কবি কাজী নজরুল ইসলাম
কবি নজরুল জীবন ও কাব্যে নার্গিস
মাসুম খান
বাঙালির জাতীয় জীবনে কবি নজরুলের আদর্শের প্রভাব কতটা পরেছে এবং আজ পর্যন্ত টিকে আছে, তা নিয়ে নতুন করে গবেষণার প্রয়োজন হলেও, বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনে কবির আদর্শ-প্রভাব বাঙালি মনে-প্রাণে গ্রহণ করেছিলো। এ সত্য বিশ্বাস করতে কারো গবেষণা গ্রন্থের দিকে না তাকালেও হয়।
কবির লেখনী সে দিন ভারত মাতার সকল সন্তানের প্রাণে আশার আলো হয়ে জ্বলেছে। দ্বি-জাতি তত্ত্বের বিদ্ধেষ ভুলে ঐক্যবদ্ধ বাঙালি সেদিন আন্দোলন করেছে, সংগ্রাম করেছে। এ দ্বি-জাতি তত্ত্বের বিরোধী লেখাও আমরা কবি নজরুলের কাব্যে প্রথম লক্ষ্য করি-
‘‘অসহায় জাতি মরিছে ডুবিয়া, জানে না সন্তরণ,
কাণ্ডারী! আজ দেখিব তোমার মাতৃমুক্তি-পণ!
‘হিন্দু-না ওরা মুসলিম?’ ওই জিজ্ঞাসে কোন্ জন?
কাণ্ডারী! বল্, ডুবিছে মানুষ; সন্তান মোর মার!’’
(কাণ্ডারী হুঁশিয়ার, সর্বহারা)
হিন্দু মুসলিম সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার মধ্যেও কবি আশার আলো দেখেছেন, যা তাঁর সমসাময়িক বা পূর্ববর্তী কোন কবি, সাহিত্যিক এমন কি রাজনৈতিক নেতাদেরও কল্পনায় আসে নি। কবি নজরুলই প্রথম উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন ভারতীয় হিন্দু-মুসলিম জনগণের যৌথ শক্তির সামনে বৃটিশ বেনিয়ারা কিছুতেই টিকতে পারবেনা। আরও উপলব্ধি করেছিলেন ভারতের হিন্দু-মুসলিমেরা জেগেছে, তাঁদের শক্তির পরীক্ষা চলছে, রক্ত ঝড়ছে-ঝড়াচ্ছে। তাঁদের রক্ত দিতে আর ভয় নাই। তাঁরা কালপ্রভাতে রক্ত দিবে-ভারত মাতার মুক্তির জন্যে। কবি জানতের মুক্তির জন্য প্রয়োজন রক্তের, ভাল কথা দিয়ে স্বাধীনতা পাওয়া যায় না, চর্কা বন্ধ করলেও স্বাধীনতা আসবে না। তাই কবি আশাবাদী হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গাতেও-
‘‘মরিছে হিন্দু মরে মুসলিম এ উহার ঘাড়ে আজ,
বেঁচে আছে যারা মরিতেছে তারা, এ মরণে নাহি লাজ।
জেগেছে শক্তি তাই হানাহানি,
অস্ত্রে অস্ত্রে নব জানাজানি।
আজি পরীক্ষা-কাহার দস্ত হয়েছে কত দারাজ!
কে মরিবে কাল সম্মুখ-রণে, মরিতে কা’রা নারাজ।’’
.....................
......................
‘‘উঠিবে এবার সত্য হিন্দু-মুস্লিম মহাব্ল।
জেগেছিস তোরা, জেগেছে বিধাতা, ন’ড়েছে খোদার কল।’’
....................
....................
‘‘যে লাঠিতে আজ টুটে গম্বুজ, পড়ে মন্দির চূড়া,
সেই লাঠি কালি প্রভাতে করিবে শত্রুদুর্গ গুড়াঁ!
প্রভাতে হবে না ভায়ে ভায়ে রণ,
চিনিবে শত্রু, চিনিবে স্বজন।
করুক কলহ জেগেছে তো তবু বিজয়-কেতন উড়া!
ল্যাজে তোর যদি লেগেছে আগুন, স্বর্ণ লঙ্কা পুড়া!”
(হিন্দু-মুস্লিম যুদ্ধ, ফণিমনসা)
ভারত মুক্তি আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে কবি পৃথিবীর সমস্ত শোষিত বঞ্চিত মানুষের মুক্তির কথা বলেছেন, তাদের মুক্তিকামনা করেছেন। বিশ্ব জননী মা’বসুধার সকল সন্তানের মুক্তি কামনা করেছেন কবি তাঁর বিভিন্ন কবিতা-গানে, প্রবন্ধে। শ্রেণিহীন সমাজের স্বপ্নে কবি বছেলেন-
‘‘দেখিনু সেদিন রেলে,
কুলি বলে এক বাবু সা’ব তারে ঠেলে দিল নীচে ফেলে!
চোখ ফেটে এলো জল,
এমনি ক’রে কি জগৎ জুড়িয়া মার খাবে দুর্বল?”
(কুলি-মজুর, সর্বহারা)
কাব্য-কবিতায় এ বিশ্বজনীন বাণী যাঁর লেখনিতে প্রকাশ পায়, যে সদা শোষকের বিরোধে-শোষিতের পক্ষে থেকেছেন, লিখেছেন, সেই কবি’র ব্যক্তি জীবনে এক শ্রেণির লেখক-গবেষক কালিমা লেপনে উঠে-পরে লেগেছে। আজ বাংলাদেশের এ লেখক-গবেষক শ্রেণি কবি মানস থেকে অনেক দূরে অবস্থান করে। সে দূরত্ব অতিক্রম না করেই তারা কবিকে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করায়। তারা কবি নজরুলকে স্বেচ্ছাচারি-প্রতারক-শোষক-প্রবঞ্চক রূপে পাঠকদের কাছে উপস্থাপন করতে বেশি পছন্দ করে। এ যেন পিছন থেকে টেনে নীচে নামানোর অপচেষ্টা। জাতীয় কবি কাজী নজরুলের বিরোধে এমন অভিযোগ শুধু অযোক্তিকই নয়, অন্যায়ও বটে। অথচ, এ শ্রেণির ভারাটে লেখকরাই আজ এদেশের নজরুল গবেষক, নজরুল বিষয়ক পণ্ডিত। এরা কবি নজরুলকে কতটা উপলব্ধি করে, তাঁর সাহিত্য পাঠ করে, তাঁকে উল্লেখিত অভিযোগের বিচারের কাঠগড়ায় দাঁয়করায় তা প্রশ্ন বিদ্ধ।
এ ছাড়া আছে গবেষকদের স্ববিরোধী তথ্য, তথ্য বিভ্রান্তিসহ ভুল তথ্য, তথ্য বিশ্লেষণে কৃপনতা। শুধু টাকার প্রয়োজনে পত্রিকায় পাঠানোর উপযোগী লেখা না দিয়ে গবেষকদের উচিত, গবেষণা মূলক লেখাটি দ্বিতীয় বার পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা। এটাই সবার কামনা আর তা’তেই মাতৃভাষা ও সাহিত্যের সমৃদ্ধি।
দৈনিক সমকালের শুক্রবারের সাময়িকী ২৬ মে ২০০৬ ‘কালের খেয়ার’ ৪৭তম সংখ্যায়, আবদুল মান্নান সৈয়দ লিখিত ‘‘নজরুলের ‘প্রলয়-শিখা’’শীর্ষক প্রবন্ধে নজরুল সম্পর্কে আলোচনায় কৃপণতা লক্ষ্য করার মত। যদিও তিনি মঈন উদ্দিন হোসয়নের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন- ‘সেই সময়ে, গণজাগরণের এই পুণ্য মুহূর্তে প্রলয়-শিখা তাহার জ্বালাময়ী অনলবর্ষিণী বাণী প্রচার করিয়া বিপ্লবকে সার্থক করিতে চাইয়াছিল। গ্রন্থের পাণ্ডুলিপি দেখিয়া প্রকাশকগণ বুঝিলেন যে, এ গ্রন্থের লেখক, মুদ্রাকর ও প্রকাশক কেহই বিদেশী সরকারের আক্রোশ হইতে অব্যাহতি পাইবেন না। বস্তুত কোনো প্রকাশক গ্রন্থ ছাপাইয়া সরকারী রোষের কবলে পড়িতে সম্মত হইলেন না। কিন্তু বিদ্রেহী কবি নজরুল তাহাতেও দমিলেন না। তিনি নিজের নামে ও নিজের দায়িত্বে প্রলয়-শিখা প্রকাশ করিলেন- অর্থাৎ নিজেই প্রকাশক ও মুদ্রাকর হইলেন। কবির এই ত্রিমূর্তিরূপ বাংলা সাহিত্যে এক অভিনব ব্যাপার। ‘প্রলয়-শিখা’ প্রকাশের পর কবির ছয় মাস সশ্রম কারাদণ্ড এবং গান্ধীজির ‘গান্ধী-আরউইন প্যাক্ট’ চুক্তির শর্তানুসারে কবি মুক্তি পেলেও বইটি বাজেয়াপ্তই থেকে যায়।’’ এ প্রসঙ্গে প্রাবন্ধিক অধ্যাপক আবদুল মান্নান সৈয়দ তথ্য বিশ্লেষণে কৃপন ছিলেন। তিনি শুধু আমাদের কাছে একটি সংবাদ উপস্থাপন করলেন- প্রকাশের পরপরই রাজদ্রোহের দায়ে অভিযুক্ত হন নজরুল (সংবাদ প্রকাশিত হয় ১৯৩০ সালের ১২ ডিসেম্বর ‘আনন্দবাজার পত্রিকায়)। কবির সশ্রম কারাদণ্ডের বিচার কবির উপস্থিতিতে হয়েছিল না-কী কবির অনুপস্থিতিতে হয়েছিল, তা আমরা জানতে পারলাম না। আমরা যতটুকু জানি, কবি একবার মাত্র গ্রেফতার হয়েছিলেন, কুমিল্লাতে ২৩ নভেম্বর ১৯২২ সালে। ‘ধূমকেতু’তে (২৬ সেপ্টেম্বর ১৯২২) প্রকাশিত ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ শীষর্ক কবিতার জন্য। এ বিষয়ে শ্রদ্ধেয় অধ্যাপক আবদুল মান্নান সৈয়দ তাঁর ‘নজরুল ইসলামের কবিতা’ গ্রন্থের ‘সেই কবিতাটি যার জন্য নজরুল জেল খেটেছিলেন’ প্রবন্ধে বলেন, ‘‘১৯২২ খ্রিস্টাব্দের ২৬ সেপ্টেম্বর ‘ধূমকেতু’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল ‘আনন্দময়ীর আগমনে’; ৮ নভেম্বর পুলিশ ‘ধূমকেতু’ অফিস তল্লাশি করে, তখনই নজরুলের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা ছিল, ২৩ নভেম্বর নজরুলকে গ্রেফতার করা হয় কুমিল্লা থেকে। বস্তুত এই ২৩ নভেম্বর ১৯২২ থেকে নজরুল অন্তরীণ ছিলেন ১৯২৩ সালের ১৫ ডিসেম্বরে তিনি মুক্তি পান।’’ কমরেড মুজফ্ফর আহ্মদ লিখিত ‘‘কাজী নজরুল ইসলাম: স্মৃতি কথা’’য় বলেন, ‘‘এর মধ্যে ‘ধূমকেতু’ আফিস তালাশির ও ভারতীয় দণ্ডবিধি আইনের (ওহফরধহ চবহধষ পড়ফব) ১২৪-এ ধারা অনুসারে ধূমকেতুর সম্পাদক কাজী নজরুল ইসলাম এবং তার মুদ্রাকর ও প্রকাশক আফজালুল হক সাহেবের বিরুদ্ধে গিফতারী পরওয়ানা বা’র হয়ে গিয়েছিল।
তারিখটা ১৯২২ সালের ৮ই নভেম্বর ছিল। কমরেড আবদুল হালীম আর আমি সেদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে এক দোকানে চা খেয়ে বেড়াতে ‘ধূমকেতু’ আফিসে গেলাম। আমরা তখন চাঁদনীর ৩ নম্বর গুমঘর লেনে আমার ছাত্রদের বাড়ীতে রাত্রে ঘুমাতার। ৭ নম্বর প্রতাপচাটুজ্যে লেনস্থিত ‘ধূমকেতু’র আফিসে গিয়ে দেখলাম অত সকালেও শ্রীবীরেন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত এসে ‘ধূমকেতু’র জন্যে লিখছেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই দোতলায় ওঠার সিঁড়িতে একসরঙ্গ অনেকগুলি জুতোর শব্দ শোনা গেল। পুলিস এসেছে ‘ধূমকেতু’ আফিসে তালাশির পরওয়ানা ও কাজী নজরুল ইসলামের নামে গিরেফ্তারী পরওয়ানা নিয়ে। নজরুল তখন সমস্তিপুরে গিয়েছিল বলে গিরেফ্তার হয়নি। পুলিশ আসার মুহুর্তেও ভিতরে বীরেনবাবু যে কোথায় উধাও হয়ে গেলেন আমরা তার কিছুই টের পেলাম না। পুলিশ প্রথম নজরুলকে খুঁজল। আমরা জানালাম যে তিনি কলকাতার বাইরে কোথাও গেছেন। তখন পুলিশ আমাদের গবর্নমেন্ট অর্ডার দেখালেন যে ২ শে সেপ্টেম্বর (১৯২২) তারিখে ‘ধূমকেতু’তে প্রকাশিত ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ শীর্ষক একটি কবিতা ও ‘‘বিদ্রোহীর কৈফিয়ৎ’’ (অধ্যাপক শ্রীসাতকড়ি মিত্রের ছোট বোনটির লেখা) শীর্ষক একটি ছোট প্রবন্ধ বাজয়াফ্ৎ হয়ে গেছে। পুলিশ এইসংখ্যার কপিগুলি নিয়ে যাবেন বললেন। তারপর বাড়ীতে তালাশি হলো ২৬শে সেপ্টেম্বর তারিখের ‘ধূমকেতু’র যে কয়খানা কপি পাওয়া গেল তাই নিয়ে পুলিশ চলে গেলেন। আমাকে সার্চলিস্টও দিয়ে গেলেন। পুলিশ চলে যাওয়ার পরে দেখলাম বীরেনবাবু হাসতে হাসতে পুব দিককার মেডিকাল ছাত্রদের বোর্ডিং হাউস থেকে বেরিয়ে আসছেন। ‘ধূমকেতু’ আফিসের বারান্দা ও মেডিকাল ছাত্রদের বোর্ডিং হাউসের বারান্দা কাঠের দরওজার দ্বারা বিভক্ত ছিল। ছাত্রদের দিক হতেই সেটা বন্ধ হতো। বীরেনবাবু আগেই ব’লে রেখেছিলেন কিনা জানিনা, পুলিশকে আসতে দেখেই ছাত্ররা দরওজাটা খুলে দিয়েছিলেন এবং বীরেনবাবু চলে গিয়েছিলেন সেই বাড়ীতে।
‘ধূমকেতু’র অনেক লেখা নিয়েই নজরুলের নামে মোকদ্দমা হতে পারত, কিন্তু হলো ‘‘আনন্দময়ীর আগমনী’’কে নিয়ে। এই কবিতাটি লেখার একটা ছোট্ট ইতিহাস আছে।’’ (পৃষ্ঠা : ১৬৬। কমরেড মুজফ্ফর আহ্মদ-কাজী নজরুল ইসলাম : স্মৃতি কথা। ন্যশনাল বুক এজেন্সি প্রাইভেট লিমিটেড. ১২ বঙ্কিম চাটার্জী স্ট্রিট, কলকাতা-৭৩, প্রথম মুদ্রণ : সেপ্টম্বর ১৯৬৫; একাদশ মুদ্রণ, সেপ্টম্বর ২০০৩) ১৫৬ পৃষ্ঠায় আরো বলেন, “ধূমকেতুর উদয়’ শীর্ষক অধ্যায়ে বলা হয়েছে, ‘‘কেউ কেউ লিখেছেন, এক বছর সাজা পুরো হওয়ার আগেই কাজী নজরুল ইসলাম জেল হতে মুক্তি পেয়েছিল। জেলখানার কায়দা সম্বন্ধে ওয়াকিফ্হাল নন বলেই তাঁদের মনে এই ধারণা হয়ে থাকবে। প্রিজন এক্টের কায়দা অনুসারে দণ্ডিত বন্দীরা প্রতি মাসে চারদিন হিসাবে এখন রিমিশন পান। কিন্তু নজরুলের যখন সাজা হয়েছিল তখন প্রতিমাসে তাঁর তিনদিন হিসাবে রিমিশন পেতেন। সাজা হওয়ার মাসে ও মুক্তি পাওয়ার মাসে কয়েদীরা কোনো রিমিশন পান না। কাজেই, দশ মাসে নজরুল নিশ্চয় ত্রিশ দিনের রিমিশন পেয়েছিলেন। তবে, ছাড়া পাওয়ার আগে প্রিজন এক্ট ভাঙার অপরাধে নজরুলের নামে আদালতে একটি মোকদ্দমা হয়েছিল। ১৯২৩ সালের ১৩ই ডিসেম্বর তারিখের ‘অমৃতবাজার পত্রিকা’ হতে জানতে পারা যায় যে ১০ই ডিসেম্বর তারিখে নজরুল ইসলামকে বহরমপুরের সব-ডিভিসনাল ম্যাজিস্ট্রেট শ্রী এন,কে, সেনের আদালতে হাজির করা হয়েছিল। শহরের বিশিষ্ট হিন্দু-মুসলমান উকীলেরা বাবু বজ্রভূষণ গুপ্তের নেতৃত্বে কবির পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন। পুলিশের অনুরোধে ম্যাজিস্ট্রেট ১৪ই ডিসেম্বর (১৯২৩) তারিখে মোকদ্দমার দিন ফেলেন। ‘অমৃতবাজার পত্রিকার’ রিপোর্ট হতে এও জানা যায় যে নূতন করে সাজা না পেলে কবি ১৫ই ডিসেম্বর (১৯২৩) তারিখে বহরমপুর (মুর্শিদাবাদ) ডিস্ট্রিক্ট জেল হতে মুক্তি পাবেন। দশ মাসে ত্রিশ দিন রিমিশন পেলে ১৫ই ডিসেম্বর তারিখেই নজরুলের মুক্তি পাওয়ার কথা।’’ (পৃষ্ঠা : ১৭৩। কমরেড মুজফ্ফর আহ্মদ-কাজী নজরুল ইসলাম : স্মৃতি কথা। ন্যশনাল বুক এজেন্সি প্রাইভেট লিমিটেড. ১২ বঙ্কিম চাটার্জী স্ট্রিট, কলকাতা-৭৩, প্রথম মুদ্রণ : সেপ্টম্বর ১৯৬৫; একাদশ মুদ্রণ, সেপ্টম্বর ২০০৩) এক্ষেত্রে কালের খেয়ার-৪৭ সংখ্যার উল্লেখিত প্রবন্ধে বিস্তারিত আলোচনা না থাকায় আমরা জানতে পারলাম না, কবি ক’বার গ্রেফতার হলেন এবং জেল খাটলেন। একবার না একাধিক বার? আমরা এখানে জানতে না পারলেও শ্রদ্ধেয় লেখকের উল্লেখিত গ্রন্থের ১৪৬ পৃষ্ঠায় দেখি তিনি বলেছেন, ‘‘সামাজিক জীবনে যেমন তেমনি রাজনীতির ক্ষেত্রেও নজরুল ছিলেন নিরাপোষ, ইংরেজের বিরুদ্ধে লেখায় তাঁর বই বাজেয়াপ্ত হয়েছে, একবার জেল খেটেছেন, আর একবার জেলে যাবার উপক্রম হয়েও অল্পের জন্যে বেঁচে গেছেন।’’ এ উদ্ধৃতিতে আমরা দেখি কবির ব্যক্তিগত সামাজিক জীবন আর রাজনৈতিক জীবন একই ধারায় প্রবাহিত এবং কোনো অবস্থাতেই যা অসুন্দর, অন্যায় তার সাথে তিনি কখনোই আপোষ করেন নি। এ বিষয় গুলো আমরা ভালোভাবে বুঝতে পারবো তাঁর ব্যক্তিগত জীবনে বিভিন্ন প্রসঙ্গে। গান্ধীজির অসহযোগ আন্দলনে ভারত ভূমির প্রতিটি মানুষ যখন অংশ নিলো, নজরুল তখন সে আন্দলনের বিরুদ্ধে কলম ধরলেন। তিনি ঘোষণা করলেন রক্তছাড়া স্বাধীনতা বা স্বরাজ কোনটাই আসবে না, চাই ত্যাগ, চাই রক্ত।
‘‘বুকের ভিতর ছ-পাই ন-পাই, মুখে বলিস স্বরাজ চাই,
স্বরাজ কথার মানে তোদের ক্রমেই হচ্ছে দরাজ ভাই!
‘ভারত হবে ভারতবাসীর’-এই কথাটাও বলতে ভয়!
সেই বুড়োদের বলিস নেতা-তাদের কথায় চলতে হয়।
বল রে তোরা বল নবীন-
চাইনে এসব ঞ্গান-প্রবীণ!
স্ব-স্বরূপে দেশকে ক্লীব করছে এরা দিনকে দিন,
চায় না এরা-হই স্বাধীন!
কর্তা হবার সখ সবারই, স্বরাজ-ফরাজ ছল কেবল!
ফাঁকা প্রেমের ফুস-মন্তর, মুখ সরল আর মন গরল!
এবার তোরা সত্য বল!’’
(কবিতা : বিদ্রোহী বাণী-২; কাব্য : বিষের বাঁশী)
কবি নজরুল বিষয়ে তথ্য বিভ্রান্তিমূলক আলোচনার পাশা-পাশি তাঁকে ছোট করা, ইতর শ্রেণিতে নামানোর যে অপকৌশল গবেষকদের মধ্যে লক্ষ্য করা যায়, তা দেখে আমরা পাঠকেরা বিস্তিত হই। আর এ অপকৌশলটা ব্যবহার করে মূলত: কবি’র বিয়ে প্রসঙ্গ। কবির বিয়ে সম্বন্ধে দুই বাংলায় প্রচলিত যে ভ্রান্ত ধারণা, তা থেকে কবিকে বিবেক বর্জিত বলেই মনে হয়। কিন্তু আসলেই কি কবি নজরুল বিবেক বর্জিত সাধারণ মানুষদের একজন ছিলেন? এ সাধারণ জিজ্ঞাসা তাঁর গবেষকেরা করেন বলে মনে হয় না। একাধিক বিয়ে ধর্ম সম্মত, সমাজ স্বীকৃত হলেও, স্ত্রী তালাকের পর তার (স্ত্রীর) ভরণ-পোষণের একটা অংশ স্বামী বেচারাকে নিতে হয়, ক্ষেত্র বিশেষ ভরণ-পোষণের বিষয় না আসলেও বিবাহিত স্ত্রীলোকের অন্যত্র বিয়ের ক্ষেত্রে তালাক অপরিহায্য কিন্তু নার্গিসের ব্যপারে এমনটা হয় নি এবং তালাক না হলেও নার্গিসের অন্যত্র, অর্থাৎ কবি আজিজুল হাকিমের সাথে বিয়ে হয়েছে ১২ ডিসেম্বর ১৯৩৮ খ্রিস্টাব্দে। এ বিয়ে কী ভাবে হলো? নার্গিস, নজরুলের বৌ; সে বৌ, আজিজুল হাকিমের বৌ হলো কি করে, এ প্রশ্ন যদি কোন গবেষক করেন, তাহলে সে কখনোই মেনে নিবেন না নজরুল নার্গিসের বিয়ে হয়েছিল। অবশ্য মোবাশ্বের আলী তাঁর “নজরুল ও তিন নারী” গ্রন্থের (কাকলী প্রকাশনী, ঢাকা। ফেব্রæয়ারী ২০০১) ২৮ পৃষ্ঠায় বলেন, ‘‘জীবন ও কাব্য এক নয়। অতএব প্রোষিতভর্তৃকা হয়ে অনন্তকাল অপেক্ষা করা সম্ভব নয়। তাই শেষ অবধি আইনসম্মতভাবে বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটে এবং নার্গিস নজরুলের এককালিন স্নেহাস্পদ কবি আজিজুল হাকিমের সাথে পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ’’ হলেন। এখানে মোবাশ্বের আলী’র বক্তব্য জীবন ও কাব্য এক নয়। ২৭ পৃষ্ঠায় তিনি নজরুলকে বলেছেন ‘প্রবঞ্চক’, ২৬ পৃষ্ঠায় বলেছেন কবি-নজরুল ও ব্যক্তি-নজরুল এক নয়। আর এই কবি-নজরুল ও ব্যক্তি-নজরুল এক নয় কথাটি তার লেখায় ধ্রুবের মত বার বার ঘুরে ফিরে এসেছে। যেন এ কথাটি প্রতিষ্ঠা করার জন্যই তার এ লেখার উদ্দেশ্য। সে যা হোক, মোবাশ্বের আলী’র উক্ত গ্রন্থের দিকে ভাল করে তাকালেই দেখা যায়, লেখক নজরুল সম্বন্ধে কত বড় অবিচার করেছেন। মোবাশ্বের আলীরা নজরুল-নার্গিসের বিয়ের আমন্ত্রণ পত্র থেকে শুরু করে তাদের প্রেমপত্রও উদ্ধার করেছেন এবং সেখান থেকে উদ্ধৃতি গ্রহণ করেছেন। শুধু কাবিননামা ও তালাকনামার খবর নাই। কেন নাই? সে প্রশ্নের কোন জবাব তাদের জানা নেই? না কি সে প্রশ্নের উত্তর আমাদের জানাতে ইচ্ছা তাদের নেই! কিন্তু আমরা জানি তার উত্তর, এ শ্রেণির লেখক-গবেষকেরা নজরুলকে নয় নার্গিসগংকে পঙ্ক থেকে পুস্পে তুলে আনতে চায়। সে চাওয়া দোষের নয়, তাই বলে মিথ্যে দিয়ে! নজরুলকে ফেলেদিয়ে, তাতো হতে পারে না। সত্য প্রকাশ হলে নার্গিসের সাথে কবি’র সম্পর্ক প্রেমপর্ব পর্যন্ত সীমাবদ্ধ, সংসার পর্যন্ত নয়। যে কারণে সত্য প্রকাশে এরা ভয় পায়। তারা যদি বলে কাবিন নামায় নজরুল স্বাক্ষর করেনি যে কারণে তালাকের প্রয়োজনও হয়নি। নজরুল নার্গিসকে ছুঁয়েছিলেন মাত্র একবার সেই যে জ্বরের সময়ে। নার্গিস কুমারি ছিলেন আজিজুল হাকিমের সাথে পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত। এ সত্য গোপন করে মোবাশ্বের আলীরা নজরুল-নার্গিস দু’জনকেই অপমান করছে। তা’তাদের লেখা ও উদ্ধৃতির ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণে পাওয়া যাবে। মোবাশ্বের আলী তার উল্লেখিত গ্রন্থের ২৩ পৃষ্ঠায় লিখেছেন- নজরুলের প্রতি প্রগাঢ় আকর্ষণ থেকেই তিনি সুদীর্ঘ সতের বছরের বিচ্ছেদের কালে মোট চার খানি চিঠি লেখেন। প্রথম চিঠির কোন জবাব নজরুল দেন নি, দ্বিতীয় চিঠির জবাবে একটি গান লিখে পাঠায়-
যারে হাত দিয়ে মালা দিতে পার নাই
কেন মনে রাখ তা’রে?
ভুলে যাও মোরে ভুলে যাও একেবারে।।
আমি গান গাই আপনার দুখে,
তুমি কেন আসি দাঁড়াও সম্মুখে,
আলেয়ার মত ডাকিও না আর
নিশীথ অন্ধকারে।।
দয়াকর মোরে দয়াকর,
আর আমারে লইয়া খেলোনা নিঠুর খেলা,
শত কাঁদিলেও ফিরিবে না আর
সেই শুভ লগনের বেলা।
আমি ফিরি পথে, তাহে কার ক্ষতি,
তব চোখে কেন সজল মিনতি?
আমি কি ভুলেও কোন দিন এসে
দাঁড়িয়েছি তব দ্বারে।।
ভুলে যাও মোরে ভুলে যাও একেবারে।।
কবি’র লেখা এ গানের প্রতিটি শব্দ বলে নার্গিস-আলী আকবার খানদের প্রতারণা-ছলনার কথা, তাদের শঠতার কথা। কবি সরাসরি বলে নি, বলেছেন গানে-গানে, কবিতার পংক্তিতে পংক্তিতে।
ভালবেসে নার্গিস যে মালা কবি’র গলায় পরাতে চেয়েছিল আলী আকবার খানের ছলনা ও শঠতার কারণে সে মালা নার্গিস কবি’র গলায় পরাতে পারেনি। কবিকে করেছে অপমান, নিয়েছে ছলনার আশ্রয়। সে আলেয়ার মত দূরে চলে যায় কবি-মানস ভুবন থেকে। কবি আসে ফিরে প্রথম যৌবনের দ্বিতীয় প্রেমের কাছ থেকে। ফিরে এসে আর ফিরে তাকায় নি। তাইতো কবি বলেছেন-
‘আমি কি ভুলেও কোন দিন এসে
দাঁড়িয়েছি তব দ্বাঁরে?।।’
নার্গিস কবিকে ফিরিয়ে দিয়ে হৃদয় ভেঙ্গে দিয়ে কাছে আসতে চাইলে, শত ডাকাডাকি করলে কি আর সেই শুভ দিন পাওয় যাবে? কবি বলেই হৃদয়ের রক্ত ক্ষরণ বাণীরূপ পেয়েছে-
শত কাঁদিলেও ফিরিবে না আর
সেই শুভ লগনের বেলা।
এ বাণী কার ব্যর্থতার জন্যে কবি’র না নার্গিসের? এ প্রশ্নের জবাবের ব্যবস্থাও মোবাশ্বের আলী করেছেন তাঁর এ গ্রন্থে। তিনি বলেন- “কিন্তু নার্গিসের পক্ষে প্রাণ প্রিয়কে একেবারে ভুলে যাওয়া সম্ভব নয়। নার্গিসতো নজরুলকে আশ্রয় করেই বাঁচতে চেয়েছেন। এবং তাঁর আতিœয়রাও সমঝোতার জন্য প্রাণান্তকর চেষ্ঠা করতে থাকেন- মান-সম্মান খুইয়ে। এবং নার্গিস চিঠি লিখে জানান যে, তিনি তাঁর পথ চেয়ে বসে আসেন এবং তাঁকে না পেলে এ ভাবে বেঁচে থাকার কোন অর্থ নেই। আরো লেখেন তাঁকে না পেলে আত্মহত্যার পথ বেছে নেবেন। এবং অনুরোধ করেন এই বলে: প্রমীলাকে বিয়ে করেছেন এতে তাঁর কিছু এসে যায় না। নজরুল যদি সত্যি তাঁকে ভালবেসে থাকেন তবে একবার যেন ঢাকায় এসে দেখা করেন।
নার্গিসের এই বিপর্যয়ের কথা শুনেও নজরুল এক মহামানবসুলভ উপদেশের ঢিল ছুড়ে সুদীর্ঘ পত্র লিখলেন: দীর্ঘ চিঠির উদ্ধৃতি দিয়ে পাতা বাড়াতে চাইনা। তবে এ চিঠিতেই পাওয়া যাবে নজরুল নার্গিসের সর্ম্পক। তার আগে মোবাশ্বের আলীর এ দীর্ঘ উদ্ধৃতি তে দৃষ্টিপাত করতে চাই।
১. নার্গিস কবি নজরুলকে না পেয়ে আত্মহত্যা করেনি।
২. নজরুলের আশ্রয়ে নার্গিস বাঁচতে চেয়েছেন। মামা বাড়ির আশ্রয়ের চেয়ে সেটাই ভাল ভাবনা ছিল, কিন্তু সময় অনেক দূরে চলে এসেছিল। কবি সব অপমান সহ্য করেও হয়তো নার্গিসের পাণি গ্রহণ করতেন। যদিনা তিনি বিয়ে করতেন। তিনি চাননি এক নারীর ভালবাসার জন্য আর এক নারী, যে তার বিবাহিতা স্ত্রী সে বঞ্চিত হোক। তাই প্রেয়সী নার্গিসের আশ্রয় নজরুলের ঘরে হয়নি। ভালবাসার নার্গিস তাঁর হৃদয়ের মণিকোঠার আশ্রয়ে ছিল। কিন্তু ভালবাসার মানসী দেবীকে না পাওয়ার বেদনা কবি সারা জীবন অনুভব করেছেন- সিন্ধু হিন্দোল কাব্যের ‘অ-নামিকা’ কবিতায় সেই গোপন চাওয়া বাণী রূপ পায়-
“গোপন-চারিণী মোর, লো চির-প্রেয়সী!
সৃষ্টি দিন হ’তে কাঁদ’ বাসনার অন্তরালে বসি’,-
ধরা নাহি দিলে দেহে।
তোমার কল্যাণ-দ্বীপ জ্বলিল না
দীপ-নেভা বেড়া-দেওয়া গেহে।
অসীমা! এলেনা তুমি সীমা রেখা পারে!
স্বপনে পাইয়া তোমা’ স্বপনে হারাই বারে বারে
অরূপা লো! রতি হ’য়ে এলে মনে,
সতী হ’য়ে এলে না ক’ঘরে।
প্রিয়া হয়ে এলে প্রেমে,
বধূ হয়ে এলে না অধরে!
দ্রাক্ষা-বুকে রহিলে গোপনে তুমি শিরীন্ শরাব,
পেয়ালায় নাহি এলে!-’’
৩. নার্গিসের আত্মীয়রা নজরুলের সাথে সমঝোতার জন্য প্রাণান্তরক চেষ্টা করতে থাকে মান-সম্মান-খুইয়ে। প্রশ্ন হলো- কিসের সেই সমঝোতা! নার্গিস নজরুলের বিবাহিতা স্ত্রী হলে একবার দু’বার তারপর সমঝোতা হতো আইনে। আর সেটাই ছিল সাভাবিক, তা হয়নি। নজরুল-নার্গিসের বিবাহ বিচ্ছেদেরও কোন প্রমাণ পাওয়া যায় না, যা আছে তা’ আলী আকবর খানের বিরোধে যায়। আর তাহলো কবির লেখা চিঠি- ‘মা, আলী আকবর খান আমাকে নোটের তাড়া দেখিয়ে গেল।’ আলী আকবর খানের এ নোটের তাড়া দেখানোর প্রয়োজন কিসের জন্য? পরাধিন যুগের স্বাধীন কবিকে কি নোটের তাড়া দিয়ে কেনা যায়? ব্যবসায়ী আলী আকবর তা’ চিন্তা করতে পারেন। কিন্তু আমরা জানি কবি সাধের ভিক্ষারী। তাঁর ভিক্ষা প্রেম সাধনা। টাকা-পয়সা, ধন-দৌলত নয়। চির বিরহী কবি চিত্তে ভালবাসার শ্যামল ছায়া প্রথম পড়ে দৌলতপুরে, তা’তে কোন সন্দেহের অবকাশ নাই। কিন্তু নার্গিসের সে ভালবাসা যে, খান সাহেবের স্বার্থে সাজানো ছিল, তা কবি বুঝতে পারেনি। যখন বুঝলেন তখন অনেক দেরি হলেও কবি ফিরে এলেন কিন্তু তার হৃদয় থেকে গেল গোমতীর তীরে সেই কিশোরী বালিকার চরণ তলে। কবি তাকে নিবেদন করলেন অজস্র কবিতা গান। নার্গিসের প্রতি কবির ভালবাসা কখনোই ¤øান হয়নি। কবি নার্গিসকে সারা জীবন মানস পটে লালন করেছেন। সেক্ষেত্রে কবিপত্মী রিক্তা, ছেলেপুলে আর অভাবি সংসার ছাড়া তাঁর ভাগে কিছুই জুটেনি। আর ‘মা’ বিরজাসুন্দরী দেবী! যাকে মোবাম্বের আলী ‘‘হীন স্বার্থ সিদ্ধি প্রয়াসি’’ (নজরুল ও তিন নারী। পৃষ্ঠা: ১৯) বলেছে, কবি সারা জীবন তাঁকেই ‘মা’ বলে ডেকেছেন। কবির চোখ অন্তরযামী, তাঁর চোখ ফাকি দিয়ে বিরজাসুন্দরী তার হীন স্বার্থ চরিতার্থ করবে, কবি তা বুঝবে না কোন দিন তা কি করে হয়? বিরজাসুন্দরী দেবী’র প্রতি কবি’র মনোভাব তাঁর ‘‘মা (বিরজাসুন্দরী দেবী)-র শ্রীচরণারবিন্দে’’ কবিতা খানি পাঠ করলে বুঝা যায়। কবিতাটি ‘সর্বহারা’ কাব্য গ্রন্থের অন্তরগত। এ কবিতায় কবি বলেন-
“সর্বসহা সর্বহারা জননী আমার।
তুমি কোন দিন কারো করনি বিচার,
কারেও দাওনি দোষ।”
কবিকে মাতৃ ¯স্নেহ দিয়ে দেবী মা যুগে যুগে মোবাশ্বের আলীদের কতইনা অপমান সহ্য করতে হয়েছেন, তার জন্য কবিকেও কোন দিন বলেনি কোন কথা। সে ইতিহাস কবি অল্পকথায় তুলে এনেছেন। মা’কে কবি সান্তনা দিয়েছেন-
‘‘সর্বসহা কন্যা মোর! সর্বহারা মাতা!
শূন্য নাহি রহে কভু মাতা ও বিধাতা।’’
কবি বিরজাসুন্দরী দেবী’র কাছ থেকে অর্থনৈতিক সহযোগিতাও মাঝে মধ্যে নিতেন, তার প্রমাণও পাওয়া যায় কবির লেখা চিঠি থেকে। কুমিল্লা থেকে মোহাম্মদ আফজাল-উল-হক-কে লেখা এমন একটি চিঠিতে কবি লিখেন, ‘‘মা’র কাছ থেকে টাকা নিতে লজ্জা করে।’’ (আবুল আহসান চৌধুরী- নজরুলের অগ্রন্থিত, দুষ্প্রাপ্য ও বিলুপ্ত চিঠির সন্ধানে। দৈনিক সমকাল-এর শুক্রবারের সাময়িকী ‘কালের খেয়া-৪৭; ২৬ মে ২০০৬) টাকা নিতে নিতে শেষে লজ্জার ব্যপার হয়েছিল। তারিখ বিহীন চিঠি সময়টা জানা যায় না, অনুমান করা যায় বিয়ের আগে লেখা। তবে, কবি’র ‘‘রবির ভ্রমর’’ কবিতাটি এ চিঠির সাথে পাঠানো হয় মোসলেম ভারত পত্রিকার জন্য। সেক্ষেত্রে ‘‘রবির ভ্রমর’’ এর তারিখ আর এ চিঠি লেখার তারিখ সমসাময়িক সময়ের হওয়া স্বাভাবিক।
মূল প্রসঙ্গে ফিরে আসার আগে এটুকু বলে রাখি, কবি যা বিশ্বাস করতেন মনে-প্রাণে তাই তাঁর কাব্য-কবিতা, গানে তুলে এনেছেন। কবি’র কাব্য-কবিতা-গানে যে বিশ্বাসের-আদর্শের বাণী তিনি প্রচার করেছেন তা তাঁর ব্যক্তি জীবনে প্রতিফলিত হয়েছে। তা না হলে পথে পথে ঘুরে ঘুরে আদর্শের গান গেয়ে বেড়াতেন না, জেল খাটতেন না। ঘরে বসে লিখলেই চলতো।
যে কথা বলছিলাম, নার্গিসকে কবি লালন করেছেন সারা জীবন। তার আর একটি প্রমাণ পাওয়া যায় চট্টগ্রামে লেখা ‘সিন্ধু-হিন্দোল’ কাব্যের ‘‘গোপন-প্রিয়া’’ কবিতায়-
‘‘তোমার বুকে স্থান কোথা গো এ দূর-বিরহীর,
কাজ কি জেনে? তল কেবা পায় অতল জলধির!
গোপন তুমি আস্লে নেমে
কাব্যে আমার, আমার প্রেমে,
এই-সে সুখে থাক্ব বেঁচে, কাজ কি দেখে তীর?
দূরের পাখী-গান গেয়ে যাই, না-ই বাঁধিলাম নীড়!’’
ভালবাসার নার্গিসের সাথে কবি’র যে নীড় বাঁধা হয়নি, তা এ কবিতার প্রতিটি পংক্তিতে পংক্তিতে কবি ব্যক্ত করেছেন।
কবি ও নার্গিস বিষয়ে আরো ভাল ভাবে বুঝা যায় কবি’র ‘সমপর্ণ’ ও ‘এ মোর অহঙ্কার’ কবিতা দু’টি পাশা-পাশি রেখে পড়লে। প্রথম কবিতা ‘সমপর্ণ’ দৌলতপুরে নার্গিসের কাছে আত্মনিবেদন করে লেখা। দ্বিতীয়টি নার্গিসকে না পাওয়ার ক্রন্দন সুর-
সমপর্ণ
প্রিয!
এবার আমায় সঁপে দিলাম তোমার চরণ-তলে।
তুমি শুধু মুখ তুলে চাও, বলুক যে যা বলে।।
তোমার আঁখি কাজল-কালো
অকারণে লাগল ভালো
লাগল ভালো,
পথিক আমার পথ ভুলাল
সেই নয়নের জলে।
আজকে বনের পথ হারালেম ঘরের পথের ছলে।
তুমি শুধু মুখ তুলে চাও, বলুক যে যা বলে।।
আজ দিগ্বালিকার আঁখি-পাতা অনেক দূরের কানন-ছায়ে
কাঁপছে অভিমানে,
একলা-আমার পথ দেখাত ঐ বালিকাই চপল পায়ে
দিক হতে দিক-পানে!
মুঠার মানিক ঠেলে পায়ে
এলেম তোমার কুটির ছায়ে
চরণ-ছায়ে,
ক্লান্তি আমার দাও মুছায়ে
দীপ-ঢাকা অঞ্চলে।
আপন মালা পরাও বালা পরাও আমার গলে!
এবার আমায় সঁপে দিলাম তোমার চরণ-তলে।।
এবার আমরা পড়বো ‘এ মোর অহঙ্কার’ কবিতাটি-
নাই বা পেলাম আমার গলায় তোমার গলার হার,
তোমায় আমি করব সৃজন, এ মোর অহঙ্কার!
এমনি চোখের দৃষ্টি দিয়া
তোমায় যারা দেখল প্রিয়া,
তাদের কাছে তুমি তুমিই। আমার স্বপনে
তুমি নিখিল রূপের-রাণী মানস-আসনে!-
সবাই যখন তোমায় ঘিরে করবে কলরব,
আমি দূরে ধেয়ান-লোকে রচব তোমার স্তব।
রচব সুরধুনী-তীরে
আমার সুরের ঊর্বশীরে,
নিখিল কণ্ঠে দুলবে তুমি গানের কণ্ঠ-হার-
কবির প্রিয়া অশ্রুমতী গভীর বেদনার!
যেদিন আমি থাকব না কো, থাকবে আমার গান,
বলবে সবাই, ‘কে সে কবির কাঁদিয়েছিল প্রাণ?’
আকাশ-ভরা হাজার তারা
রইবে চেয়ে তন্দ্রাহারা,
সখার সাথে জাগবে রাতে, চাইবে আকাশে,
আমার গানে পড়বে মনে আমায় আভাসে!
বুকের তলা করবে ব্যথা, বলবে কাঁদিয়া,
‘বন্ধু! সে কে তোমার গানের মানসী প্রিয়া?’
হাসবে সবাই, গাইবে গীতি,-
তুমি নয়ন-জলে তিতি’
নতুন করে আমার গানে আমার কবিতায়
গহীন নিরালাতে বসে খুঁজবে আপনায়!
রাখতে যেদিন নারবে ধরা তোমায় ধরিয়া,
ওরা সবাই ভুলবে তোমায় দুদিন স্মরিয়া,
আমার গানের অশ্রুজলে
আমার বাণীর পদ্মদলে
দুলবে তুমি চিরন্তনী চির-নবীনা!
রইবে শুধু বাণী, সেদিন রইবে না বীণা!
তৃষ্ণা-‘ফোরাদ’-ক‚লে কবে ‘সাকিনা’-সমা
এক লহমার হলে বধূ, হায় মনোরমা!
মুহুর্ত সে কালের রেখা
আমার গানে রইল লেখা
চিরকালের তরে প্রিয়! মোর সে শুভক্ষণ
মরণ-পারে দিল আমায় অনন্ত জীবন।
নাই বা পেলাম কণ্ঠে আমার তোমার কণ্ঠহার,
তোমায় আমি করব সৃজন এ মোর অহঙ্কার!
এই তো আমার চোখের জলে,
আমার গানে সুরের ছলে,
কাব্যে আমার, আমার ভাষায়, আমার বেদনায়,
নিত্যকালের প্রিয়া আমায় ডাকছ ইশারায়!...
চাই না তোমায় স্বর্গে নিতে, চাই এ ধূলাতে
তোমায় পায়ে স্বর্গ এনে ভুবন ভুলাতে!
ঊর্ধ্বে তোমার-তুমি দেবী,
কি হবে মোর সে-রূপ সেবি!
চাই না দেবীর দয়া, যাচি প্রিয়ার আঁখিজল
একটু দুখে অভিমানে নয়ন টলমল!
যেমন করে খেলতে তুমি কিশোর বয়সে-
মাটির মেয়ের দিতে বিয়ে মনের হরষে,
বালু দিয়ে গড়তে গেহ,
জাগত বুকে মাটির ¯স্নেহে,
ছিল না তো স্বর্গ তখন সূর্য তারা চাঁদ,
তেমনি করে খেলবে আবার পাতবে মায়া-ফাঁদ!
মাটির প্রদীপ জ্বালবে তুমি মাটির কুটিরে,
খুশির রঙে করবে সোনা ধূলি-মুঠিরে।
আধখানা চাঁদ আকাশ ’পরে
উঠবে যবে গরব-ভরে
তুমি বাকি আধখানা চাঁদ হাসবে ধরাতে,
তড়িৎ ছিঁড়ে পড়বে তোমার খোঁপায় জড়াতে!
তুমি আমার বকুল যূঁথি-মাটির তারা-ফুল
ঈদের প্রথম চাঁদ গো তোমার কানের পার্সি দুল!
কুস্মি-রাঙা শাড়িখানি
চৈতি-সাঁঝে পর্’বে রাণী,
আকাশ-গাঙে জাগবে জোয়ার রঙের রাঙা বান,
তোরণ-দ্বারে বাজবে করুণ বারোয়াঁ মূলতান।
আমার-রচা গানে তোমায় সেই বেলাশেষে
এম্নি সুরে চাইবে কেহ র্পদেশি এসে!
রঙীন সাঁঝে ঐ আঙিনায়
চাইবে যারা, তাদের চাওয়ায়
আমার চাওয়া রইবে গোপন!-এ মোর অভিমান,
যাচবে যারা তোমায়-রচি তাদের তরে গান!
নাই বা দিলে ধরা আমায় ধরার আঙিনায়,
তোমায় জিনে গেলাম সুরের স্বয়ম্বর-সভায়!
তোমার রূপে তোমার ভুবন
আলোয় আলোয় হ’ল মগন!
কাজ কি জেনে- কাহার আশায় গাঁথ্ছ ফুল-হার,
আমি তোমার গাঁথছি মালা এ মোর অহঙ্কার!
এ প্রসঙ্গে দোলন-চাঁপা কাব্যের ‘উপেক্ষিত’ কবিতাটি স্মরণ যোগ্য-
বিশ্বজয়ের গর্ব আমার জয় করেছে ঐ পরাজয়,
ছিন্ন-আশা নেতিয়ে পড়ে, ও মা এসে দাও বরাভয়!
চারদিকে মা প্রবঞ্চনা
ভালোবাসার গিল্টিসোনা,
আজ মণি কাল ধূলি-কণা,
জুয়ার হাট এই প্রেমের মেলা!
খুইয়েছি সব সাধের খেলায়, বুক ভেঙেছে হেলার ঢেলা!
এখন তুমি নাও মা কোলে, নয় অকূলে ভাসাই ভেলা।।
সমপর্ণ কবিতাটি দোলন-চাঁপা কাব্যের। এ কাব্যের অধিকাংশ কবিতা কবি নার্গিসকে স্মরণ করে লিখেছেন বলে মনে হয়। এ মোর অহঙ্কার কবিতাটি কৃষ্ণনগরে লেখা ২৬ চৈত্র, ১৩৩৪ বঙ্গাব্দে। কবিতাটি ‘জিঞ্জীর’ কাব্যগ্রন্থে স্থান পেয়েছে। আলী আকবর খানের বাড়ি থেকে ফিরে আসার ছয় বৎসর পর লেখা এ কবিতায় কবি নার্গিসকে স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন-
নাই বা দিলে ধরা আমায় ধরার আঙিনায়,
তোমায় জিনে গেলাম সুরের স্বয়ম্বর-সভায়!
তোমার রূপে তোমার ভুবন
আলোয় আলোয় হ’ল মগন!
কাজ কি জেনে- কাহার আশায় গাঁথ্ছ ফুল-হার,
আমি তোমার গাঁথছি মালা এ মোর অহঙ্কার!
এরপর আলোচনা করা যেতে পারে, চক্রবাক কাব্যের ‘সাজিয়াছি বর মৃত্যুর উৎসবে’ কবিতাটি। কবিতাটির প্রথম দিকের কয়েকটি পংক্তি পড়ার সময় মনে হয় নার্গিসের সাথে কবি’র বাসর হয়েছিল, তিনি তাকে ধরার আঙিনায় পেয়েছিলেন-
‘‘নিশি না পোহাতে জাগায়ে বলিলে,
‘হলো যে বিদায় বেলা।’’
এ পংক্তি পড়েই মনে হয় নজরুল-নার্গিসের বাসর রাত কেটেছিল। কিন্তু সম্পূর্ণ কাব্যে পাঠে বুঝা যায়, কবি’র সাথে নার্গিসের প্রথম দেখা থেকে বিয়ের পিঁড়িতে বসার পূর্ব পর্যন্ত সময়কে কবি ‘নিশিরাত’ বুঝিয়েছেন। কেন না, এ সময় পর্যন্ত কবি নার্গিসের প্রেমের ঘোরের মধ্যে ছিলেন। তাঁর বাস্তব জীবন-সংসার সম্বন্ধে কোন চিন্তাই তিনি করেন নি। এ সময়ে তিনি নার্গিসের প্রেমে সম্পূর্ণ অন্ধছিলেন। বিয়ের পিঁড়িতে বসেই কবি’র ‘নিশিরাত’ কেটেগেল, তিনি আলোকিত জীবন খুঁজে পেলেন।
দেখা দিলে রাঙা মৃত্যুর রূপে এতদিনে কি গো রানি?
মিলন-গোধূলি-লগনে শুনালে চির-বিদায়ের বাণী।
যে ধূলিতে ফুল ঝরায় পবন
রচিলে সেথায় বাসর-শয়ন,
বারেক কপোলে রাখিয়া কপোল, ললাটে কাঁকন হানি,
দিলে মোর ’পরে সকরুণ করে কৃষ্ণ কাফন টানি।
নিশি না পোহাতে জাগায়ে বলিলে, ‘হলো যে বিদায় বেলা।’
তব ইঙ্গিতে ও-পার হইতে এপারে আসিল ভেলা।
আপনি সাজালে বিদায়ের বেশে
আঁখি-জল মম মুছাইলে হেসে,
বলিলে, ‘অনেক হইয়া দেরি, আর জমিবে না খেলা!
সকলের বুকে পেয়েছ আদর, আমি দিনু অবহেলা।’
(চক্রবাক)
উদ্ধৃত অংশ কবিতাটির দ্বিতীয় প্যারা। প্রথম প্যারা পড়ার পর আমরা যখন দ্বিতীয় প্যারায় দেখি ‘নিশি না পোহাতে জাগায়ে বলিলে, ‘হলো অনেক বেলা।’ তখন আমাদের মনে হওয়া স্বাভাবিক কবি’র সাথে নার্গিসের বাসর হয়তো হয়েছিল। কিন্তু এ কবিতার শেষের দিকটায় যখন দেখি কবি বলছেন-
‘‘মুছি পথধূলি বুকে লবে তুলি মরণের পারে কবে,
সেই আশে, প্রিয়, সাজিয়াছি বর মৃত্যুও উৎসবে!
কে জানিত হায় মরণের মাঝে
এমন বিয়ের নহবত বাজে!
নব-জীবনের বাসর-দুয়ারে কবে ‘প্রিয়া’ ‘বধূ’ হবে-
সেই সুখে, প্রিয়া, সাজিয়াছি বর মৃত্যু উৎসবে!’’
কবি প্রিয়া যে বধূ হয়ে অধরে ধরা দেয় নি এ কাব্যাংশ তার স্বাক্ষ্য। কবি প্রিয়াকে না-পেয়েই বলতে পেরেছিলেন-
‘‘প্রেম সত্য, প্রেম-পাত্র বহু-অগণন,
তাই-চাই, বুকে পাই, তবু কেন কেঁদে ওঠে মন।
মদ সত্য, পাত্র সত্য নয়!
যে-পাত্রে ঢালিয়া খাও সেই নেশা হয়!
চির-সহচরী!
এতদিনে পরিচয় পেনু, মরি মরি!
আমারি প্রেমের মাঝে রয়েছ গোপন,
বৃথা আমি খুঁজে মরি’ জন্মে জন্মে করিনু রোদন।
প্রতি রূপে, অপরূপা, ডাক তুমি,
চিনেছি তোমায়,
যাহারে বাসিব ভালো সে-ই তুমি,
ধরা দেবে তায়!
প্রেম এক, প্রেমিকা সে বহু,
বহু পাত্রে ঢেলে পি’ব সেই প্রেম-
সে শরাব লোহু।
তোমারে করিব পান, অ-নামিকা, শত কামনায়,
ভৃঙ্গারে, গেলাসে কভু, কভু পেয়ালায়!’’
(সিন্দু-হিন্দোল; অ-নামিকা। চট্টগ্রাম-২৭.০৭.১৯২৬)
৪. ব্যক্তি স্বার্থ কত ভয়ংকর হলে নারীর মুখে এমন কথা প্রকাশ পায়। মোবাশ্বের আলী আমাদের জানাচ্ছেন উল্লেখিত গ্রন্থের ২৩ পৃষ্ঠায়- ‘‘এবং অনুরোধ করেন এই বলে : ‘প্রমীলাকে বিয়ে করেছেন এতে তাঁর কিছু এসে যায় না।’’ নার্গিস ও নার্গিসের মামা দু’জন মিলে বিয়ের পূর্বমহুর্তে কবির আত্মসম্মানে আঘাত করে তাঁকে বিদায় করে দিল, সেই কবিকে পাওয়ার জন্য সতের বছর অপেক্ষা করে চিঠি লিখলেন মাত্র চারটি। তারই একটি চিঠিতে এহেন বাক্য নার্গিস কেন লিখতে গেলেন তা আমাদের বোধগম্য নয়। অবশ্য বাক্যটিতে ‘তাঁর’ শব্দটি প্রমাণ করে এ লেখা নার্গিসের নয়। নার্গিসের হলে ‘তাঁর’ এর পরিবর্তে ‘আমার’ শব্দ ব্যবহার ছিল সঠিক। যেমন- ‘প্রমীলাকে বিয়ে করেছেন এতে আমার কিছু এসে যায় না।’ আর বাক্যটি যদি মোবাশ্বের আলী’র হয়ে থাকে সেক্ষেত্রে বাক্যটি হওয়া উচিত ছিল- ‘কবি/নজরুল প্রমীলাকে বিয়ে করেছিলেন তা’তেও নার্গিসের আপত্তি ছিল না।’ আমি যেহেতু গবেষক নই, সেহেতু আমার কল্পনার ঘোড়াকে ছেড়ে দিলাম। দেখা যাক ঘোড়া কোথায় যায়- আলী আকবর খান সাহেব তখন (১৯২৫) ঢাকার বাংলাবাজারে পুস্তক ব্যবসা করছেন। ব্যবসায়িক সফলতা ব্যর্থতার খবর আমরা জানি না। এটুকু বুঝি কলকাতায় ব্যবসা জমাতে না পেরে তিনি ঢাকায় এসে ছিলেন। ঢাকার ব্যবসার অবস্থা যাই হোক না কেন, কবি নজরুল যদি তার নিয়ন্ত্রণে থাকে তবে তার আখের গোছাতে সুবিধা হবে। কেন না, নজরুল তখন উভয় বাংলায় জনপ্রিয়তায় শীর্ষে। এমনাবস্থায় কবি নজরুলকে নিয়ন্ত্রণে রাখার গোপন মনবাসনা আলী আকবর খানের থাকতেই পারে এবং সে হীনইচ্ছাকে চরিতার্থ করার জন্য তার স্বার্থের জাল নজরুলের চারদিকে ছড়িয়ে দেয়। আর কবি যদি হয় তার ঘর জামাই তাহলে তো কথাই নাই। এরকম ইচ্ছা নিয়েই খান সাব তার ভাগ্নীকে তার গ্রামের বাড়ি থেকে ঢাকার বাড়িতে নিয়ে আসেন। এবং নার্গিসকে দিয়ে এমন চিঠি লিখিয়ে নেন। প্রমীলাকে বিয়ে করেছেন তাতে তার কিছু যায় আসে না- এমন মন্তব্যসহ চিঠি নার্গিস আসলেই কবিকে দিয়েছিল কি-না তা নিয়ে আমার যথেষ্ঠ সংশয় করার কারণ রয়েছে যে, সে চিঠির কোন নমুনা কপি গবেষক মহোদয় আমাদের সামনে উপস্থাপন করেন নি। সে যা হোক, কবিকে যখন চিঠি দিয়ে বাগে আনতে আলী আকবর খান ব্যর্থ, তখন ঢাকায় কবির উপর হামলা হয়। প্রসঙ্গটা এখানে জানিয়ে রাখলাম, যথাযথ সময়ে তার বিস্তারিত আলোচনা করা হবে। ফিরে যাই- কবি, নার্গিস ও প্রমীলায়। এ প্রসঙ্গে বিবাহিত কবি ও প্রমীলা’র সাংসারিক জীবনের দিকেও আমাদের নজর দেয়া প্রয়োজন। কবি’র সংসারের চিত্র যদি এক বার কল্পনা করা যায়, তাহলে বুঝা যায় কী ভাবে কবি পত্মী প্রমীলা দিনপাত করেছেন। একদিকে উদাসিন কবি সংসারের দিকে নজর নাই, অপর দিকে অর্থকষ্ট শিশু পুত্রের দুধ কেনার পয়সা নাই। কবি তো নিজেই বলেছেন- ‘লক্ষ্মী ও স্বরসতী তাঁর জীবনে এক সাথে ধরা দেয় নি।’ সে অবস্থায়, মামার ধনের দুলালী নার্গিস সে কষ্ট সহ্য করার ক্ষমতা রাখতেন কিনা তাও বিচারের বিষয়। প্রমীলার সংসারের অর্থকষ্ট সম্বন্ধে ড. মোহাম্মদ কামাল উদ্দিনের একটি উদ্ধৃতিই যথেষ্ঠ- ‘‘নজরুল-প্রমীলার সংসারে ত্যাগ ছিল বেশি, তবে এতে একটি মুহুর্তের জন্য ভালবাসার ঘাটতি হয়নি। অনেক নজরুল গবেষককেও বলতে শুনেছি যে, নজরুল-প্রমীলার মধ্যে ভাল সম্পর্ক ছিল না। এই কথাটা মোটেই যুক্তিতে টিকে না। যে নজরুল একসময় তার ভগবানের বুকে পদচিহৃ এঁকে দেয়ার সাহস করতেন, সেই নজরুল স্ত্রী প্রমীলার অসুস্থতার কারণে ভূত-প্রেত বিশ্বাস করতে লাগলেন। ড. মোহাম্মদ কামাল উদ্দিন আকবর উদ্দিনের উদ্ধৃতি দিয়ে আরো বলেন- শ্রী আশালতা প্রমীলা ছিলেন একনিষ্ঠ, স্থির ও শান্ত স্বভাবের মহিলা। তাই তিনি বেদনাকে বয়ে বেড়িয়েছেন, তবে কখনও প্রকাশ করেননি। প্রমীলাকে অনিশ্চিত জীবনযাপন করতে হয়েছে। একটা লোক দিনের পর দিন এভাবে বাহিরে থাকার পরও সংসারে কোনদিন অশান্তি হয়নি বরং প্রমীলার কারণে শান্তি ও স্থির ছিল। প্রমীলার মা তাঁকে এ ব্যপারে সহযোগিতা করেছেন শতভাগ।’’ এ উদ্ধৃতিতে কবি’র পারিবারিক জীবনের অর্থনৈতিক দুরাবস্থাসহ আর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আমরা দেখি, তা হলো কবি’র দিনের পর দিন বাইরে থাকার বিষয়। কেন কবি দিনের পর দিন বাইরে থেকেছেন? উত্তর একটিই- যা তিনি বিশ্বাস করতেন, হৃদয়ে ধারণ করতেন, তাই তিনি কাব্যে কবিতায় গানে গল্পে প্রকাশ করেছেন এবং নিজে তাঁর সে বিশ্বাসের বাণী জনসাধারণের মাঝে প্রচার করতেন। সে প্রচার কাজের জন্যই কবিকে বাইরে বাইরে থাকতে হয়েছে দিনের পর দিন। আমরা যতদূর জানি, কবি কুমিল্লাতে যখন গ্রেফতার হন তখনও তিনি তাঁর স্বপ্নের, তাঁর বিশ্বাসের বাণী প্রচার করছিলেন। কবি’র সুস্থ জীবনে ভারতের প্রতিটি আন্দোলনে স্বশরীরে উপস্থিতি তাঁর ব্যক্তি জীবন ও কাব্য জীবন যে, একই সূত্রে গাঁথা তাই প্রমাণ করে।
৫. মোবাশ্বের আলী’র মন্তব্য : ‘‘শেষ অবধি আইন সম্মত ভাবে বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটে।’’ বাক্যটি কবিগুরু’র ‘হিং টিং ছট’ কবিতার কথা মনে করিয়ে দেয়- ‘বহু পুরাতন ভাব, নব আবিস্কার।’ কথিত নজরুল দরদি, নজরুল গবেষকেরা মূলত: তারা নার্গিস দরদির ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন সা¤প্রদায়িক চিন্তাকে ধারণ করে*। (*সাম্প্রদায়িক চিন্তার ধারক-বাহক বলার যুক্তি হল- বিরজাসুন্দরী দেবীর প্রতি যে মন্তব্য মোবাশ্বের আলী করেছেন তা সা¤প্রদায়িক চিন্তা থেকেই করেছেন। তা না হলে বিরজাসুন্দরী দেবীকে কবি কী ভাবে দেখতেন সে বিচার করেই লেখক এমন মন্তব্য করতেন। এ ব্যপারে পূর্বে আলোচনা করা হয়েছে।) তারা অতিযত্নে কবির বিয়ের দাওয়াত পত্র, ‘নরু’ নামক জনৈক নজরুলের চিঠি সযত্নে রক্ষা করে চলেছেন এবং তা জনসমাজে প্রচার করছেন। কিন্তু তারা কবি ও নার্গিসের বিয়ের কাবিননামা এবং আইন সম্মত বিয়ে বিচ্ছেদের নমুনা কপি সংগ্রহ করেন না, করলেও তা জনসম্মুখে প্রচার করেন না। বিবাহ বিচ্ছেদ যদি আইন সম্মত হয় তা হলে, তার তারিখ, স্থান (কোট) কোথায়! যেহেতু আইন সম্মত বিবাহ বিচ্ছেদ সেহেতু সরকারের কোটে অবশ্যই তার নমুনা কপি আছে, আমরা তা দেখতে চাই। কোন্ নার্গিস দরদি আছেন যে, তা সংগ্রহ করে আমাদের ধন্য করেন।
৬. নার্গিসের এই বিপর্যয়ের কথা শুনেও নজরুল এক মহামানবসুলভ উপদেশের ঢিল ছুঁড়ে সুদীর্ঘ পত্র লিখলেন: বাক্যটিতে জনাব মোবাশ্বের আলী যে, কবি নজরুল কে কটাক্ষ করেছেন তা পাঠ মাত্রই বুঝা যায়। আমরা কবি নজরুলকে মহামানব রূপেই জানি এবং মানি। তাঁর মহান কাব্য, তাঁর মহান চিন্তা, তাঁর মহান জীবন উপলব্ধিই তাঁকে মহান করেছে। জনাব মোবাশ্বের আলী ‘মহামানবসুলভ উপদেশের ঢিল ছুঁড়ে’ বাক্যটি ব্যবহার না করলেও পারতেন।
কবি মানেই যেখানে ভিরু ও কোমলের প্রতীক, আমাদের জাতীয় কবি সেখানে যোদ্ধা, সে যুদ্ধে বন্দুক কাঁধে নিয়ে ঘুরে বেড়িয়েছেন, গুলির শব্দে, বারুদের গন্ধে তিনি কবিতা লিখেছেন। ভারত মাতার স্বাধীনতার স্বপ্ন এঁকেছেন, সেই মহামানব, মহান কবিকে ‘মহামানবসুলভ’ কটাক্ষ বাক্যের ঢিল ছুঁড়ে লেখক আমাদের নিন্দার পাত্র হয়েছেন, আমরা জনাব মোবাশ্বের আলীর এ কর্মের জন্য তাকে নিন্দা জানাই। অনেক দিন আগের একটি পত্রিকার এক সংবাদের কথা মনে পড়লো হঠাৎ- ঘটনা বাংলাদেশে। এক কবি আর এক কবি’র সম্বন্ধে এক মন্তব্য করেছেন। যাঁর সম্বন্ধে মন্তব্য করেছে সে কবি পরের দিন সাংবাদিক সম্মেলন করে মন্তব্যের সমালোচনা করেন এবং বলেন ঐ কবি’র মন্তব্যে তাঁর সম্মান কমেছে। ছুটলো সাংবাদিক মন্তব্য করা কবি’র কাছে। তিনি তখন সাংবাদিকদের বলেন ‘ওর এত সম্মান কম জানলে আমি এ মন্তব্য করতাম না। আমি তো ভাবতাম ওর সম্মান অনেক বেশি।’ আমার মনে হয় এ লেখার পাঠক এ গল্পের গাঢ় অর্থ উপলব্ধি করতে পেরেছেন।
আমাদের কবি নজরুল যে শুধু মহামানব নন, তার চেয়েও বেশি কিছু, সে কথা তিনি নিজেই ঘোষণা করে গেছেন। প্রিন্সিপাল ইব্রাহীম খাঁ’র কাছে লেখা একটি চিঠিতে, পাঠ করলেই পাঠক বুঝবেন-
‘‘শ্রদ্ধেয় প্রিন্সিপাল ইব্রাহীম খান সাহেব!
আমাদের আশি বছরে নাকি স্রষ্টা ব্রহ্মার একদিন। আমি অত বড় স্রষ্টা না হলেও স্রষ্টা তো বটে, তা আমার সে সৃষ্টির পরিসর যত ক্ষুদ্রই হোক। কাজেই আমারও একটা দিন অন্তত তিনটে বছরের কম যে নয়, তা অন্য কেউ বিশ্বাস করুক চাই না করুক, আপনি নিশ্চয়ই করবেন।’’ (নজরুল-রচনাবলী নবম খণ্ড। পৃষ্ঠা : ১৭৯। বাংলা একাডেমী, ঢাকা। পত্র নং পনেরো।) কবি, কবি হওয়ার আগেই তাঁর সৃষ্টির প্রতি আত্মবিশ্বাসী ছিলেন। সে দৃঢ়তাও তাঁর লেখাতেই আমরা দেখি। পত্র নং দুই, পৃষ্ঠা নং ১৭০; নজরুল-রচনাবলী-ঐ। এ পত্র কবি লেখেন ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা’র সম্পাদক মৌলবি মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্* এম. এ. বি. এল (*ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্) বরাবর। কবি পত্রে বলেন-‘‘আপনার এরূপ উৎসাহ বরাবর থাকলে আমি যে একটি মস্ত জবর কবি ও লেখক হব, তা হাতে-কলমে প্রমাণ করে দিব, এ একেবারে নির্ঘাৎ সত্যি কথা।’’
এক সময়ের প্রেমিক, বয়সে ছোট নার্গিসের কাছে লেখা পত্রে কিছুটা উপদেশ থাকতেই পারে তা বিশেষ অন্যায়ের কিছু না, এ জ্ঞান কবি’র ছিল। তা চিঠিটি পাঠ করলেই পাঠক বুঝতে পারবে।
৭. এবার আসা যাক নার্গিসকে লেখা দীর্ঘ চিঠির বিশ্লেষণে। এ চিঠির আলোকে আমরা দেখতে চেষ্টা করবো কবির সাথে নার্গিসের বিয়ে হয়েছিল কী না। এবার চিঠিটির উদ্ধৃতি আবশ্যক। পাঠক ক্ষমা করবেন, বিশ্লেষণের প্রয়োজনে পাতা বাড়াতেই হলো-
পত্রাবলি- সাতষট্টি। সম্পাদকের ভাষ্য- ১৩২৮-এর ৩রা আষাঢ় নজরুর ইসলামের সঙ্গে নার্গিস আসার খানম ওরফে সৈয়দা খাতুনের আকদ হয়। এই বিবাহ স্থায়ী হয় নি। উভয়ের মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটে। নজরুল পরে ১৯২৪-এর ২৪শে এপ্রিল প্রমীলাকে বিয়ে করেন। নজরুল নার্গিসের বিবাহ বিচ্ছেদের পনরো বছর পর নার্গিস নজরূলকে একটি চিঠি দেন তার উত্তরে নজরুল নার্গিসকে এই চিঠি লেখেন।)
106 Upper Chitpur Road,
Gramophone Rehearsal Room
Calcatta
1.7.37
১.৭.৩৭
কল্যাণীয়াষু!
তোমার পত্র পেয়েছি সেদিন নববর্ষার নবঘনসিক্ত প্রভাতে। মেঘ-মেদুর গগনে সেদিন অশান্ত ধারায় বারি ঝরছিল। পনের বছর আগে এমনি আষাঢ়ে এমনি বারিধারার প্লাবন নেমেছিল- তা তুমিও হয়তো স্মরণ করতে পারো। আষাঢ়ের নব মেঘপুঞ্জকে আমার নমস্কার। এই মেঘদূত বিরহী যক্ষের বাণী বহন করে’ নিয়ে গিয়েছিল কালিদাসের যুগে, রেবা নদীর তীরে মালবিকার দেশে, তার প্রিয়ার কাছে। এই মেঘপুঞ্জের আশীর্বাণী আমার জীবনে এনে দেয় চরম বেদনার সঞ্চয়। এই আষাঢ় আমায় কল্পনার স্বর্গলোক থেকে টেনে ভাসিয়ে দিয়েছে বেদনার অনন্ত স্রোতে। যাক, তোমার অনুযোগের অভিযোগের উত্তর দিই। তুমি বিশ্বাস করো, আমি যা লিখছি তা সত্য। লোকের মুখের শোনা কথা দিয়ে যদি আমার মূর্তির কল্পনা করে থাকো, তাহলে আমায় ভুল বুঝবে-আর তা মিথ্যা।
তোমার উপর আমি কোন ‘জিঘাংসা’ পোষণ করি না- এ আমি সকল অন্তর দিয়ে বলছি। আমার অন্তর্যামী জানেন, তোমার জন্য আমার হৃদয়ে কি গভীর ক্ষত, কি অসীম বেদনা। কিন্তু সে বেদনার আগুনে আমিই পুড়েছি- তা দিয়ে তোমায় কোনদিন দগ্ধ করতে চাই নি। তুমি এই আগুনের পরশমাণিক না দিলে আমি ‘অগ্নিবীণা’ বাজাতে পারতাম না- আমি ‘ধূমকেতু’র বিস্ময় নিয়ে উদিত হতে পারতাম না। তোমার যে কল্যাণরূপ আমি আমার কিশোর বয়সে প্রথমে দেখেছিলাম, যে রূপকে আমার জীবনের সর্বপ্রথম ভালবাসার অঞ্জলি দিয়েছিলাম, সে রূপ আজও স্বর্গের পারিজাত মন্দারের মত চির অম্লান হয়েই আছে আমার বক্ষে। অন্তরের আগুন- বাইরের সে ফুলহারকে স্পর্শ করতে পারেনি।
তুমি ভুলে যেও না, আমি কবি- আমি আঘাত করলেও ফুল দিয়ে আঘাত করি। অসুন্দর, কুৎসিতের সাধনা আমার নয়। আমার আঘাত বর্বরের কাপুরুষের আঘাতের মত নিষ্ঠুর নয়। আমার অন্তর্যামী জানেন (তুমি কি জান বা শুনেছ, জানি না) তোমার বিরুদ্ধে আজ আমার কোন অনুযোগ নেই, অভিযোগ নেই, দাবীও নেই।
আমি কখনো কোন ‘দূত’ প্রেরণ করি নি তোমার কাছে। আমাদের মাঝে যে অসীম ব্যবধানের সৃষ্টি হয়েছে তার ‘সেতু’ কোন লোক ত নয়ই- স্বয়ং বিধাতাও হতে পারেন কিনা সন্দেহ। আমায় বিশ্বাস করো, ‘আমি সেই ক্ষুদ্র’দের কথা বিশ্বাস করি নি। করলে পত্রোত্তর দিতাম না। তোমার উপর আমার কোন অশ্রদ্ধাও নেই, কোন অধিকারও নেই- আবার বলছি। আমি যদিও গ্রামোফোনের ট্রেড মার্ক ‘কুকুরের’ সেবা করছি, তবুও কোন কুকুর লেলিয়ে দিই নাই। তোমাদেরই ঢাকার কুকুর একবার আমায় কামড়েছিল আমার অসাবধানতায়, কিন্তু শক্তি থাকতেও আমি তার প্রতিশোধ গ্রহণ করি নি- তাদের প্রতি আঘাত করি নি।
সেই কুকুরদের ভয়ে ঢাকায় যেতে আমার সাহসের অভাব উল্লেখ করেছ, এতে হাসি পেল। তুমি জান ছেলেরা (যুবকেরা) আমায় কত ভালবাসে। আমারই অনুরোধে আমার ভক্তরা তাদের ক্ষমা করেছিল। নৈলে, তাদের চিহ্নও থাকত না এ পৃথিবীতে। তুমি আমায় জানবার যথেষ্ঠ সুযোগ পাও নি, তাই এ কথা লিখেছ।.... থাক, তুমি রূপবতী, বিত্তশালিনী, গুণবতী, কাজেই তোমার উমেদার অনেক জুটবে- তুমি যদি স্বেচ্ছায় স্বয়ম্বরা হও, আমার তাতে কোন আপত্তি নেই। আমি কোন্ অধিকারে তোমায় বারণ করব- বা আদেশ দিব? নিষ্ঠুর নিয়তি সমস্ত অধিকার থেকে আমায় মুক্তি দিয়েছেন।
তোমার আজিকার রূপ কি, জানি না। আমি জানি তোমার সেই কিশোর মূর্তিকে, যাকে দেবী মূর্তিও মত আমার হৃদয়বেদীতে অনন্ত প্রেম, অনন্ত শ্রদ্ধার সাথে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলাম। সেদিনের তুমি সে বেদী গ্রহণ করলে না। পাষাণ-দেবীর মতোই তুমি বেছে নিলে বেদনার বেদী পীঠ। জীবন ভ’রে সেখানেই চলেছে আমার পূজা-আরতি। আজকাল তুমি আমার কাছে মিথ্যা, ব্যর্থ, তাই তাকে অস্বীকার করেই চলেছি।
দেখা? না-ই হল এ ধূলার ধরায়। প্রেমের ফুল এ ধূলিতলে হয়ে যায় ¤øান, দগ্ধ, হতশ্রী। তুমি যদি সত্যি আমায় ভালবাস, আমাকে চাও, ওখানে থেকেই আমাকে পাবে। লায়লী মজনুকে পায় নি, শিঁরী ফরহাদকে পায় নি, তবু তাদের মত করে কেউ কারো প্রিয়তমকে পায় নি। আত্মহত্যা মহাপাপ, এ অতি পুরাতন কথা হলেও পরম সত্য। আত্মা অবিনশ্বর। আত্মাকে কেউ হত্যা করতে পারে না। প্রেমের সোনার কাঠির স্পর্শ যদি পেয়ে থাক, তাহলে তোমার মত ভাগ্যবতী কে আছে ?
তারি মায়াস্পর্শে তোমার সকল কিছু আলোয় আলোময় হয়ে উঠবে। দুঃখ নিয়ে এক ঘর থেকে অন্য ঘরে গেলেই সেই দুঃখের অবসান হয় না। মানুষ ইচ্ছা করলে সাধনা দিয়ে, তপস্যা দিয়ে ভুলকে ফুলরূপে ফুটিয়ে তুলতে পারে। যদি কোন ভুল করে থাক জীবনে, এই জীবনেই তার সংশোধন করে যেতে হবে; তবেই পাবে আনন্দ, মুক্তি; তবেই হবে সর্বদুঃখের অবসান। নিজেকে উন্নত করার চেষ্টা কর, স্বয়ং বিধাতা তোমার সহায় হবের। আমি সংসার করছি, তবু চলে গেছি এই সংসারের বাধাকে অতিক্রম করে ঊর্ধ্বলোকে- সেখানে চলে গেলে পৃথিবীর সকল অপূর্ণতা, সকল অপরাধ ক্ষমাসুন্দর চোখে পরম মনোহর মূর্তিতে দেখা দেয়।
হঠাৎ মনে পরে গেল পনের বছর আগেকার কথা। তোমার জ্বর হয়েছিল, বহু সাধনার পর আমার তৃষিত দুটি কর তোমার শুভ্রসুন্দর ললাট স্পর্শ করতে পেরেছিল; তোমার সেই তপ্ত ললাটের স্পর্শ যেন আজও অনুভব করতে পারি। তুমি কি চেয়ে দেখেছিলে? আমার চোখে ছিল জল, হাতে সেবা করার আকুল স্পৃহা, অন্তরে শ্রী বিধাতার চরণে তোমার আরোগ্য লাভের জন্য করুণ মিনতি! এনে হয় যেন কাল্কার কথা। মহাকাল যে স্মৃতি মুছে ফেলতে পারলেন না। কী উদগ্র অতৃপ্তি, কী দুর্দমনীয় প্রেমের জোয়ারই সেদিন এসেছিল। সারা দিনরাত আমার চোখে ঘুম ছিল না।
যাক- আজ চলেছি জীবনের অস্তমান দিনের শেষ রশ্মি ভাটার স্রোতে, তোমার ক্ষমতা নেই সেই পথ থেকে ফেরানোর। তবে তার আর চেষ্টা করো না। তোমাকে লেখা এই আমার প্রথম ও শেষ চিঠি হোক। যেখানেই থাকি, বিশ্বাস করো, আমার অক্ষয় আশীর্বাণী কবচ তোমায় ঘিরে থাকবে। তুমি সুখী হও, শান্তি পাও- এই প্রার্থনা। আমায় যত মন্দ বলে বিশ্বাস কর, আমি তত মন্দ নই- এই আমার শেষ কৈফিয়ৎ।
ইতি-
নিত্য শুভার্থী
নজরুল ইসলাম
চ.ঝ
আমার ‘চক্রবাক’ নামক কবিতা-পুস্তকের কবিতাগুলো পড়েছ? তোমার বহু অভিযোগের উত্তর পাবে তাতে। তোমার কোন পুস্তকে আমার সম্বন্ধে কটুক্তি ছিল।
ইতি-
Gentleman
এ হলো কবি’র লেখা নার্গিসের কাছে লেখা এক মাত্র চিঠি। ঠিক এক মাত্র নয়, এর আগে একটি গান পাঠিয়েছিলেন নার্গিসের চিঠির উত্তরে এবং পরে বিয়ে উপলক্ষে একটি চিড়কোঠ পাঠান। কবি তাঁর এ চিঠি শুরু করেছেন, আষাঢ়ের কাব্য দিয়ে। যেখানে কবি নিজেকে কল্পনা করেছেন মেঘদুত কাব্যের বিরহী যক্ষের সাথে। তিনি লিখেছেন- ‘‘এই আষাঢ় আমায় কল্পনার স্বর্গলোক থেকে টেনে ভাসিয়ে দিয়েছে বেদনার অনন্ত স্রোতে।’’ কেন এ বেদনার অনন্ত স্রোত? আমরা বলতে পারি- না পাওয়ার। নার্গিসকে যে কবি পায় নি, তাঁদের বাসর হয় নি, তারও স্পষ্ট উল্লেখ আছে এ চিঠিতেই- ‘‘হঠাৎ মনে পড়ে গেল পনের বছর আগেকার কথা। তোমার জ্বর হয়েছিল, বহু সাধনার পর আমার তৃষিত দুটি কর তোমার শুভ্রসুন্দও ললাট স্পর্শ করতে পেরেছিল; তোমার সেই তপ্ত ললাটের স্পর্শ যেন আজও অনুভব করতে পারি। তুমি কি চেয়ে দেখেছিলে? আমার চোখে ছিল, হাতে সেবা করার আকুল স্পৃহা, অন্তরে শ্রী বিধাতার চরণে তোমার আরোগ্য লাভের জন্য করুণ মিনতি! মনে হয় যেন কাল্কার কথা। মহাকাল যে স্মৃতি মুছে ফেলতে পারলেন না। কী উদগ্র অতৃপ্তি, কী দুর্দমনীয় প্রেমের জোয়ারই সে দিন এসেছিল। সারা দিনরাত আমার চোখে ঘুম ছিল না।’’- এ বাক্য থেকে স্পষ্ট বুঝা যায়, কবি নার্গিসকে ঐ একবার মাত্র স্পর্শ করেছিলেন। তাঁদের বাসর হলে কবি তাঁর সে রাতের প্রেয়সীকে স্পর্শ করার স্মৃতির কথাই উল্লেখ করতেন। কবির দেয়ার স্পৃহা আর নার্গিসের না নেয়ার কথাই এখানে বাণী রূপ পেত। ‘‘তোমার উপর আমার কোন অশ্রদ্ধাও নেই, কোন অধিকারও নেই- আবার বলছি। আমি যদিও গ্রামোফোনের ট্রেড মার্ক ‘কুকুরের’ সেবা করছি, তবুও কোন কুকুর লেলিয়ে দিই নাই। তোমাদেরই ঢাকার কুকুর একবার আমায় কামড়েছিল আমার অসাবধানতায়, কিন্তু শক্তি থাকতেও আমি তার প্রতিশোধ গ্রহণ করি নি- তাদের প্রতি আঘাত করি নি। সেই কুকুরদের ভয়ে ঢাকায় যেতে আমার সাহসের অভাব উল্লেখ করেছ, এতে হাসি পেল। তুমি জান ছেলেরা (যুবকেরা) আমায় কত ভালবাসে। আমারই অনুরোধে আমার ভক্তরা তাদের ক্ষমা করেছিল। নৈলে, তাদের চিহ্নও থাকত না এ পৃথিবীতে। তুমি আমায় জানবার যথেষ্ঠ সুযোগ পাও নি, তাই এ কথা লিখেছ।.... থাক, তুমি রূপবতী, বিত্তশালিনী, গুণবতী, কাজেই তোমার উমেদার অনেক জুটবে- তুমি যদি স্বেচ্ছায় স্বয়ম্বরা হও, আমার তাতে কোন আপত্তি নেই। আমি কোন্ অধিকারে তোমায় বারণ করব- বা আদেশ দিব? নিষ্ঠুর নিয়তি সমস্ত অধিকার থেকে আমায় মুক্তি দিয়েছেন।’’ কবির লেখা এ উদ্ধৃতি থেকে মনে প্রশ্ন জাগে নার্গিসগংরাই কী কবির পিছনে কুকুর লেলিয়ে দিয়েছিল(?)। কবি তা জেনে বা বুঝে অপরাধিদের প্রতি কোন প্রতিশোধ গ্রহণ না করে বরং তাদের ক্ষমা করেছিলেন।
এ চিঠিতে কবি নার্গিসকে জানিয়েছেন, তাকে বারণ বা আদেশ দিবার কোন অধিকার তাঁর নেই। এ থেকেও বুঝা যায় নার্গিস কবি’র বিবাহীতা পত্মী ছিলেন না। ‘‘নিষ্ঠুর নিয়তি সমস্ত অধিকার থেকে আমায় মুক্তি দিয়েছেন।’’ জনাব মোবাশ্বের আলী যে, আমাদের জানালেন নার্গিস-নজরুলের বিবাহ বিচ্ছেদ আইন সম্মতভাবে হয়েছিল, এ তথ্যটি ভুল। কেন না- নার্গিস কবি’কে চিঠি লিখেন বিয়ের অনুমতি চেয়ে। কবি জানান, তাঁর ব্যাপারে তাঁর কোন মাথা ব্যথা নাই। ‘‘তোমার আজিকার রূপ কি, জানি না। আমি জানি তোমার সেই কিশোর মূর্তিকে, যাকে দেবী মূর্তিও মত আমার হৃদয়বেদীতে অনন্ত প্রেম, অনন্ত শ্রদ্ধার সাথে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলাম। সেদিনের তুমি সে বেদী গ্রহণ করলে না। পাষাণ-দেবীর মতোই তুমি বেছে নিলে বেদনার বেদী পীঠ। জীবন ভ’রে সেখানেই চলেছে আমার পূজা-আরতি। আজকাল তুমি আমার কাছে মিথ্যা, ব্যর্থ, তাই তাকে অস্বীকার করেই চলেছি। এখানে আমরা যা বুঝলাম তা হলো-
এক. বিবাহ বিচ্ছেদের(!) আগে নার্গিস এ চিঠি কবি’ক পাঠান।
দুই. কবি জানালেন, নার্গিসের প্রতি তাঁর কোন অধিকার নাই।
তিন. বিয়ে হলে বিয়ে ভাঙ্গার প্রশ্ন উঠতো।
চার. নার্গিস কবিকে এ চিঠি দিয়ে ছিলেন ভালবাসার অধিকার থেকে। আসলে সে জানতে চেয়েছিল, কবি তাঁকে তখনও ভালবাসে কিনা বা বিয়ে করবে কিনা।
পাঁচ. অর্থাৎ বিয়ে বিচ্ছেদের প্রয়োজন হলে, এ চিঠির পরে হতো। কিন্তু এ চিঠির মাধ্যমে জানাগেল- নার্গিসের প্রতি কোন অধিকার কবি’র নাই। বিধাতা তা থেকে কবি’কে অনেক আগেই মুক্তি দিয়েছেন। সেই বিয়ের রাতেই, বিয়ে না হয়ে। অর্থাৎ বিয়ে ঠিক হওয়া মানেই বিয়ে হওয়া নয়।
জনাব মোবাশ্বের আলী বলেছেন যে, ‘‘যে প্রেমিক তাঁর মধ্যে ভালবাসা জাগিয়ে তুলেছিল সেই প্রবঞ্চকের ভূমিকা নিল। অতএব তিনি লিখলেন ‘তাহমিনা’ উপন্যাস। বীর রুস্তমের পত্মী তাহমিনা এবং তাদের একমাত্র সন্তান সোহরাব। রুস্তম তাহমিনাকে ফেলে যুদ্ধে চলে যায়, তেমনি নজরুলও নার্গিকে ত্যাগ করে যান। অতএব তাহমিনা ও নার্গিস উভয়ে বঞ্চিতা। উপন্যাসে স্বামীর জন্য তাহমিনার যে ব্যাকুলতা এর মাধ্যমে নার্গিসের হৃদয়ের আর্তি ও আকুলতা ফুটে উঠেছে। এর সাথে পুরুষের শঠতার শিকার দুই নারীকে হতে হয়েছে। উপন্যাসের ভূমিকায় নার্গিস লিখেছেন ঃ ‘পাঠক! তোমরা যে কেহ তাহমিনার দুঃখ জাগানিয়া কাহিনী পড়বে, তার দুঃখে দু’ফোঁটা অশ্রু ফেলো যেন- তাতেও যদি জনম দুঃখিনী তাহমিনার সান্তনা হয়। আর তার মতো দুঃখিনী কখনো যদি কাহারো নজরে পড়ে, তাকে মানুষের চোখ দিয়ে দেখো যেন’।’’ (পৃষ্টা : ২৭) এ ভূমিকা পাঠে আমাদের মনে পড়ে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় রচিত ‘দেবদাস’ উপন্যাসের শেষ ক’টি লাইন-‘‘এখন এতদিনে পার্বতীর কি হইয়াছে, কেমন আছে জানি না। সংবাদ লইতেও ইচ্ছা করে না। শুধু দেবদাসের জন্য বড় কষ্ট হয়। তোমরা যে-কেহ এ কাহিনী পড়িবে, হয়তো আমাদেরই মতো দুঃখ পাইবে। তবু যদি কখনো দেবদাসের মতো এমন হতভাগ্য, অসংযমী পাপিষ্ঠের সহিত পরিচয় ঘটে, তাহার জন্য একটু প্রার্থনা করিও। প্রার্থনা করিও, আর যাহাই হোক, যেন তাহার মতো এমন করিয়া কাহারও মৃত্যু না ঘটে। মরণে ক্ষতি নাই, কিন্তু সে সময়ে যেন একটি স্নেহ-করস্পর্শ তাহার ললাটে পৌঁছে- যেন একটিও করুণার্দ্র স্নেহময় মুখ দেখিয়া দেখিয়া এ জীবনের অন্ত হয়। মরিবার সময় যেন কাহারও এক ফোঁটা চোখের জল দেখিয়া সে মরিতে পারে। প্রেমের সার্থকতা মিলনে না বিরহে এ নিয়ে শত বির্তক থাকলেও প্রেম করলে যে বিরহ-বেদনা আসবে আর তা সহ্য করতে হবে এ নিয়ে কারো কোন বির্তক আছে বলে শুনিনি। প্রেমে সার্থকতার শেষ ফল বিয়ে, কিন্তু বিয়ে হতেই হবে এমনও কোন শাস্ত্র নেই। আমাদের আলোচিত এ প্রেমিক যুগলের বিয়ে হয় নি, আলী আকবর সাহেবের শর্তের জন্যে। তার জন্য নজরুল সারা জীবন বিরহানলে জ্বলেছেন। নার্গিস? সেও হয়তো সতের বছর। কেন না, তাঁর পরবর্তী জীবন স্বামী পুত্র নিয়ে ভালই কেটেছে বলে শুনা যায়। এ সব কারণে আমরা বলতে পারি প্রবঞ্চক কবি নজরুল নয়। নার্গিসের মামা আলী আকবর খানই প্রতারক। আলী আকবর খানই কবি’র সাথে প্রতারণা করেছে তার ব্যবসায়িক হীন স্বার্থ চরিতার্থ করার লোভে। তারপরও নজরুলকে আমরা প্রবঞ্চক ভাবতে পারতাম যদি না নার্গিসের প্রতি তাঁর ভালবাসা না থাকতো। কবি সারা জীবন নার্গিসকে লালন করেছেন তাঁর কাব্যে, কবিতায়, জীবনের প্রতি পদক্ষেপে। কবি’র ভাষায়- ‘‘......জীবন ভ’রে সেখানেই চলেছে আমার পূজা-আরতি।........তুমি যদি সত্যি আমায় ভালবাস, আমাকে চাও, ওখান থেকেই আমাকে পাবে। লায়লী মজনুকে পায় নি, শিঁরী ফরহাদকে পায় নি, তবু তাদের মত করে কেউ কারো প্রিয়তমকে পায় নি।.......প্রেমের সোনার কাঠির স্পর্শ যদি পেয়ে থাক, তাহলে তোমার মত ভাগ্যবতী কে আছে?’’ বিয়ে না করে ভালবাসা যাবে না, ভালবাসার আইনে এমন কোন বিধান নেই। প্রেমের পিঠ পাতা ভুবনে কখন কে চড়ে বসে কেউ বলতে পারে না।
উদ্ধৃত অংশে মোবাশ্বের আলীর বড় সমস্যা হলো- নার্গিস ও তাহমিনা কে একত্র করে ফেলা। নার্গিস-তাহমিনা কে এক চরিত্রে কোন অবস্থায়ই কল্পনা করা যায় না। তাঁদের মধ্যে প্রধান প্রার্থক্য হলো- এক. বিবাহীতা, নার্গিস অবিবাহিতা। দুই. রুস্তম কর্তব্য কর্মে যুদ্ধে গেলেন আর নজরুল বিয়ের পিঁড়ি থেকে উঠে গেলেন বিয়ে না করে।
রুস্তম বীর যোদ্ধা যুদ্ধ তাকে ডাকে। কবি নজরুল বন্ধন হীন সাধের ভিখারী পথ তাঁকে ডাকে। এ আত্মভোলা অভিমানিকে আবার অপমানজনক প্রস্তাব করা হলো। সে তাঁর আত্ম মর্যাদার প্রয়োজনে বিয়ে বাড়ি ত্যাগ করলেন। এখানে রুস্তম বা নজরুল কেউ প্রবঞ্চক নয়, তাঁরা কেউ শঠতার আশ্রয়ও নেয় নি। তাছাড়া রুস্তম তাহমিনার অনুমতি নিয়ে যুদ্ধে যাত্রা করেন এবং হাতের মাদুলি তাহ্মিনার কাছে রেখে যান। তাহমিনার গর্ভজাত সন্তান ভূমিষ্ঠ হলে তার হাতে বেঁধে দেবার জন্য। তাই বলছিলাম- ‘‘এর সাথে পুরুষের শঠতার শিকার দুই নারীকে হতে হয়েছে।’’ এমন মন্তব্য একজন জ্ঞানি-গুনি, বিশ্ব সাহিত্যের অগাধ পাণ্ডিত্যর অধিকারী অধ্যাপকের কাছে যখন শুনি, তখন আমরা আহত হই। আরও আহত হই যখন মনে পড়ে, তাঁরই উচ্চারণ- ‘‘নজরুল মানুষের মানবিক মর্যাদাকে মস্ত বড় মূল্য দিয়েছেন।’’ (নজরুল: সমাজ, পরিবেশ ও কাল। ভূমিকা- রচনা কাল ২০০৫। রেঁনেসা, ঢাকা)
আর একটি বিষয়ে দৃষ্টি দেই, নার্গিসের উপন্যাসের ভূমিকা। এ প্রসঙ্গে কবিই হয়তো আমাদের জন্য তথ্য দিয়ে রেখেছেন, নার্গিসের কাছে লেখা পত্রের চ. ঝ. এ ‘‘তোমার কোন পুস্তকে আমার সম্বন্ধে কটুক্তি ছিল।
ইতি-
Gentleman
কবি যে ভদ্রলোক তা কতটা প্রাসঙ্গিক হলে অন্যকে জানাতে হয়, সে আলোচনা নাই হলো। তবে আমার মত পাঠকও প্রশ্ন করতে পারেন- যে ব্যক্তি মানুষের মর্যাদাকে মস্ত বড় মূল্য দিতেন, সেই ব্যক্তি তাঁর বিবাহিতা পত্মীর মর্যাদা দিবেন না, এ কথা আমার বিশ্বাস করতে হবে কেন?
এ পর্বে ‘নজরুল-রচনাবলী’, বাংলা একাডেমী, ঢাকা’র সম্পাদনা-পরিষদ-এর টীকার দিকে সামান্য দৃষ্টি ফেরানো যাক। সম্পাদনা-পরিষদ সাতষট্টি নাম্বার পত্রের টীকায় বলেছেন নজরুল-নার্গিসের বিয়ে এবং বিয়ে বিচ্ছেদের কথা। তাঁরাই আট নাম্বার পত্রে (পৃষ্ঠা: ১৭৪) বলেছেন অন্য কথা। এখানে বলা হয়েছে- ‘‘এই চিঠিটি নজরুল-নার্গিস বিবাহ সংক্রান্ত প্রতিবাদলিপি। নজরুল-বিবাহে আলী আকবর খান যে নিমন্ত্রণ-পত্র ছাপান, নজরুল-বন্ধুরা ধারণা করেছিল সেটা নজরুলের মুসাবিদায় ছাপা হয়। নজরুল ইসলাম তার প্রতিবাদ করেন। এটি সাপ্তাহিক ‘বিজলী’র ২২ শে জুলাই ১৯২১ সংখ্যায় ‘কবিবরের প্রতিবাদ’ শিরোনামে ছাপা হয়।’’ প্রতিবাদ কখন হয়! যখন ঘটনা সত্য নয়, রটে যায় এমন ঘটনারই প্রতিবাদ করে থাকেন ভুক্তভোগি। আমরা কবি’র এ প্রতিবাদলিপি পাঠে জানবো যে, বর সাজলেই বৌ পাওয়া যায় না, বিবাহের পিঁড়িতে বসলেই বিবাহ সম্পূর্ণ হয় না।
‘কবিবরের প্রতিবাদ’
প্রথমেই বলে রাখি, আমার এই ‘কবি-বরে’র অর্থ ‘কবি-শ্রেষ্ঠ’ নয়, এ ‘কবি-বরের’ মানে-‘যে কবি বিয়ের বর’। কারণ, দিন কতক আগে আমি বাস্তবিকই-অন্তত ঘন্টা কয়েকের জন্যে ‘বর’ সেজেছিলুম, যদিও বরের এখনো বধূর সঙ্গে সাক্ষাৎ নেই। যাক সে কথা, আমার ঐ ‘ত্রিশঙ্কু বিয়েতে’ শ্বশুরকুলের কর্তৃপক্ষগণ এক কাব্যিক নিমন্ত্রণপত্র ছাপিয়েছিলেন এবং সেটি চরমে গিয়ে পৌঁছেছে এই জন্যে যে, সেটা আবার আমার সাহিত্যিক ও কবি বন্ধুবর্গকে পাঠানো হয়েছে। সেটা একপ্রকার জামাই-বিজ্ঞানপন বললেও হয়। ওতে আমার নামের আগে ও পিছনে এত লেজুড় লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, কোনো চতুষ্পদ জীবেরই অতগুলো ল্যাজ থাকে না।’’ কবির সে রাতে যে বিবাহ হয় নি, এ কথা এখানেও স্পষ্ট উল্লেখ আছে- দিন কতক আগে আমি বাস্তবিকই-অন্তত ঘন্টা কয়েকের জন্যে ‘বর’ সেজেছিলুম, যদিও বরের এখনো বধূর সঙ্গে সাক্ষাৎ নেই।
যদি আমরা চক্রবাক কাব্যের দিকে দৃষ্টি দেই সেখানে দেখি গুরে ফিরে কবি সেই একই কথা বলেছেন- তুমি আমার দেওয়া মালা গ্রহণ করলে না। ‘হিংসাতুর’ কবিতায় কবি বলেন-
‘মানুষ’, ‘মানুষ’ শুনে শুনে নিতি কান হলো ঝালাপালা !
তোমরা তারেই অমানুষ বলো-পায়ে দলো যার মালা !
তারি অপরাধ-যে তার প্রেম ও অশ্রুর অপমানে
আঘাত করিয়া টুটায়ে পাষাণ অশ্রু-নিঝর আনে !
কবি অমানুষ-মানিলাম সব! তোমার দুয়ার ধরি
কবি না মানুষ কেঁদেছিল প্রিয় সেদিন নিশীথ ভলি?
দেখেছ ঈর্ষা-পড়ে নাই চোখে সাগরের এত জল?
শুকালে সাগর-দেখিতেছ তারসাহারার মরুতল!
হয়তো কবিই গেয়েছিল গান, সে কি শুধু কথা-সুর?
কাঁদিয়াছিল যে-তোমারি মতো সে মানুষ বেদনাতুর!’’
‘‘সেদিন কবিই কেঁদেছিল শুধু? মানুষ কঁদেনি সাথে?
হিংসাই শুধু দেখেছ, দেখোনি অশ্রু নয়ন-পাতে?
আজো সে ফিরিছে হাসিয়া? -হায়, তুমি বুঝিবে না,
ঘাসির ফুর্তি উড়ায় যে- তার অশ্রু কত দেনা!’’
মোবাশ্বের আলী তাঁর লেখা ‘নজরুল ও তিন নারী’ গ্রন্থের ২৮ নং পৃষ্ঠায় নার্গিসের আর একটি উপন্যাসের উদাহরণে এনেছেন। এখানে তিনি বলেছেন- ‘‘নার্গিসের সর্বশেষ উপন্যাস ‘পথিক হাওয়া’। এই উপন্যাসে নজরুলের বোহেমিয়ান চরিত্র রূপান্তর হয়েছে। বোহেমিয়ান চরিত্র স্বপ্নের মায়া অঞ্চলে মাখিয়ে দিতে চায়, কিন্তু ঘর বাঁধতে পারে না। তাই তো নার্গিসের জীবনে ঘটেছে ট্র্যাজেডি।’’ এ উদ্ধৃতিতে আমরা বুঝলাম, নার্গিস বলেছেন- নজরুল ভালবাসতে পারে, ভালবেসে ঘর বাঁধার স্বপ্ন দেখে এবং দেখায় কিন্তু ঘর বাঁধে না বা ঘর বাঁধতে পারে না। অর্থাৎ নার্গিসের শেষ উপনাস ‘পথিক হাওয়া’ও প্রমাণ করে তাঁদের বিয়ে হয় নি।
নার্গিসের শেষ উপন্যাস ‘পথিক হাওয়া’য় নজরুলের যে চরিত্র অঙ্কিত হয়েছে, তা প্রকৃতি চরিত্র। তাকে ধরা যায় না, ছোঁয়া যায় না, শুধু অনুভব করা যায়। তাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখা যায়, ঘর বাঁধা যায় না। এমন প্রাকৃতিক সৌন্দর্য কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সৃষ্টি করেছেন ‘লাবণ্য’ চরিত্রে, ‘অতিথি’ ছোট গল্পে ‘তারাপদ’ চরিত্রে। ‘অতিথি’ গল্প পড়ে তারাপদ’র সাথে নজরুল চরিত্র মিলিয়ে ফেললে, আমার মনে হয় কারো অপরাধ হবে না। নজরুল-তারাপদ’র মধ্যে প্রার্থক্য শুধু এটুকু যে, তারাপদ শুধুই প্রকৃতি তাই সে বিয়ের সময় পালিয়ে যায়। আর নজরুল মানুষ বলে বিয়ের পিঁড়ি থেকে মাথা উচু করে উঠে এসেছেন, বিয়ে না করে এবং সবার স্বমুখ দিয়ে। তাঁকে ধরে রাখা যায় নি, আত্মসম্মানে আঘাত করে।
আমরা জানি বিয়ের অনুষ্ঠান চলছিল। বিয়ের আসর থেকে কবি উঠে আসেন কাবিন নামার আপত্তিকর শর্তের জন্যে। ‘কালের খেয়া’ (৪৭) সংখ্যায় আবুল আহসান চৌধুরীর ‘নজরুলের অগ্রন্থিত, দুষ্পাপ্য ও বিলুপ্ত চিঠির সন্ধ্যানে” শীর্ষক প্রবন্ধের ২৩ নং উদ্ধৃতিও প্রমাণ করে নজরুল নার্গিসের বিয়ে হয় নি। ‘‘মা, আলী আকবর খান আমাকে নোটের তাড়া দেখিয়ে গেল।” এ নোটের তাড়া কেন, কি প্রয়োজনে দেখানো? তাঁর লেখার স্বত্ব কেনার জন্য না-কী নার্গিসকে বিয়ে দেয়ার যৌতুক সেঁধে ছিলেন সে দিন আলী আকবর খান, কবি নজরুলকে। নজরুল নার্গিসের বিয়ে যে হতে পারে না, হবার নয়, তা কাবিন নামার শর্তের দিকে দৃষ্টি দিলেই বুঝা যায় ‘ঘর জামাই’ ঠিক ঘর জামাইও নয়, মামা শ্বশুরের ঘর জামাই। ‘পরাধীন যুগের স্বাধীন কবি’র (দ্র: রফিকুল ইসলাম, কালের খেয়া-৬১) পক্ষে কি ঘর জামাই হওয়া স্বাভাবিক কোন ব্যাপার? পরাধিনতার শৃঙ্খলে তাঁকে কে, কী দিয়ে বাঁধবে! যৌবনের ফাঁদের তো ঘর ছাড়া পথিককে বাঁধা যায় না, আর যে বাঁধবে সে নিজেই তো কবি ভাষায় ‘পোষাপাখী’। (পূজারিণী, দোলন চাঁপা)।
প্রথম বিশ্ব যুদ্ধের শেষে পৃথিবী জুড়ে ধ্বংসের উপর শোষকের অন্যায় অবিচার চলেছে এক দিকে আর এক দিকে কবি’র জীবনে তাঁর মনের উপর চলে মন ভাঙ্গার মাতম। কবি’র সেই হৃদয় ভাঙ্গা স্রোতে তাঁর স্বাধের বাসর ভেঙেছে। কবি সেই ভাঙ্গা মন নিয়ে প্রথম বিদ্রোহী হন, বিদ্রোহ করেন নিজের জীবনের উপর, মনের উপর। যার সূচনা হয় দৌলতপুর আলী আকবর খানের বাড়ি, শুক্রবার ৩রা আষাঢ় ১৩২৮ সাল রাতে। বিয়ের আসর থেকে কবি সে রাতেই পা’য়ে হেটে কুমিল্লায় আসেন। এবং সেখান থেকে কলকাতায়, কমরেড মোজাফ্ফর আহামদের সাথে।
এ প্রসঙ্গে মুজফ্ফর আহ্মদ তাঁর ‘‘কাজী নজরুল ইস্লাম: স্মৃতিকথা’’ গ্রন্থের ৬৭ পৃষ্ঠায় বলেছেন, “তাঁর (সন্তোষকুমার সেন) সঙ্গে কথা ব'লে আমি বুঝতে পেরেছি যে আলী আকবর খান বুঝেছিলেন নজরুল ইসলাম বিয়ে সম্বন্ধে বিতৃষ্ণা। এই অবস্থায় খান সাহেবও কোনো একটা অছিলা ধরে বিয়েটা ভেঙে দিতে চাইছিলেন। তাই তিনি কাবিন নামায় (স্ত্রীর বরাবরে সম্পাদিত স্বামীর একটি দলীল) একটি শর্ত রাখতে চাইলেন যে বিয়ের পরে নজরুল ইস্লাম নার্গিস বেগমকে অন্য কোথাও নিয়ে যাবে না, দৌলৎপুর গ্রামে এসেই সে তাঁর সঙ্গে বাস করবে। এই অপমানজনক শর্ত মেনে না নিয়ে নজরুল ইস্লাম বিয়ের মজ্লিস হতে উঠে চলে গিয়েছিল। তার মানে এই যে সৈয়দা খাতুন, ওর্ফে নার্গিস বেগমের সহিত নজরুল ইসলামের ‘‘আক্দ’’ বা বিয়ে একেবারেই হয় নি। এই থেকে এখন বোঝা যাচ্ছে যে বিরজাসুন্দরী দেবী তাঁর লেখা নজরুলের দ্বারা সম্পাদিত প্রবন্ধে কেন লিখেছিলেন ‘‘বিয়ে তো ত্রিশঙ্কুর মতন ঝুলতে লাগলো মধ্য পথেই, এখন আমাদের বিদায়ের পালা” আর, ঘটনার পনের বছর পরে নার্গিস বেগমের নজরুল ইসলামকে লেখা পত্রোত্তরে সেই বা কেন লিখেছিলেন-
“যারে হাত দিয়ে মালা দিতে পার নাই
কেন মনে রাখ তারে”
এই গানটি।
৩রা আষাঢ়ের দিবাগত রাত্রে নজরুল বিরজাসুন্দরী দেবীর নিকটে বিদায় নিতে এলো, বলল, “মা, আমি এখনই চলে যাচ্ছি।” ওই অবস্থায় তাকে ফেরানো কথাই ওঠে না। নজরুলের মেজাজ সেই রকমের নয়। তিনি বললেন, “তুমি বাইরের লোক, পথঘাট চেন না, এই রাত্রে একলা যাবে কি করে? যাবেই যদি তবে বীরেনকে সঙ্গে নিয়ে যাও। সে তবু কুমিল্লায় জন্মেছে আর কুমিল্লায় মানুষ হয়েছে, এ দেশের লোকজনকে চেনে। আমাদের সঙ্গে তো উনি থাকলেন।” তাঁর স্বামীর কথা বললেন তিনি। শুধু আষাঢ় মাস তো ছিল না, পূর্ববঙ্গের অতি বৃষ্টির আষাঢ় মাস। পথঘাট গলে কাদাময় হয়ে যায়। সেই কাদা-বিছানো পথে দশ-এগারো মাইল পায়ে হেঁটে নজরুল আর বীরেন্দ্রকুমার সেনগুপ্ত কুমিল্লায় এসে পৌঁছুলেন ৪ঠা আষাঢ়ের সকাল বেলা। শ্রীযুক্তা বিরজাসুন্দরী লিখেছেন দৌলৎপুরে তাঁরা তিন দিন ছিলেন। তার মানে, ২রা, ৩রা ও ৪ঠা আষাঢ় এই তিন দিন। ৪ঠা আষাঢ় দিবাগত রাত্রের গভীরে তাঁরা নৌকাপথেই আলী আকবর খানের বাড়ী ছেড়েছিলেন। বিয়ের বর উঠে চলে গেছেন। এইজন্যে গ্রামের লোকেরা তাঁদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করতে পারেন ভেবে তাঁদের দিনের বেলা রওয়ানা হতে দেওয়া হয় নি। ভোর হওয়া পর্যন্ত আলী আকবর খানের একজন অগ্রজ, (আলতাফ আলী খান নয়) নৌকায় ছিলেন।
নজরুল পায়ে হেঁটে গিয়েছিল বলে নিজের জিনিসপত্র নিয়ে যেতে পারে নি। সেগুলি বিরজাসুন্দরী দেবীর সঙ্গেই নিয়ে যাওয়ার কথা ছিল। সঙ্গে সে সব নিয়েওছিলেন তিনি। তবে তার ভিতর হতে আলী আকবর খান চিঠিপত্রগুলি ও অন্যান্য কাগজ-পত্র বার করে নিয়েছিলেন।
নজরুল ইসলামকে সঙ্গে নিয়ে আমি ৮ই জুলাই (১৯২১) তারিখে কুমিল্লা ছেড়েছিলাম। ইতোমধ্যেই নজরুল কুমিল্লায় জনপ্রিয় হয়ে গিয়েছিল। রেল স্টেশনে অনেকেই তাকে বিদায় দিতে এসেছিলেন।”
মুজফ্ফর আহ্মদ তাঁর উল্লেখিত গ্রন্থের ৭৮ পৃষ্ঠায় লিখেছেন- ‘‘একদিন আলী আকবর খান আমাদের ওই বাড়ীতে আসেন। নজরুল আর আমি বাড়ীতেই ছিলেম। আরও দু’একজন কে কে উপস্থিত ছিলেন সেখানে। নজরুলের স্বভাব ছিল যে নূতন কেউ এলে চেঁচিয়ে আনন্দ প্রকাশ ক’রে সে তাঁকে গ্রহণ করত। পাশের ঘরের লোকও বুঝতে পারতেন যে নজরুলের নিকটে বুঝি কেউ এলেন। সেদিন আলী আকবর খানের আসাতে নজরুল কেনো উচ্ছ¡াস প্রকাশ তো করলই না, একবার বসতেও বলল না তাকে। শক্ত হ’য়ে চুপ ক’রে বসে থাকল সে। আজ এতকাল পরে ‘‘বাবা শ্বশুর’’ মার্কা পত্রখানা পড়ে আমার মনে হচ্ছে যে আলী আকবর খান যাঁদের সেই পত্র দেখিয়েছিলেন তাঁদের একজন কেউ যদি সেই সন্ধ্যায় আমাদের তালতলা লেনের বাসায় উপস্থিত তাকতেন তবে বুঝতে পারতেন কী চীজ এই আলী আকবর খান! যা’ক, খান সাহেব নিজেই নজরুলের পাশে তখ্ৎপোশের ওপর বসলেন। তাঁর হাতে বেশ পুরু একতাড়া দশ টাকার নোট ছিল। খুব নীচু আওয়াজে কথা বলছিলেন তিনি, আর নোটের তাড়াটি নাড়ছিলেন-চাড়ছিলেন। অকারণে নাড়াচাড়ার মতো দেখালেও আসলে ভাবখানা ছিল এই যে এই নোটের তাড়াটি তোমারই জন্যে।
সেই সন্ধ্যায় আলী আকবর খান এসেছিলেন একটা সম্ঝতার জন্যে। তিনি বলতে এসেছিলেন, যা ঘটে গেছে তার সবকিছু ভুলে যা’ক নজরুল। আবার সে ফিরে চলুক এবং গ্রহণ করুক তার ভাগিনেয়ীকে। তখন নজরুল যদি প্রস্তাব করত যে দৌলৎপুর গ্রামে সে আর ফিরে যাবে না, নার্গিসকে কলকাতায় নিয়ে এসে সব ব্যবস্থা করা হোক, তাতেই খান সাহেব খুশী হয়ে রাজী হতেন এবং টাকাও খরচ করতেন। তিনি লোক-সমাজে মুখ দেখাতে পারছিলেন না। কিন্তু তিনি বাড়ীতে ডেকে নিয়ে গিয়ে নজরুলকে পেছন হতে ছুরি মেরেছিলেন এবং তাঁর ভাগিনেয়ীও তাতে সহায়িকা ছিলেন। নজরুলের মন ভেঙ্গে এমনভাবে দু’টুক্রো হয়ে গিয়েছিল যে তাতে জোড়া লাগানোর কোনো সম্ভাবনা আর ছিল না। আলী আকবর খানের ‘‘বাবা শ্বশুর” মার্কা জাল পত্রখানা পড়ে অনেকের মনেই ভুল ধারণা জন্মেছে যে নজরুলের ‘‘মনে অবাঞ্ছিত ও দুঃখজনক ঘটনাটির জন্যে এক বিশেষ বেদনাবোধ এবং সেইসঙ্গে একটা মিটমাট করে নেওয়ার মনোভাব ছিল।’’ (নজরুল চরিত মানস, ২য় সংস্করণ, ৮৩ পৃষ্ঠা)। আসলে কিন্তু মিটমাট করার প্রচেষ্টা আলী আকবর খানই করেছিলেন। তাঁর ভাগিনেয়ী যে বিশেষ ব্যক্তিত্বের অধিকারিণী ছিলেন তা ডক্টর গুপ্ত কি করে বুঝতে পারলেন? তিনি তাঁকে যা বুঝেছেন তা ঠিক তিনি ছিলেন না। তাঁর মামার ইচ্ছাই ছিল তাঁর ইচ্ছা। নজরুলকে চোখের জলে বিদায় ক’রে দিয়ে আবার তাঁরা ফেরাতে এসেছিলেন, কিন্তু সুবিধাজনক কোনো ছল খুঁজে পাননি।’’ নজরুল প্রমীলাকে বিয়ে করার আগে ও পরে তাঁকে আবার দৌলৎপুর ফিরিয়ে নিতে যে নার্গিস গংরা বারবার চেষ্ঠা করেছে, তা নার্গিসের লেখা ও স্বাক্ষাতকারেই আমরা জানতে পেরেছি। আর এ বিষয়টাই মোবাশ্বের আলী তাঁর ‘‘নজরুল ও তিন নারী’’ গ্রন্থে বারবার বলেছেন, যে নজরুলকে বারবার ফিরিয়ে আনার চেষ্ঠা করেও আলী আকবর খান- নার্গিস ব্যর্থ হয়েছে।
কবি ফিরে আসে কলকাতায়। কলকাতায় আসার পর লেখনিতে যোগ হয় নতুন মাত্রা। গতানুগতিক প্রেম বিরহের কাব্য ছেড়ে কবি স্বদেশ প্রেমের কাব্য লিখতে আত্মনিয়োগ করেন। তাঁর বিখ্যাত ‘বিদ্রোহী’ কবিতা এ সময়েই লেখা। কবি সৈয়দা খাতুনকে (নার্গিস) ভালবেসেছিলেন। কবি ভালবাসতে জানতেন। কি পরিমান ভালবাসা এবং নার্গিসের প্রতি কি পরিমান ঘৃনা তিনি পোষণ করতেন তা’ তার পূজারিণী (দোলন-চাঁপা কাব্যের অন্তরগত) কবিতা পাঠ করলে বুঝা যায়। এখানে কবি’র নারীপ্রেম, নারীঘৃনা এক সাথে মিশে একাকার হয়েছে। নারীকে কবি সকল কিছুর উর্ধ্বে স্থান দিতে শিখেছিলেন। নারীই ছিলো কবি’র বিজয় লক্ষ্মী আর সে বিজয় লক্ষ্মী নারীকে পূজারিণীতে কোথায় নামিয়ে এনেছেন। ওই পূজারিণী নারী যে নার্গিস তা এ কবিতা পাঠ মাত্রই বুঝা যায়, গবেষক মহোদয়দের দ্বারস্থ হতে হয় না-
ভেবেছিনু, দুর্বিনীত দুর্জয়ীরে জয়ের গরবে
তব প্রাণে উদ্ভাসিবে অপরূপ জ্যোতি, তারপর একদিন
তুমি মোর এ বাহুতে মহাশক্তি সঞ্চারিয়া
বিদ্রোহীর জয়²ী হবে।
ছিল আশা, ছিল শক্তি, বিশ্বটারে টেনে
ছিঁড়ে তব রাঙা পদতলে ছিন্ন রাঙা পদ্মসম পূজা দেবো এনে!
কিন্তু হায়! কোথা সেই তুমি? কোথা সেই প্রাণ?
কোথা সেই নাড়ি-ছেঁড়া প্রাণে প্রাণে টান?
এ-তুমি আজ সে-তুমি তো নহ;
আজ হেরি-তুমিও ছলনাময়ী,
তুমিও হইতে চাও মিথ্যা দিয়া জয়ী!
কিছু মোরে দিতে চাও, অন্য তরে রাখো কিছু বাকি,-
দুর্ভাগিনী! দেখে হেসে মরি! কারে তুমি দিতে চাও ফাঁকি?
মোর বুকে জাগিছে অহরহ সত্য ভগবান,
তাঁর দৃষ্টি বড় তীক্ষè, এ দৃষ্টি যাহারে দেখে,
তন্নতন্ন করে খুঁজে দেখে তার প্রাণ।
লোভে আজ তব পূজা কলুষিত, প্রিয়া,
আজ তারে ভুলাইতে চাহ,
যারে তুমি পূজেছিলে পূর্ণ-মন-প্রাণ সমর্পিয়া।
তাই আমি ভাবি, কার দোষে-
অকলঙ্ক তব হৃদি-পুরে
জ্বলিল এ মরণের আলো কবে পশে?
তবু ভাবি, একি সত্য? তুমিও ছলনাময়ী?
যদি তাই হয়, তবে মাযাবিনী অয়ি!
ওরে দুষ্ট, তাই সত্য হোক।
জ্বালো তবে ভালো করে জ্বালো মিথ্যালোক।
আমি তুমি সূর্য চন্দ্র গ্রহ তারা
সব মিথ্যা হোক;
জ্বালো ওরে মিথ্যাময়ী, জ্বালো তবে ভালো করে জ্বালো মিথ্যালোক।
----------------------
এরা দেবী, এরা লোভী, এরা চাহে সর্বজন-প্রীতি!
ইহাদের তরে নহে প্রেমিকের পূর্ণ পূজা, পূজারীর পূর্ণ সমর্পণ,
পূজা হেরি ইহাদের ভীরু-বুকে তাই জাগে এত সত্য-ভীতি।
নারী নাহি হতে চায় শুধু একা কারো,
এরা দেবী, এরা লোবী, যত পূজা পায় এরা চায় তত আরো।
ইহাদের অতিলোভী মন
একজনে তৃপ্ত নয়, এক পেয়ে সুখী নয়,
যাচে বহু জন।...
যে পূজা পূজিনি আমি স্রষ্টা ভগবানে,
যারে দিনু সেই পূজা সে-ই আজি প্রতারণা হানে!’’
(পূজারিণী, দোলন-চাঁপা)
অথচ এই লেখক, এই কবি নজরুলই নারীকে কত মূল্য দিয়ে তাঁর লেখনি চালিয়েছেন। তা তাঁর নারী কবিতার দু’এক লাইন পড়লেই বুঝা যায়-
‘‘সাম্যের গান গাই-
আমার চক্ষে পুরুষ-রমণী কোনো ভেদাভেদ নাই।
বিশ্বে যা-কিছু মহান সৃষ্টি চির-কল্যাণকর
অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।’’
(নারী, সাম্যবাদী)
ছলনাময়ীর ছলনায় আর কিছু হোক বা না হোক আমরা কিছু বিখ্যাত কবিতা-গান পেয়েছি-
আজও মধুর বাঁশরী বাঁজে
গোধূলী লগনে বুকের মাঝে।।
আজও মনে হয় সহসা কখন
জলে ভরা দু’টি ডাগর নয়ন।
ক্ষণিকের ভুলে সেই চাঁপা ফুলে
ফেলে ছুটে যাওয়া লাজে।।
হারান দিন বুঝি আসিবেনা ফিরে
মন কান্দে কেন স্মৃতির তীরে।
তবু মাঝে মাঝে আসা জাগে কেন
আমি ভুলিয়াছি ভুলেনি সে যেন
গোমতীর পাতার কুটিরে
আজও সে পথ চাহে সাঁজে।।’
এ গান আমাদের নিয়ে যায় কুমিল্লার দৌলতপুরে গোমতীর তীরে, যেখানে মিলনের প্রথম সূর্য উদিত হয়েছিল ২৩ চৈত্র ১৩২৭, আর চৈত্রের খরোতাপে কবি হৃদয়ে ঝরেছিল বরোষার বারি ধারা। যখন পাঠ করি-
যারে হাত দিয়ে মালা দিতে পারনি
কেন মনে রাখ তারে।
তখন মনে হয় এ কবিতা নয়, এ চিঠি নয়, এ গান নয়, এ যেন বিয়ের বাসর ভাঙ্গা কবি’র বুকে জমে থাকা হাজার বছরের ক্ষোভ, যা সে দিন নার্গিসকে কবি বলতে পারে নি। সেই না বলা কথা বুক ফেঁটে বাণী হয়ে এসেছে আমাদের কাছে। নজরুল নার্গিসের বিয়ে বিষয়ে কেউ যদি আলোচনা করতে চায় তাহলে, প্রথমেই তাকে দৃষ্টি দিতে হবে তাঁদের কাবিন নামার উপর। আলী আকবর খান বিয়ের কাবিন নামায় যে শর্ত দিলেন তা হলো নজরুল নার্গিসকে নিয়ে ঘর সংসার পাতবেন আলী আকবর খানের বাড়িতে দৌলৎপুরে, অন্য কোথাও নয়। নজরুল, নার্গিসকে অন্য কোথাও নিয়ে যেতে পারবে না এবং নজরুলকে দৌলতপুরে স্থায়ি ভাবে থাকতে হবে। অপমান জনক এ শর্ত কবি মেনে নিতে পারে নি, ফলাফলে বিয়ে ভেঙ্গে গেল। বর বেশের কবি উঠে এলেন বিয়ের পিঁড়ি থেকে। বিয়ের নিমন্ত্রণ পত্র এবং ‘নূরু’ নামক প্রেরকের এক পত্র আলী আকবর খানের পরিবার কিম্বা সে নিজে সংরক্ষণ করেছেন। আর তার উপর ভিত্তি করে আজকের নজরুল গবেষকেরা নার্গিসকে কবি’র প্রথমা স্ত্রীর মর্যাদা দিয়ে থাকেন। কিন্তু তাঁরা একটু ভেবে দেখার প্রয়োজন মনে করে না যে, বিবাহিতা নার্গিসের দ্বিতীয় বিয়ের আগে নজরুলের তালাক নিয়েছিল কি-না এবং নজরুল মানসের এহেন অপকর্ম স্ত্রীকে তার মর্যাদা প্রদান না-করার মত মানসীকতা ছিল কি-না। আর নূরু নামক প্রেরকের চিঠি যে নজরুল নামে প্রত্যরণা, তার প্রমাণ করেছেন কমরেড মুজফ্ফর আহমদ পূর্বে উল্লেখিত গ্রন্থের ৬৮ পৃষ্ঠার।
‘তোমার চরণ স্মরণ চিহৃ...’ বন্ধনা করে লেখক জনাব আব্দুল হাই শিকদার যেন কবিকে অপমান করেছেন। আর অভিনেত্রী নার্গিসের যে গুন কর্তৃন করেছেন, তা’তে জনাব শিকদারকে ভারাটে লেখক ছাড়া আর কিছু বলা যায় না। ‘‘নার্গিসের পৈতৃক বাড়ি থেকে বেরিয়ে আবার পথে নামি আমরা। জন্মভূমি দৌলতপুরে জীবনের শেষ দিনগুলো কাটানোর বড় ইচ্ছে ছিল নার্গিসের। প্রখর মেধাবী, সিগ্ধা, ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন, অতিথি পরায়না, পরিচ্ছন্নতা, প্রিয়, গ্রন্থপ্রেমিক, রূপে-গুনে, আচার আচরণে চরিত্র-মাহাত্মে, জ্ঞান বৈদন্ধে নার্গিসই ছিলেন নার্গিসের তুলনা।’’ (আব্দুল হাই শিকদার- তোমার চরণ স্মরণ চিহৃ....। পৃষ্ঠা ৩৬; ঝিঙে ফুল, ঢাকা। প্রথম প্রকাশ মার্চ ২০০৩) যদিও জনাব শিকাদার কতবার নার্গিসের আতিথিয়তা গ্রহণ করেছিলেন সে প্রসঙ্গ এড়িয়ে গেছেন, আমরাও সে প্রসঙ্গে না যদি যাই তবু প্রশ্ন করতে পারি ‘তোমার চরণ স্মরণ চিহৃ....’এ মধুময় কর্তৃন বাক্য নজরুলের উদ্দেশ্যে না সৈয়দা খাতুনের (নার্গিস, কবি’র দেয়া প্রেয়সীর নাম।) উদ্দেশ্যে? আর একটি কথা, আপনি কি জানেন না দৌলতপুরে নার্গিস-নজরুলের ঘটনা যে বাড়িতে, যে বাড়ি থেকে বেড়িয়ে আপনি পথে নামলেন সে বাড়ি নার্গিসের পৈতৃক বাড়ি নয়, সে বাড়ি সৈয়দা খাতুনের নানা-মামাদের বাড়ি। আর একটি কথা না বললেই নয়, আদর্শ বাঙালি নারীর জীবনের শেষ ইচ্ছে থাকে স্বামীর বাড়িতে শেষ নিশ্বাস পর্যন্ত থাকার, অথচ আপনার অঙ্কিত নার্গিসের কিন্তু সে ইচ্ছা ছিল না। ছিল মামার বাড়িতে থাকার। তারপরও কী আমরা তাকে আদর্শ নারী হিসেবে দেখবো? আমাদের মনে হয়েছে আপনি নজরুলের ভালবাসার নার্গিসকে অংকন করতে ব্যর্থ হয়েছেন, আপনি একেছেন সৈয়দা খাতুনকে। নজরুল নার্গিস বিয়ে প্রসঙ্গে অধ্যাপক আবদুল মান্নান সৈয়দও তাঁর মত বিরোধী মন্তব্য করেছেন ‘নজরুল ইসলামের কবিতা’ গ্রন্থের ১৫০ পৃষ্ঠায় ও ১৫৬-১৫৭ পৃষ্ঠায়। প্রথমে বলেছেন- ‘‘দু’বারই তিনি বিবাহ করেন বাংলাদেশের কুমিল্লায়, নার্গিস আসার খানমকে ১৯২১ সালে প্রথমবার, দ্বিতীয়বার ১৯২৪ সালে প্রমীলাকে।’’ দ্বিতীয় মতে অধ্যাপক বলেন, ‘‘নার্গিসের সঙ্গে নজরুলের মিলনে- যে-কোন কারণেই হোক- মিলনের মুহূতেই বেজে উঠেছিল বিদায়ের বাঁশি। নজরুলের মতো অতিচেতন কবি’র মনে এই বেদনা স্থায়ী ক্ষত সৃষ্টি করেছিল। মনে হয়, পরবর্তী কালের অনেক কবিতায় ও গানে এই বেদনার মেঘ জমে আছে। অনেক সময় আরো বেদনার সঙ্গে বিমিশ্র হয়ে। এমনই কঠিন আঘাত পেয়েছিলেন, ‘আমি মানুষের ওপর বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছি।’ বিশ্বাস ফিরে পেয়েছিলেন নজরুল- তাঁর সমগ্র সাহিত্যই সেই সাক্ষ্য দেয়। কিন্তু বেদনা স্থাযী হয়েছিল। অনেক বছর পরে ১৯৩৭ সালে নার্গিসকে লেখা ‘প্রথম ও শেষ চিঠি’তে কবি নিজেই বলেছিলেন, ‘আমার অন্তর্যামী জানেন, তোমার জন্য আমার হৃদয়ে কি গভীর ক্ষত, কি অসীম বেদনা!’ এবং ‘এই মেঘপুঞ্জের আশীর্বাণী আমার জীবনে এনে দেয় চরম বেদনার সঞ্চয়। এই আষাঢ় আমার কল্পনার থেকে স্বর্গলোক টেনে ভাসিয়ে দিয়েছে বেদনার অনন্ত স্রোতে।’ উক্তিটি কবিত্ব নয়, নেহাৎ বাস্তব। ৩রা আষাঢ় দিবাগত রাতে দৌলতপুরে নার্গিস আসার খানমের সঙ্গে কবির বিবাহের তারিখ ছিল। মতান্তরের ফলে নজরুল সে রাতেই দৌলতপুর ছেড়েছিলেন।’’ মতান্তরের ফলে বিয়ে আর হয় নি। একাধিক বিয়ে ধর্মীয় দৃষ্টিতে তো নয়ই সমসাময়িক সমাজ ব্যবস্থাতেও নিষিদ্ধ ছিল না। কিন্তু নজরুল ছিলেন ভিন্ন, তাঁর মানসিকতা ছিল সর্ম্পূন ভিন্ন, তাঁকে নিয়ে এমন ঘটনা যা আদৌ ঘটে নাই, তা প্রচার করা আমাদের শোভা পায় না। নজরুল যা নয়, তা দিয়ে যদি তাঁকে বড় করা হয়, তবুও মনে হয় নজরুল মেনে নিতেন না। আজ সে মানা-না মানার উর্ধ্বে চলে গেছেন কিন্তু তাঁর সৃষ্টি রেখে গেছেন আমাদের জন্য। আমরা যেন তাঁর বিচার করতে গিয়ে অবিচার না করি। আমরা যেন তার সঠিক ব্যবহার করি, এটাই এখন আমাদের কামনা।
টীকা :
১. মুজফ্ফর আহ্মদ তাঁর কাজী নজরুল ইসলাম : স্মৃতিকথা গ্রন্থের ১৭ পৃষ্ঠায় কবি’র প্রথম প্রেম সম্বন্ধে সামান্য ইঙ্গিত করেছেন। সেখানে তিনি বলেন- ‘‘আমি সাহিত্য সমিতির আফিসের পাশের দিককার একখানা ঘরে থাকতাম। সেই ঘরের নজরুল ইসলামের জন্যে তখ্ৎপোশ পড়ল। কৌতুহলের বশে আমরা তার গাঁটরি-বোচকাগুলি খুলে দেখলাম। তাতে তাঁর লেপ, তোশক ও পোশাক-পরিচ্ছেদ ছিল। সৈনিকের পোশাক তো ছিলই, আর ছিল শিরওয়ানি (আচকান) ট্রাউজার্স ও কালো উঁচু টুপি যা তখনকার দিনে করাচির লোকেরা পরতেন। একটি দূরবিনও (বাইনোকুলা) ছিল। কবিতার খাতা, গল্পের খাতা, পুঁথি-পুস্তক, মাসিক পত্রিকা এবং রবীন্দ্রনাথের গানের স্বরলিপি, ইত্যাদিও ছিল। পুস্তকগুলোর মধ্যে ছিল ইরানের মহাকবি হাফিজের দিওয়ানের একখানা খুব বড় সংস্করণ। তাতে মূল পার্সির প্রতি ছত্রের নীচে উর্দু তর্জমা দেওয়া। অনেক দিন পরে আমারই কারণে নজরুল ইসলামের এই গ্রন্থখানা, আরও কিছু পুস্তক, কিছু চিঠি-পত্র, অনেক দিনের কবিতার খাতা, বিছানা, কিটব্যাগ, সুটকেস এবং ‘‘ব্যথার দান’’ পুস্তকের উৎসর্গে বর্ণিত মাথার কাঁটা খোয়া যায়। মিউজিয়ামে রক্ষিত মূল্যবান বস্তুর মতো নজরুল এই কাঁটাটিও রক্ষা করে আসছিল। উৎসর্গে লেখা আছে-
‘‘মানসী আমার !
মাথার কাঁটা নিয়েছিলুম বলে
ক্ষমা করনি,
তাই বুকের কাঁটা দিয়ে
প্রায়শ্চিত্ত করলুম।’’
কে ছিলেন এই কাঁটার মালিক তাঁর নাম সে আমায় কোনো দিন বলেনি।’’ এ হলো মুজফ্ফর আহ্মদের ভাষ্য। আমাদের মনে হয় নজরুল সে নাম নিজের অজান্তেই প্রকাশ করে গিয়েছেন। কবি ‘‘বাঁধন-হারা’’ পত্রোপন্যাসটির নাম দিতে চেয়েছিলেন ‘তহ্মীনা’ অথবা ‘বাঁধন-হারা’। বাঁধন-হারা পত্রোপন্যাসের কোথাও তহ্মীনা নামের চরিত্র নাই। এ থেকে আমাদের ধারণা হয়, ফৌজে থাকাবস্থায় এ নামের কোনো নারীর প্রেমে তিনি পরেছিলেন এবং তাঁকে স্মরণ করে লেখা পত্রগুলো এ গ্রন্থে স্থান পেয়েছে।
লেখক: গবেষক, সম্পাদক, কালচিত্র
আপনার মতামত লিখুন :