kalchitro
Bongosoft Ltd.
ঢাকা রবিবার, ৩১ আগস্ট, ২০২৫, ১৫ ভাদ্র ১৪৩২

কবিতায় বঙ্গবন্ধু 


কালচিত্র | আসমা চৌধুরী প্রকাশিত: আগস্ট ১৫, ২০২১, ১২:১৩ এএম কবিতায় বঙ্গবন্ধু 

আসমা চৌধুরী

কবিতায় বঙ্গবন্ধু 

 

বাংলাদেশের ও বাঙালিকে নিয়ে কথা বলতে গেলে যে চশমা পরা প্রত্যয়ী মানুষটি সামনে এসে দাঁড়ায়, তিনি আর কেউ নন, একজন সত্যিকারের রূপকার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বাঙালি জাতির আত্মপরিচয় ও আত্মপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে পাকিস্তানি স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী এক সত্ত্বা আমাদের এই বঙ্গবন্ধু। তিনি চেয়েছিলেন গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা প্রবর্তন করে শোষিত, বঞ্চিত, নিপীড়িত বাঙালি জাতির মুক্তি। শোষণ হীন সমাজ নির্মাণ ছিলো বঙ্গবন্ধুর সমগ্র জীবন সংগ্রামের দার্শনিক ও আদর্শিক ভিত্তি। দুঃখি মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর অদম্য আকাঙ্ক্ষাকে লালন করে জীবনের বেশিরভাগ সময় তাকে থাকতে হয়েছে কারাগারে। তারই ধারাবাহিকতায় দেশ স্বাধীন হলেও এক গভীর ষড়যন্ত্রের কারণে মাত্র সাড়ে তিন বৎসরের মাথায় তাকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। এই বেদনা ক্ষত কী করে ভুলবে জাতি? কেমন করে চুপ করে থাকবে লেখক সমাজ। এদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু তাই যেখানেই ছড়িয়েছেন আলো, সেখানেই তাকে ঘিরে আশার বসতি গড়েছেন লেখক সমাজ। ভেতরের নরম বোধ আলোড়িত হয়ে অপার ভালোবাসা কবিতার ভাষায় বেরিয়ে এসেছে। কবি নির্মলেন্দু গুণ যখন লেখেন,

    মুজিব অর্থ আর কিছু না

    মুজিব অর্থ মুক্তি

    পিতার সাথে সন্তানের

    না লেখা প্রেম চুক্তি

তখন এই বোধের শেকড়ে আমূল জড়িয়ে যাই আমরা যথাযথ আবেগে। একটি জাতির পিতা তো এমনই হওয়া উচিত।  যিনি রবীন্দ্রনাথের মতো দৃপ্ত উচ্চারণে আমাদেরকে শুনিয়েছিলেন সেই অমর কবিতা,' এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম।' স্বাধীনতা এই শব্দটি কিভাবে আমাদের হলো' কবিতায় নির্মলেন্দু গুণ যেভাবে আমাদেরকে মনে করিয়ে দিয়েছেন সাত মার্চের ঐতিহাসিক পটভূমি তেমনি বঙ্গবন্ধুর হত্যার বিচার যে হতেই হবে সেই বিশ্বাস থেকে দণ্ড কবিতায় লিখেছেন,

      'মুজিব হত্যার দণ্ড এড়াবে

       খুনীদের এতো সাধ্য কী?

       আমি কবি,জানি বাঙালির

       প্রিয় আরাধ্য কী? '

বাঙালি শেখ মুজিব কে বুকে রেখে ছবি আঁকে স্বদেশের। কবি মহাদেব সাহা, তাঁর,  'সেই কবিতাটি লেখা হয় নাই'  কবিতায় বিশ্বাস করেন,-

      'সেই কবিতাটি লেখা হয় নাই

      লিখবেন কোন কবি

      সেই কবিতাটি কবিতাতো নয়

     মুজিবের মুখচ্ছবি।'

১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ পযর্ন্ত পাকিস্তানের প্রতিক্রিয়াশীল চক্র ও জঙ্গি শাসকেরা একটার পর একটা ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে সংখ্যাগুরু বাঙালি জনগোষ্ঠীর উপর জগদ্দল পাথরের মতো ষে শাসন ও শোষণ চাপিয়ে দিয়েছিলো বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন তার বিরুদ্ধে সোচ্চার কণ্ঠস্বর। ইতিহাসের পাতা উল্টালে আমরা দেখতে পাই, আটচল্লিশের প্রথম ভাষা আন্দোলন ও ছাত্রলীগ গঠন,উনপঞ্চাশের আওয়ামী লীগ গঠন ও খাদ্যের দাবিতে ঢাকায় ভুখা মিছিল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিম্নতম কর্মচারী ধর্মঘট ও উত্তরবঙ্গে ছাত্র আন্দোলন,  একান্নতে খসড়া মূলনীতির বিরুদ্ধে বিক্ষোভ,  বায়ান্নতে ভাষা আন্দোলনকারীদের উপর গুলিবর্ষণের প্রতিবাদে কারাগারে অনশন, তেপ্পান্নতে যুক্তফ্রন্ট গঠন, চুয়ান্নতে যুক্তফ্রন্টের ঐতিহাসিক নির্বাচনে বিজয় ও পাক- মার্কিন সামরিক চুক্তির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, পঞ্চান্নতে আওয়ামী লীগের দরজা অমুসলিমদের জন্য উন্মুক্ত করা, ছাপ্পান্নতে সায়ত্তশাসনের দাবি ও সংখ্যাসাম্যের সংবিধানের বিরোধিতা, সাতান্নতে কাগমারী সম্মেলনে মন্ত্রিত্ব থেকে পদত্যাগের ঘোষণা, আটান্নতে আইয়ুব খানের সামরিক শাসনে কারাজীবন, বাষট্টির শিক্ষা আন্দোলন, তেষট্টিতে আইয়ুব সংবিধানের বিরোধিতা ও অকেজো 'এনডিএফ' থেকে পদত্যাগ, চৌষট্টিতে আওয়ামী লীগকে পুনরুজ্জীবিত করা,পয়ষট্টিতে পাক-ভারত যুদ্ধে নিরপেক্ষতা অবলম্বন, ছেষট্টিতে ঐতিহাসিক ছয় দফা দাবি উত্থাপন, সাতষট্টিতে বারটি মিথ্যা মামলার মোকাবেলা, আটষট্টিতে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা ঐ বৎসরই গণ-অভ্যুত্থানের জের হিসেবে ষড়যন্ত্রমামলা প্রত্যাহার এবং রাওয়ালপিন্ডিতে প্রেসিডেন্ট আইয়ুবের সাথে ব্যর্থ গোলটেবিল বৈঠক ও আইয়ুব খানের পদত্যাগ, সত্তরের ঘূর্ণিঝড়ে দুর্গত এলাকা সফর এবং সামরিক প্রহরায় অনুষ্ঠিত নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ঐতিহাসিক বিজয়, একাত্তরে স্বাধীকার ও অসহযোগ আন্দোলন চলাকালে ৭ মার্চের যুগান্তকারী ভাষণ এবং ২৫ মার্চ দিবাগত রাতে হানাদার বাহিনীর মোকাবেলায় নির্বাচিত নেতা হিসেবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা সর্বত্রই এই মহান নেতার অবিস্মরণীয় কার্যক্রম ও মুখচ্ছবি ভেসে ওঠে, যা প্রতিদিন কবিদের হৃদয়কে নানাভাবে আলোড়িত করে সেই সাথে যুক্ত হয় ৭৫এর নির্মম হত্যযজ্ঞ।

কবি রফিক আজাদ তাই লিখেছেন,  এই সিঁড়ি কবিতায়—

'এদেশের যা-কিছু তা হোক না নগণ্য, ক্ষুদ্র

তার চোখে মূল্যবান ছিলো ---

নিজের জীবনই তার কাছে খুব তুচ্ছ ছিলো '

 

কবি রুবী রহমান লিখেছেন ---

'আলোকের পিছনে যে আধুনিক অন্ধকার তার

ষড়যন্ত্র মন্ত্রতন্ত্র মানুষের জেনে রাখা ভালো।

ও প্রিয় প্রমিথিউস তুমি তার কিছু বোঝ নাই

        তুমি শুধু ভালোবাসা নিয়েছিলে '

 

সারা বাংলাদেশের মানুষের হৃদয়ে শেখ মুজিব এমন একটি নাম কেউ বিশ্বাস করে না তার প্রস্থান। মুজিব যেন তার কালো কোট সাদা পাঞ্জাবি পরে এইমাত্র ঘুরে এলেন সবুজ বাংলার প্রান্তর থেকে। কবি জাহিদুল হক লিখেছেন ---

'তুমি আজ নেই -তবু মানুষেরা ভাবে

হঠাৎ কখনো ফেরে মুজিবুর যদি '

 

গভীর শোক ও হতাশায় কবি রবীন্দ্র গোপ  'কাঁদো বাংলার মানুষ কাঁদো'  কবিতায় লেখেন---

'প্রতিটি ভোর এখানে এসে দাঁড়ায় শ্রদ্ধায় নতশিরে

রক্তিম আলোক-মালায় বিনম্র করপুটে

পুষ্পাঞ্জলি দিয়ে যায়।

কাঁদো বাংলার মানুষ কাঁদো। '

 

বাংলাদেশ জানে শেখমুজিব সকল সংগ্রামী চোখের সামনে আজও চিরকালের আশা ও ভরসার স্থান। যুদ্ধ ক্ষেত্রের সেই বাঙ্কারে, বন্দীর কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে, জল্লাদ বাহিনীর সামনে একটি নাম, একটি প্রতীক --- মহান নেতা শেখমুজিব। কবি আসলাম সানী তাই লিখেছেন, --

'কেবল একটি মৃত্যুই আমার কাছে মহান

কেবল একটি জীবনই আমার কাছে সহস্র কোটি জীবন। '

 

কবি বেলাল চৌধুরী তাঁর 'চিরশুভ্র' কবিতায় বলে গেছেন সকলের মনের কথাটি,

        'চিরকাল চিরদিন

বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ

অনির্বাণ অনিঃশেষ

চির শুভ্র অমলিন

চির সবুজ চির সজীব

বঙ্গবন্ধু শেখমুজিব। '

ছিষট্টিতে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা থেকে  গণআন্দোলনের মুখে কারাগার থেকে মুক্তি পাবার পর ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ থেকে রেসকোর্স ময়দানে যে গণ সংবর্ধনা দেয়া হয় তাতেই শেখ মুজিবকে বঙ্গবন্ধু খেতাব দেয়া হয়। এই খেতাব একদিনে আসেনি। তাঁর সমগ্র কাজের ফসল, আর স্বদেশেপ্রেমের ফসলই এই খেতাব। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে যত গান, কবিতা রচিত হয়েছে এমনটি আর কারো বেলায় এত গভীরভাবে হয়নি।  প্রত্যেক কবিই চেষ্টা করেছেন অন্তত একটি ভালো কবিতা রচনা করতে বঙ্গবন্ধুকে উৎসর্গ করে। এরই ধারাবাহিকতায় লিখেছেন কবি জসিমউদদীন,  সুফিয়া কামাল,  শামসুর রাহমান,সিকান্দার আবু জাফর,  জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী, মাযহারুল ইসলাম,  আবদুস সাত্তার,  শামসুল ইসলাম,  রাহাত খান, মুহম্মদ নূরুল হুদা, ফজল-এ-খোদা, অসীম সাহা, নাসির আহমেদ, লুৎফর রহমান রিটন, সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল, মোহাম্মদ আবদুল হান্নান, কাজী রোজী, মুহাম্মদ আবদূর রউফ, কল্পনা সরকার, খন্দকার আবদুল মোতালেব,  হিরণ কুমার রায়, মুহাম্মদ মোশারফ হোসেন ভূঁইয়া সহ আরো অনেকে। বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক ও লিটলম্যাগ বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে বের করছে বিশেষ সংখ্যা। সে সব সংখ্যায় আসছে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে অসামান্য সব কবিতা।

Side banner