kalchitro
Bongosoft Ltd.
ঢাকা বুধবার, ১৯ জুন, ২০২৪, ৫ আষাঢ় ১৪৩১

একটি চর্বিতচর্বণ


কালচিত্র | কে. জামান প্রকাশিত: মার্চ ১৭, ২০২২, ১২:০৭ এএম একটি চর্বিতচর্বণ
ঢাকার যানজটের চিত্র। ছবি সৌজন্যে দৈনিক যুগান্তর অনলাইন।

 

একটি চর্বিতচর্বণ

কে. জামান

 

  কে. জামান

প্রিয় পাঠক, আপনাদেরকে কিছু চর্বিতচর্বণ হজম করার অনুরোধ করব। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) মাননীয় মেয়র জনাব মো. আতিকুল ইসলাম ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটের এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, “রাস্তা সিটি করপোরেশনের কিন্তু ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব অন্য ডিপার্টমেন্টের। এই কারণেই কোথাও নিয়ন্ত্রণ থাকছে না। আমি চাই নগরীর যানজট নিরসনে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ডিএনসিসির অধীনে দিয়ে দেয়া হোক”  [দৈনিক মানবজমিন, অনলাইন ভার্সন, ১৬-০৩-২০২২]। চলতি বছরের মার্চের পনেরো তারিখ থেকে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়ায় রাস্তায় হঠাৎ গাড়ি বেশি নেমেছে, চাপ পড়েছে বেশি। যার ফলে মেয়র মহোদয় এ বক্তব্য দিয়েছেন। তবে, সিটি কর্পোরেশনের উপর ট্রাফিকের দায়িত্ব দিলে ট্রাফিক জ্যাম কমবে এই ভাবনার সাথে দ্বিমত পোষণ করার সুযোগ আছে বলা যেতে পারে।

ঢাকায় দৃশ্যমান পরিবর্তনের অন্যতম হলো ফ্লাইওভার, ওভারপাস। এগুলো কতটা কাজে লাগছে? মালিবাগ, মৌচাক ফ্লইওভারের উপর তো ট্রাফিক সিগনাল পড়ে। কিছুকিছু ফ্লাইওভার নেমেছে চৌরাস্তার সামনে। মহাখালী ফ্লাইওভার কেবল ফার্মগেইট-কাকলি-বনানীর গাড়িগুলো সুবিধা পেলেও ফার্মগেইট-গুলশানের গাড়িগুলো সেই সুবিধা পায় না। ফার্মগেইট ও তেজগাঁওয়ের গাড়িগুলোও গুলশানের দিকে ঢুকতে গেলে ট্রাফিকে পড়তে হয়। বিশ্বের আর কোথাও এমন আছে কী-না গবেষণা করা যেতে পারে। নগরবীদগণ মনে করেন, নকশার ভুলের কারণে এই সমস্যা। পার হতে গাড়িগুলোকে থামাতে হয়। তাই বলা যায়, ফ্লাইওভারগুলোও নানান কারণে খুব যে বিশি সুবিধা দিচ্ছে সেরকম নয়। র‌্যাংগস ভবন ভেঙে যে ওবারপাস নির্মাণ করা হলো তার উপর দীর্ঘ জ্যাম। এটাকে তেজগাঁওয়ের দিকে আরও একটু এগিয়ে বিজয় স্মরণির গাড়িগুলোকে পার করে দিতে পারলে মহাখালী এবং বিজয় স্মরণি হতে আসা গাড়িগুলোকে ট্রাফিকে পড়তে হতো না। আবার এই ওভারপাসটা বিজয় স্মরণির মোড় পার করে দিতে পারলেও যানজট কিছুটা হয়ত কমতো। এটা লেখকের সাধারণ চোখে মনে হয়েছে। নগরবীদরা ভালো বলতে পারবেন।

দিন দিন যানজট বেড়েই চলেছে ঢাকা শহরে। বসবাসের জন্য অনুপযোগী শহরের প্রথমদিকে এর অবস্থান। এ থেকে মুক্তির পথ কি নেই? ঢাকাকে বিকেন্দ্রীকরণ করার কথা দীর্ঘদিন ধরে বলে যাচ্ছেন বোদ্ধাগণ, বাস্তবায়ন কই? কর্তৃপক্ষের কতটা খেয়াল আছে জানা নেই।  মানিক মিয়া এভিনিউয়ের মত জায়গায় পাটগবেষণা কেন্দ্র, ফার্মগেটের মত ব্যস্ত এলাকায় কৃষি গবেষণা কাউন্সিল, গাজীপুরে সুবিশাল এলাকা নিয়ে আনসার একাডেমি থাকলেও ঢাকার খিলগাঁওয়ের মত ঘিঞ্জি এলাকায় আনসার ভিডিপির হেডকোয়ার্টার.... (কয়টা নাম ধরে বলব!) থাকলে কেবল ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ করে যানজট কমানো যাবে বলে মনে হয় না। এই সমস্যা তো দীর্ঘদিনের।

মানসম্মত গণপরিবহন তো স্বপ্ন ঢাকা শহরে। যেখানে মানুষের মাথাপিছু ইনকাম বাড়ছে, রুচিবোধের পরিবর্তন হচ্ছে, কষ্ট করে হলেও নব্য ধনী কিংবা উচ্চমধ্যবিত্তরাও নিজের ব্যক্তিগত গড়ির দিকে ঝুকছে সেখানে মানসম্মত গণপরিবহন না হলে কেবল ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ করলেও গাড়ি কমবে রাস্তায়? চলাচলের জন্য মানসম্মত গণপরিবহন প্রয়োজন, যেখানে ভিড়ে চ্যাপ্টা হয়ে চলাচল করতে হবে না (জাপানের রেলের ভিড়ের কথা বলতে পারেন, তবে, আমরা জাপানিদের মত ভদ্র হতে পারিনি এখনো) যেখানে হেলপারদের সাথে ভাড়া নিয়ে মারামারি হবে না, কথাকাটাকাটি হবে না, ভাড়া নিয়ে কথাকাটাকাটি হলে চলন্ত গাড়ি থেকে ফেলে দিয়ে যাত্রী মারা হবে না, যাত্রীদের পকেট কাটবে না পরিবহণসংশ্লিষ্টরা।

ঢাকার বাইরে জেলাশহরগুলোতেও মানসম্মত হাসপাতাল নেই। দেশের যে-প্রান্তেই হোক, সড়ক দুর্ঘটনায় পঙ্গু হলে, বা অন্য কোনো জটিল রোগে আক্রান্ত হলে মানুষের ঢাকামুখীনতা ছাড়া উপাই নেই। বলা হয়, ঢাকায় টাকা ওড়ে। কথাটা মিথ্যে নয়। কী বেকার, কী কর্মী, কী ডাক্তার, কী শিক্ষক, কী মুটে-মুজুর-ভিক্ষুক, ভ্যান-রিক্সা চালক, পকেটমার, চোরবাটপাড়, মোল্লা, পুরোহিত, সাধু, ভণ্ড, সতীস্বাধবী-যৌনকর্মী, হকার, শিল্পপতি... সবাই ঢাকায় আসতে চায়, থাকতে চায়। কারণ এখানে বাণিজ্য আছে, ব্যাবসা আছে, ঠকবাজী, ধান্দাবাজি, ফন্দিফিকির সবকিছুর খেলা চলে এখানে। তাই উড়ন্ত টাকা ধরতে সবাই যেন দম বন্ধ হয়ে আসলেও প্রাণপন ঢাকার মাটি আঁকড়ে ধরে পড়ে থাকতে চায়।

সনদধারী উচ্চশিক্ষিত বেকার যুবকরা কেরানিগিরি হলেও একটা সরকারি-বেসরকারি চাকরির আশায় ৮-১০ বছর চাঁদসুরুযগ্রহনক্ষত্রদেশমহাদেশআকাশপাতালের খবর গলধকরণ করতে থাকে; তবু কর্মী হয়ে ছোটখাট ব্যাবসা করতে পারে না; পাছে তাদের সনদের, নামকাওয়াস্তা উচুশিক্ষার অপমান হয়! এই সনদধারী উচুশিক্ষাঅলা চাকরিরে খোঁজনেওয়ালারাও ঢাকার যানজট বাড়াতে অবদান রাখেছে বলা যায়।

সমস্যা অনেক। সবজায়গায় পর্যায়ক্রমে হাত দিতে হবে। ঢাকাকে বিকেন্দ্রিকরণ করতে হবে, গণমুখী সুশৃঙ্খল গণপরিবহণ গড়ে তুলতে হবে, কম গুরুত্বপূর্ণ সরকারি অফিসগুলো ঢাকার বইরে স্থানান্তর করতে হবে, ঢাকার বাইরে মানসম্মত হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হবে। ঢাকার বাইরে অর্থনৈতিক আয়ের উৎসা বাড়াতে হবে। সামাজিক মূল্যবোধের পরিবর্তন আনতে হবে। না হলে কেবল যানজট নিয়ন্ত্রণের কথা বললে এই সমস্যার সমাধান হবে বলে মনে হয় না। হয়ত বলা সহজ করা কঠিন, তবে সদিচ্ছা থাকলে কঠিন বলে কিছু নেই।

 

লেখক: ইতিহাস গবেষক

  

Side banner