেই লিখতে বসি এমনটি নয়। যথাসাধ্য চেষ্টা করি, এবং সর্বোচ্চ সময় ধরে চেষ্টা করি, যেন লেখাটি না লিখতে হয়। যখন আর কিছুতেই পারি না, আমার দৈনন্দিন জীবনের সমস্ত কাজকে ছাপিয়ে লেখার তাড়াটি যদি শক্তিশালী হয়ে ওঠে, আর কিছুতেই এড়িয়ে যেতে পারছি না, ঠিক তখনি আমি কলম ধরি। অর্থাৎ লেখার তাড়াটির সঙ্গে আমার একপ্রকার লড়াই চলে। যেমন ধরুন, সেই ২০১২ সালে একটি দৈনিকে শত্রু সম্পত্তি আইন এবং এর অভিঘাত নিয়ে একটি প্রবন্ধ পড়েছিলাম, সেই থেকে মাথায় নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছি, একটি প্রশ্ন, একটি দেশ কী করে আইন করে তার নাগরিক অর্থাৎ তার সন্তানকে শত্রু বলতে পারে? এই অমানবিকতার বিরুদ্ধে আমার অবস্থান নির্ধারিত হয়েছিল তখনি। বিষয়টির সঙ্গে দীর্ঘ ছয় বছরের বোঝাপড়ার শেষ পরিণতিতে লিখতে বাধ্য হয়েছি ‘অর্পিত জীবন’ উপন্যাস।

লেখাটি শিল্প হয়ে উঠলো কিনা, এই বিবেচনার চেয়ে আমি কী লিখতে চেয়েছি, তা পরিস্কারভাবে উপস্থাপন করতে পারলাম কিনা, এটাই প্রধান বিবেচ্য বিষয় আমার কাছে। শিল্পর আঙ্গিক ভাষা নিয়ে ভাবি অবশ্যই, কিন্তু এই ভাবনাটি যেন আমার ভেতরে নির্মিত বিষয়-বাস্তবতাকে কিছুতেই ক্ষুণ্ন করতে না পারে, এটুকু সতর্ক আমি হই অবশ্য। অবশ্য, লেখাটি যখন এগিয়ে যায়, গভীরভাবে প্রবেশ করি লেখাটির অস্থি-মজ্জায়, তখন বিষয় ও নির্মাণ কাঠামো এক হয়ে যায় শরীরের রক্ত-মাংসের মতো।     

.রে : আপনার একটি বিখ্যাত গল্পকবি কাপালিক গল্পে একজন জনপ্রিয় কবি প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির আক্রমণের শিকার হন। কিন্তু প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির কাছে মাথা নত করেন না। আদর্শিক ক্ষেত্রে এই আপোষহীনতা একজন লেখকের জন্য অত্যন্ত জরুরি। প্রসঙ্গে বর্তমান সময়ের লেখকদের আদর্শিক অবস্থান ব্যাখ্যা করুন।

. : একজন লেখকের মূল শক্তিই তার আদর্শিক অবস্থান। একজন গড় মানুষের চেয়ে একজন লেখক অবশ্যই ব্যক্তিজীবন, ঘটমান ও ঘটে যাওয়া বাস্তবতা তথা পরিবর্তনের দিকে, তাঁর জাতির ইতিহাসে দিকে, সর্বোপরি বৈশ্বিক বাস্তবতার দিকে স্বতন্ত্র দৃষ্টিতে তাকান। একটি দেশ বা একটি গোটা, এমনকি একটি সভ্যতার বিরুদ্ধে একজন লেখক একা দাঁড়িয়ে যেতে পারেন, যদি তার কাছে মনে হয়, বিষয়টি ভুল, মানবকল্যাণ ও প্রকৃতি বিরোধী। একটি সত্য প্রতিষ্ঠার একজন লেখক নিজের জীবনের মৃত্যুকেও হাসিমুখে গ্রহণ করে। শুধু সক্রেটিস নয়, পৃথিবীর প্রত্যেকটি জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে এই উদাহারণের অভাব নেই। এই মুহূর্তে একজন ভারতীয় বর্ষীয়ান লেখকের অমানবিক কারাবন্দি আমাকে ভীষণভাবে বেদনাহত করছে। তিনি তেলেগু সাহিত্যের প্রভাবশালী প্রধান কবি ওয়ারাওয়ারা। এক দলিত আন্দোলনের এক শ বছর পূর্তি অনুষ্ঠানে জাতিগত দাঙ্গার ইস্যুতে কবিকে বন্দি করে রেখেছে সরকার। তাঁর বিরুদ্ধে সরাসরি কোন অভিযোগ নেই। সন্দেহবশত সেই ২০১৮ সাল থেকে বন্দি এই কবিকে। সেদিন একটি অনলাইন পত্রিকার খবরে দেখলাম, বিভিন্ন মানবধিকার কর্মী সংগঠন তাঁর মুক্তির দাবিতে আন্দোলন করছে। শঙ্খ ঘোষ এই আন্দোলনে একাত্ম প্রকাশ করেন। একজন লেখক যেহেতু দশের মধ্যে এগারো হয়ে ওঠেন, এ কারণে, সমাজ-ধর্ম-রাষ্ট্র এই সব প্রথাগত প্রতিষ্ঠান লেখকদের চিরকালই বিরোধী শক্তি ও শত্রু বিবেচনা করে। এই বিবেচনায়, ঐ লেখকের কলম স্তব্ধ করে দিতে, এমনকি জীবন পর্যন্ত কেড়ে নিতে সমাজ-ধর্ম-রাষ্ট্র নিষ্ঠুর কাপালিকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। ‘কবি ও কাপালিক’ গল্পটি আমাদের দেশের একজন প্রথাবিরোধী লেখককে নৃশংসভাবে হত্যার প্রতিবাদ ও যন্ত্রণাদগ্ধ বাস্তবতা থেকে লিখেছিলাম। প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি পরিকল্পিতভাবে মুক্তচিন্তার ও প্রথাবিরোধী লেখককের হত্যা করেছে কাপালিকের চেয়েও নির্বিকার ও নৃশংসভাবে।   

.রে : আপনি দীর্ঘ সময় কলেজ পর্যায়ে শিক্ষকতা করেছেন। এখন বিশ^বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছেন। ক্যাম্পাসে ছাত্র রাজনীতির নানা দিক পর্যবেক্ষণের অভিজ্ঞতা আছে আপনার। আপনিগিরগিটি একটি মেয়ে গল্পে ছাত্র রাজনীতির ভেতর-বাহিরের চেহারা তুলে ধরেছেন। বর্তমান সময়ের ছাত্র রাজনীতি বিষয়ে আপনি কী বলবেন?

. :  আমার ‘গিরগিটি ও একজন মেয়ে’ গল্পটি একটি বাস্তব-ঘটনার প্রেক্ষিতে লিখেছিলাম। এই রকম বাস্তবতার ভেতর দিয়েই যাচ্ছি আমরা। ‘রাজনীতি’র পূর্বে ‘ছাত্র’ শব্দটির যোগেই ছাত্ররাজনীতি শব্দটি, অর্থাৎ বিশেষায়িত রাজনীতি, যে রাজনীতি শিক্ষা ও শিক্ষার্থীর বিকাশ ও সুরক্ষায় ভূমিকা রাখবে। এই তারুণ্য-শক্তিই একটি জাতির প্রধান সম্পদ এবং এই শক্তির প্রকৃত ও সার্থক ব্যবহারের মধ্য দিয়ে একটি দেশ ও জাতি বিভিন্ন ক্ষেত্রে বড় হয়ে ওঠে। বিপর্যয়ের মুহূর্তের এই শক্তিই জাতির মূল ভরসা, যেমন আমরা ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত পেয়েছি।  এতো সূর্যোদয়ের মতো প্রতিষ্ঠিত যে, রাষ্ট্রের মূল রাজনীতি ছাত্ররাজনীতি এবং সকল পর্যায়ের রাজনীতির নিয়ন্ত্রক শক্তি অর্থাৎ মস্তক। মাথায় যদি আপনার পচন ধরে, তাহলে শরীরের বাকি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের মধ্যে স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় পচন ধরবে। ছাত্ররা কোমল-প্রাণ তরুণ। আমি তাদের কখনোই দোষ দেই না। তারুণ্যের আবেগ আর রক্তের তেজে তারা প্রকৃতিগতভাবেই যোদ্ধা বা বীর। এই বয়সে কোনো কঠিন কাজ তাদের পক্ষেই করা সম্ভব। কিন্তু দুর্ভাগ্যের ঘটনাটি যা ঘটেছে, আশির দশকে থেকেই ছাত্ররাজনীতি রাষ্ট্রের মূল রাজনৈতিক দলের ক্ষমতার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার শুরু হয়েছে। জনগণের সমর্থন ছিল না, বিধায় ছাত্ররাজনীতিকে ক্ষমতায় টিকে থাকার বিকল্প কৌশল হিসেবে ব্যবহার করেছিল স্বৈরশাসকেরা। এজন্যে আমরা দেখি, আশির দশক থেকেই ছাত্রদের হাতে অস্ত্র অর্থ টেন্ডার তুলে দেয়া হয়েছে। ক্রমশ এই অপরাজনীতি এতোটাই প্রভাব আর শক্তি বিস্তার করেছে যে, এখন আর কোন রাজনৈতিক দল কল্পনা-ই করতে পারে না যে, ছাত্রসংগঠন ছাড়া বা ছাত্রসংগঠনের শক্তি ছাড়া ক্ষমতায় আসতে পারবে। রাজনৈতিক দলের প্রকৃত যে কর্মকাণ্ড অর্থাৎ মিছিল মিটিং ইত্যাদিতে আপনি দেখবেন, সিংহভাগই ছাত্রসংগঠনের সদস্য। জাতীয়ভাবে ছাত্ররাজনীতির নীতি ও কৌশল নির্ধারিত হয়; ছাত্রসংগঠনের কমিটি গঠিত হয় মূল রাজনৈতিক দলের প্রধান ও নীতিনির্ধারকদের ইচ্ছায়, আশীর্বাদে এবং পরিচালিতও হয় সেই মতো। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসংগঠনের নেতৃত্ব মেধা-যোগ্যতা-ত্যাগ-তিতিক্ষার নিরিখে নির্ধারণ হয় না, কমিটির নাম ঘোষণা করা হয় কেন্দ্রীয়ভাবে। ফলে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র নেতারা তো বটেই, সাধারণ কর্মীরা পর্যন্ত নিজেদের ক্ষমতার উৎস হিসেবে বিবেচনা করে কেন্দ্রীয় বা জেলা পর্যায়ের মূল রাজনীতির নেতৃত্বকে। সাধারণ শিক্ষকদের কথা বাদ-ই দিলাম, কলেজের অধ্যক্ষ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য বা নীতিনির্ধারকদের খুব বেশি মূল্যজ্ঞান করে না। এছাড়া এই সব পদের নিয়োগ যেহেতু দক্ষতা-যোগ্যতার ভিত্তিতে হয়, হয় দলীয় আনুগত্যের বিবেচনায় হয়, চেয়ারে থাকতে এবং প্রতিষ্ঠানকে পরিচালনার জন্য ছাত্রনেতৃত্বকে বাড়তি খাতির করতে হয়। অন্যথায়, মুহূর্তের মধ্যে তালা মেরে দিয়ে প্রতিষ্ঠান অচল করে দেবে। দুর্ভাগ্যের বিষয়, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের প্রধানরা স্বেচ্ছায় ছাত্রনেতাদের আনুকূল্য ও প্রাধান্য দিয়ে থাকেন, এবং আমি এমনও দেখেছি, দুইজন শিক্ষক দরজায় দাঁড়িয়ে আছেন, প্রবেশের অনুমতির অপেক্ষা করছেন, ঠিক এ সময় কয়েক ছাত্রনেতা এসে অনুমতির কোনো প্রয়োজনই মনে করেনি। দরজা ধাক্কা মেরে ঢুকে পড়ছে। অর্থাৎ এই প্রশ্রয়টা তাহলে দিয়েছেন ঐ প্রতিষ্ঠানের প্রধান-ই। সুতরাং,  ছাত্ররাজনীতির দৌরাত্ম্য ও পচন নিয়ে কথা বললে আমি বলি, এর দায় ছাত্রদের নয়, আমাদের অর্থাৎ আমাদের পদ-ক্ষমতার মোহ ও সংকীর্ণ স্বার্থে বরং তাদের বড় করে তুলছি। ধরুন, একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল শিক্ষক যদি ঐক্যবদ্ধ হয়ে একটি ইউনিক শক্তি হয়ে ওঠে, সেখানে কোনোমতেই ছাত্ররা ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ করতে পারবে না। কারণ, তারা জানবে, শিক্ষকরা ঐক্যবদ্ধ। কিন্তু আমাদের কি সেই ঐক্য আছে? সেই নৈতিক ও আদর্শিক অবস্থান আছে? একজন শিক্ষকই যদি গবেষণা ও নিরন্তর অধ্যাবসয়ে পরিপূর্ণভাবে নিজেকে সমর্পণ করে শিক্ষক হিসেবে গড়ে তুলতে না পারেন; রাজনৈতিক মতাদর্শের কাছে নিজের মেরুদণ্ড ও চেতনাকে বিক্রি করেন; প্রমোশনের জন্য প্রয়োজনীয় গবেষণা-প্রবন্ধ কোনোপ্রকারে প্রকাশের ব্যবস্থা করে প্রমোশনের পথকে মসৃণ করাই একমাত্র লক্ষ্য নির্ধারণ করেন, অতঃপর প্রফেসর হয়ে যাবার পরে পরিপূর্ণভাবে নিজেকে গবেষণা ও অধ্যাবয়সায় থেকে সরিয়ে নানা উদ্দেশ্যে সময় ব্যয় করেন, সেখানে আপনি কী করে প্রত্যাশা করেন, আপনার ছাত্র আপনাকে পরিপূর্ণভাবে শিক্ষক হিসেবে গ্রহণ করবে। একজন ছাত্র তো তরুণ, তার দেহ-মনে সমুদ্রের ঢেউয়ের উত্তাল তরঙ্গ গর্জে ওঠে। এই বয়সটা যেমন গড়ে ওঠার, নষ্ট হওয়ার বয়সও এটিই। কতো রকমের নষ্ট পথ আর ফাঁদ যে আছে, যা আমরা জানি, কিন্তু একজন তরুণ কী জানবে? নিষিদ্ধ জিনিসের প্রতি প্রকৃতিগতভাবেই মানুষের আকর্ষণ বেশি। ক্ষমতা-অর্থ-নারী-মদ এসব লোভনীয় বিষয়গুলো যখন সুলভ হয়ে ওঠে একজন তরুণের জন্য, প্রকৃতির নিয়মেই তরুণের চোখ যাবে সেদিকে। আমাদের শিক্ষকদের নৈতিক ও আদর্শিক শিক্ষা নিয়েই তো তরুণ শিক্ষার্থী এই সব লোভের ফাঁদ থেকে আত্মরক্ষা করে নিজেকে পরিপূর্ণ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলবে। এই বয়সে শুধু পাঠ্যবিষয় নয়, প্রকৃতির সবকিছুই তার শেখার বিষয়। তাঁর শিক্ষকের পা ফেলার ছন্দ পর্যন্ত সে অত্যন্ত তীক্ষèভাবে লক্ষ করে। আপনি শিক্ষক হয়ে নিজে মাসে কেন, বছরেও একটি বই কিনবেন না, বাড়িতে গেলে দামি দামি আসবাবপত্রের জৌলুসের অভাব নেই, কিন্তু বইয়ের দুটো আলমারি পাবেন না, নিজের ডিসিপ্লিনের নতুন বই প্রকাশের কোনো খবরই রাখবেন না, আপনি কী করে প্রত্যাশা করেন যে, আপনার ছাত্র বই কিনবে, লেখাপড়ায় পরিপূর্ণ মনোযোগী। আমার ছাত্র তো আমারিই সংস্করণ, এক অর্থে ফটোকপি, আমার কাছেই তার শিক্ষা-দীক্ষা। গুরু যে পথে হাঁটবেন শিষ্য তো সে পথেই হাঁটবে, নাকি? কী বলেন? ছাত্ররাজনীতি নষ্ট হয়ে গেছে বলে যারা চেঁচায়, নষ্ট কিন্তু তারাই করেছে। নিজের দিকে একবার তাকিয়ে দেখুন, আমরা নিজেরা, যারা নিজেদের পথপ্রদর্শক হিসেবে দাবি করি, তারা কতোটা পথে আছি, তারপরে তো আপনি পেছনে তাকাবেন, শিষ্য পথে আছে কিনা? 

. রে : এবার একটু অন্য প্রসঙ্গে আসি। মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত বাংলাদেশ। দেশে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিষয়টি আটকে ছিল দীর্ঘদিন। বর্তমান সরকার এই বিচার প্রক্রিয়া শুরু করলে তা ব্যাপক জনসমর্থন পায় এবং সময়ের দাবিতে পরিণত হয়। নতুন প্রজন্ম যুদ্ধাপরাধী যুদ্ধকালীন মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িতদের বিচারের দাবিতে সোচ্চার হয়ে ওঠে। তারই ধারাবাহিকতায় সরকার বেশকিছু শীর্ষ যুদ্ধাপরাধীর বিচার কার্যকর করেছে এবং এই বিচার প্রক্রিয়া চলমান। আপনি একটি গল্পে (অসংখ্য চিৎকার) যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে নতুন প্রজন্মের জেগে ওঠার চিত্র দেখিয়েছেন। বর্তমানে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী প্রতিক্রিয়াশীল সাম্প্রদায়িক শক্তি মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ভেঙে ফেলার ঘটনাও ঘটেছে। ব্যাপারে সরকারের অবস্থান অস্পষ্ট বলে মনে করেন অনেকে। বিষয়টি আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?

. : ‘অসংখ্য চিৎকার’, ‘পোড়োবাড়ি ও মৃত্যুচিহ্নিত কণ্ঠস্বর’, ‘ইঁদুর নিধন প্রকল্প’ এসব গল্পের প্রধান বিষয় মুক্তিযুদ্ধ ও যুদ্ধাপরাধীর বিচার। আমি এই গল্পগুলো যখন লিখেছি, আমি এই বিশ্বাস থেকে লিখেছি যে, শুধুমাত্র স্বাধীনতার পক্ষের শাসকগোষ্ঠীর দিকে তাকিয়ে থাকলেই হবে না, কারণ, যুদ্ধাপরাধীর বিচারের মতো কঠিন একটি লড়াই ও চ্যালেঞ্জ শাসকের পক্ষে একা নেয়া সম্ভব নয়। তৃণমূল থেকে মানুষের ঐক্যবদ্ধ কণ্ঠস্বর প্রতিবাদে সরব না হয়ে উঠলে, মুক্তিকামী জনতা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পতাকা হাতে নিয়ে ঐক্যবদ্ধ শক্তিতে পরিণত না হলে, সরকারের একার পক্ষে যুদ্ধাপরাধীর বিচার সম্ভব হবে না। কারণ, প্রধান যুদ্ধারাপরাধী ও তাদের রাজনৈতিক দল ইতোমধ্যে ক্ষমতার রাজনীতিতে নিজেদের  প্রতিষ্ঠিত করেছে। এতোটাই প্রতিষ্ঠিত করেছে যে, প্রধান যুদ্ধাপরাধীরা মন্ত্রী-এমপি হয়ে গাড়িতে বাংলাদেশের জাতীয় পাতাকা উড়িয়ে সদম্ভে আত্মপ্রকাশ করেছে। পরিপূর্ণভাবে যখন যুদ্ধাপরাধীর বিচার শুরু হলো এবং এ সময় শাহবাগ থেকে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছিল বিচারের দাবিতে অসংখ্য কণ্ঠের স্লোগান, তখন আমার নিজের আত্মশ্লাঘাবোধ জন্মেছিল এই ভেবে, এই স্বপ্নেই তো আমি গল্পগুলো লিখেছিলাম ২০১০ বা তার আগে-পিছের সময়কালে। প্রতিবাদের অসংখ্য চিৎকারের শক্তির কাছে অপরাধী যত শক্তিশালীই হোক না কেন, পরাজয় নিশ্চিত। মুক্তিযুদ্ধে আমরা পেরেছি, এখন কেন পারব না? এই আত্মজিজ্ঞাসা থেকেই গল্পগুলোর জন্ম। জানি না, গল্প হয়েছে কি না, কিন্তু আমার জিজ্ঞাসা, আমার ক্রোধ, প্রত্যাখ্যান, লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যকে যতোটা সম্ভব চেষ্টা করেছি গল্পাখ্যানে তুলে ধরতে। যে বিষবৃক্ষের এতো সর্বত্রগ্রাসী বিস্তার, তাকে সমূলে উপড়ে ফেলার জন্য জাতিকে আরো সংঘবদ্ধ লড়াই আরো তীব্র করতে হবে। মনে রাখতে হবে, অল্প কয়েকজন প্রধান যুদ্ধাপরাধীর বিচার সম্পূর্ণ করলেই বিচার প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হবে না। যুদ্ধাপরাধীর বিচারের পাশাপাশি তরুণ সমাজের মস্তিষ্ক থেকে যুদ্ধাপরাধীর চেতনাকে ডিলিট করার ব্যবস্থা করতে হবে। যদি তা সম্ভব না হয়, ঘটনা সম্পূর্ণ উল্টো দিকে মোড় নেবে। আবার ভয়ঙ্কর আঘাত আসবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার উপরে। তাদের অস্তিত্ব যে সতেজ, সক্রিয় এবং তারা যে বসে নেই, বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ভেঙে ফেলার মধ্যেই তার প্রমাণ। এছাড়া অত্যন্ত সুকৌশলে ও উদ্দেশ্যপ্রণীতভাবে মূর্তি ও ভাস্কর্যের বিতর্ক তৈরি করে জাতিকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিপরীত ভাবনার দিকে ঠেলে নেবার চেষ্টা করছে।

. রে : অনেক ব্যস্ততার মধ্যে অনেক সময় নিয়ে আপনি পাঠকের সাথে বিভিন্ন বিষয়ে আপনার ব্যক্তিচিন্তা শেয়ার করলেন। আপনাকে ধন্যবাদ, আপনার প্রতি অশেষ কৃতজ্ঞতা।

. : আপনাকেও অনেক ধন্যবাদ।    

*আলী রেজা, কবি, প্রাবন্ধিক, গবেষক ও কলেজ শিক্ষক।

Side banner