kalchitro
Bongosoft Ltd.
ঢাকা মঙ্গলবার, ০৫ জুলাই, ২০২২, ২১ আষাঢ় ১৪২৯

ইসলাম ও আনন্দ-বিনোদন


কালচিত্র | রেজাউল করিম প্রকাশিত: মে ২, ২০২২, ০৬:১৮ পিএম ইসলাম ও আনন্দ-বিনোদন

ইসলাম ও আনন্দ-বিনোদন

রেজাউল করিম

 

জীবনের উদ্দেশ্য শান্তি। শান্তির জন্য ধর্ম, কর্ম, সমাজ, রাষ্ট্র প্রভৃতি। শান্তি আসে আনন্দ থেকে। আনন্দ আসে বিভিন্ন উৎসব, অনুষ্ঠান, বিনোদন থেকে। হতে পারে সেটা ধর্মীয়, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক, পারিবারিক। কিন্তু আনন্দ উৎসবকে এক শ্রেণির আলেম, মোল্লা, মৌলবীরা ইসলাম বিরোধী বলে আখ্যা দিয়ে ইসলাম ধর্মকে নিরামিষ ধর্মে রূপান্তরিত করে ফেলেছেন। ইসলামে গান করা যাবে না, নাচ করা যাবে না, বাজনা বাজানো যাবে না, খেলা করা যাবে না, মেলা করা যাবে না, নৌকা বাইচ চলবে না, যাত্রা, নাটক, সিনেমা, সার্কাস চলবে না। এগুলো ওহাবি চেতনার ফসল। এমনকি ওহাবিদের মতে, মিলাদ, শিরনি, পির-মুর্শিদ এবং তাদের মাজার সব বেদাত, চলবে না। তারা হযরত মুহাম্মদ সঃ এর মাজারও ভেঙ্গে ফেলেছিল। (উইলিয়য়াম হান্টার, দি ইন্ডিয়ান মুসলমানস, অনুবাদ আবদুল মওদুদ, ঢাকা, আহমদ পাবলিশিং হাউজ, জানুয়ারি ১৯৯৬, পৃ. ৩৯)।

ওহাবি অনুসারীরা খুবই রক্ষণশীল। ওহাবি আধিপত্যের পূর্ব পর্যন্ত ইসলাম ছিল আমিষে ভরপুর। গান-বাজনা, খেলাধুলা, মেলা, আনন্দ-বিনোদন, বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠাননে ইসলাম ছিল ভরপুর, সতেজ, প্রাণচঞ্চল। উমাইয়া, আব্বাসিয়, ফাতেমিয়, অটোমান, সালতানাত, মুঘল প্রভৃতি আমলের রাজা, বাদশাহ, খলিফা, স্থানীয় শাসকবৃন্দ, সমাজপতিগণ ছিলেন আনন্দ-বিনোদন অনুষ্ঠানের পৃষ্ঠপোষক। এক মাস রোযা রাখার পর আসে ঈদ। ঈদ মানে আনন্দ। আনন্দের দিনে মানুষ আনন্দ করবে, নাচ-গান করবে, খেলাধুলা করবে, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করবে, ক্রীড়া-কৌতুক করবে। এটা স্বাভাবিক। কিন্তু একদল ফতোয়া দিয়ে বেড়ায় এগুলো ঠিক নয়, ইসলাম সম্মত নয়, বেদাত ইত্যাদি। আগে বিয়ে বাড়িতে, খৎনা বাড়িতে গীত-বাজনা, নাচ হতো, তাও বন্ধ হয়ে যাচ্ছে ইসলাম বিরোধী প্রচারণার কারণে। দেখা যাক, আল্লাহ এবং রাসুল সঃ এ ব্যাপারে কী বলেছেন?

আল্লাহ পাক গান-বাজনা, ক্রীড়া-কৌতুক, আনন্দ-বিনোদনকে নিষিদ্ধ করেননি। তিনি পবিত্র কোরানে মদ, জুয়া, সুদ, ঘুষ, শুকর মাংস, ব্যভিবিচারকে হারাম করেছেন। যদি তিনি গান-বাজনাকে অপছন্দ করতেন, তাহলে অবশ্যই কোরানে তা সুস্পষ্ট উল্লেখ থাকত। আল্লাহ যেখানে সঙ্গীতকে নিষিদ্ধ করেননি, সেখানে একজন মোল্লা-মৌলবী কি তা নিষিদ্ধ করার অধিকার রাখেন? এবার দেখা যাক এ ব্যাপারে রাসুল সঃ কী বলেছেন? হযরত মুহাম্মদ সঃ নিজেও সঙ্গীত, ক্রিড়াকৌতুক বা আনন্দ বিনোদনমুখী মানুষ ছিলেন। এর স্বপক্ষে অনেক তথ্য প্রমাণ রয়েছে। হযরত আয়েশা রাঃ বলেন, “ঈদের দিন দুইটি মেয়ে আমার কাছে দফ (ঢোল) বাজিয়ে গান করছিল। এমন সময় রাসুলুল্লাহ সাঃ ঘরে এসে চাদর মোড়া দিয়ে শুয়ে পড়েন। ইতিমধ্যে হযরত আবু বকর রাঃ আগমন করেন এবং মেয়ে দুইটিকে ধমক দিয়ে বলেন, রাসুল্লাহর গৃহে শয়তানের বাদ্যযন্ত্র! এ কথা শুনে রাসুলুল্লাহ বলেন, হে আবু বকর! তাদেরকে বাধা দিও না, কেননা আজ ঈদের দিন।” (হযরত ইমাম গাযযালী (রহঃ), সৌভাগ্যের পরশমনি, ২য় খণ্ড, অনূদিত আবদুল খালেক, ঢাকা, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, পৃ. ২০৪। মূল গ্রন্থের নাম কিমিয়া সাদত, অনুবাদকৃত নাম সৌভাগ্যের পরশমনি)।

হযরত আয়েশা রাঃ একটি মেয়েকে লালন পালন করতেন। অতঃপর তিনি তাকে এক আনসারের সাথে বিয়ে দেন। তিনি মেয়েটিকে তার স্বামীর গৃহে রেখে আসেন। হযরত আয়েশা রাঃ প্রত্যাবর্তনের পর রাসুলুল্লাহ সাঃ তাঁকে জিজ্ঞেস করেন, “তুমি কি মেয়েটিকে তার স্বামী গৃহে রেখে এসেছ? উত্তরে আয়েশা রাঃ বলেন, হ্যাঁ”। রাসুলুল্লাহ সাঃ আবার জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি কি এমন কাউকে তাদের বাড়ি পাঠিয়েছ যে গান গাইতে পারে? তিনি বলেন, না”। রাসুলুল্লাহ সাঃ বলেন, “তুমি তো জানো আনসাররা অত্যন্ত সঙ্গীতপ্রিয়”। (এ.জেড.এম শামসুল আলম, মুসলিম সঙ্গীত চর্চার সোনালী ইতিহাস, বাংলাদেশ কো-অপারেটিভ বুক সোসাইটি লিঃ, ঢাকা-চট্টগ্রাম, ফেব্রুয়ারি ২০১২, পৃ. এবং হাদিস নং ৪৭৮৫, বুখারি শরিফ, ৮ম খণ্ড, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, পৃ. ৪৪৫)।

হযরত আয়েশা রাঃ বলেন, “আমার পাশে বসে এক দাসী গান গাইছিল। এমন সময় হযরত ওমর রাঃ আগমন করেন এবং ভেতরে প্রবেশের অনুমতি চান। হযরত ওমরের আগমন টের পেয়ে দাসীটি সেখান থেকে পালিয়ে যায়। তিনি ভেতরে প্রবেশ করতেই রাসুল সঃ মুচকি হাসি হাসছিলেন। তিনি জিজ্ঞেস করলেন: হে আল্লাহর রাসুল, আপনি কেন হাসছেন? রাসুল সঃ এরশাদ করলেন: দাসী আমাদের পাশে বসে গান করছিল। তোমার আগমন টের পেয়ে সে পালিয়ে যায়। হযরত ওমর বলেন: আপনি যা শুনেছেন আমি তা না শোনা পর্যন্ত দাসীকে ছাড়ছি না। অতঃপর মহানবি সঃ দাসীকে ডেকে গান শোনাতে বললেন।” (সাইয়্যেদ আবুল হাসান আলী দাতাগঞ্জে বখ্শ হাজবেরী (র), কাশফুল মাহজুব, বঙ্গানুবাদ: সূফী মুহাম্মদ ইকবাল হোসাইন কাদেরী, ঢাকা, রশীদ বুক হাইজ, ফেব্রুয়ারি ২০১২, পৃ. ৩৬০)।

মুসাদ্দার (র)---- হযরত রুবাই বিনত মুআবিয়া ইবন আদরা (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমার বাসর রাতের পরের দিন নবি এলেন এবং আমার চাঁদরের উপর বসলেন। সে সময় আমাদের কচি মেয়েরা দফ বাজাচ্ছিল এবং বদর যুদ্ধে শাহাদাৎপ্রাপ্ত আমার বাপ চাচাদের শোকগাঁথা হচ্ছিল। তাদের মধ্যে একজন বলে ফেলল যে, আমাদের মধ্যে একজন নবি আছেন, যিনি আগামি দিনের কথা জানেন। তখন রাসুলুল্লাহ (স) বললেন, এ কথা বাদ দাও এবং তোমরা পূর্বে যা করছিলে তাই কর অর্থাৎ তোমরা পূর্বে যে গান করছিলে তা কর। (হাদিস নং ৪৭৭০, বুখারি শরিফ, ৮ম খণ্ড, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, পৃ. ৪৩৬)।

হযরত আনাস রাঃ বর্ণনা করেন, “সফরে রসুলে সঃ এর জন্যে হুদি পাঠ করা হত। উটের পেছনে হুদি পাঠ করার প্রথা রাসুল সঃ এবং সাহাবায়ে কেরামের যমানায় সব সময় চালু ছিল। হুদি এক প্রকার কবিতাই, যা সুললিত স্বরে ও ভারসাম্যপূর্ণ সঙ্গীত সহকারে পাঠ করা হত। এতে উটের গতিবেগ বেড়ে যেত। সাহাবিগনের মধ্যে কেউ এটা অপছন্দ করেছেন বলে বর্ণিত নেই; বরং মাঝে মাঝে তারা এটা করার অনুরোধ করতেন।” (হযরত ইমাম গাযযালী (রহঃ), এহউয়াউ উলুমদ্দিন, ৩য় খণ্ড, অনুবাদ মাওলানা মুহিউদ্দীন খান, মদিনা পাবলিকেশন্স, জুলাই ২০১৮, পৃ. ৭০-৭১)।

হযরত আনাস রা. বলেন, নবি করিম স. এর একজন হুদি গায়ক ছিলেন, তাঁর নাম আনজাশা। (মাওলানা মোহাম্মদ আকরাম খাঁ, সমস্যা ও সমাধান, ২য় সংস্করণ, মোহাম্মদী প্রেস, কলিকাতা, ১৩৪৫ বঙ্গাব্দ, পৃ. ৬৯। মাওলানা আকরাম খাঁ ছিলেন অখণ্ড বাংলার মুসলিম লীগ সভাপতি)।

ঈদ, বিবাহ, আকিকা প্রভৃতি আনন্দানুষ্ঠানে রাসুল করিম সঃ বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার পছন্দ করতেন। তিনি বলেন, “গিরবাল বা খঞ্জনি বাজিয়ে হলেও তোমরা বিবাহ ঘোষণা কর।” (এ.জেড.এম শামসুল আলম, ঐ, পৃ.৭৪)। গিরবাল বা খঞ্জনি ছিল নিম্নস্তরের বাদ্যযন্ত্র। তাই উচ্চ স্তরের বাদ্যযন্ত্রের সামর্থ না থাকলে খঞ্জনি বাজিয়ে হলেও শুভ বিবাহ কর। হযরত আলী রাঃ ও বিবি ফাতেমার বিয়েতে বিখ্যাত সঙ্গীতজ্ঞ আমর ইবনে উমাইয়া জারিমি ‘দায়রা’ নামক গোল তাম্বুরা বাজিয়েছিলেন। (এ.জেড.এম শামসুল আলম, ঐ, পৃ.৭৪)। পরিতাপের বিষয় যে, মৌলবীরা বিয়ে বা আনন্দোনুষ্ঠানেও বাদ্যযন্ত্র বাজাতে নিষেধ করেন।

রাসুলুল্লাহ সঃ এর সময়ে খোদ মসজিদে, মসজিদ প্রাঙ্গণে আনন্দ অনুষ্ঠান হতো। হাবসিরা ছিল সংস্কৃতি প্রিয়। তারা গান, নাচ, ক্রীড়া-কৌতুক করত। একবার দুইজন হাবসি ক্রীতদাস মসজিদে ক্রীড়া-কৌতুক করছিল। রাসুল্লাহ সঃ এর সাথে হযরত আয়েশা রাঃ তা উপভোগ করেছিলেন। হযরত আয়েশা রাঃ বলেন, “একবার রাসুলুল্লাহ সঃ আমাকে চাদর দিয়ে ঢেকে রেখেছিলেন আর আমি মসজিদে হাবসিদের ক্রীড়া-কৌতুক দেখছিলাম। হযরত ওমর রাঃ আমাকে সেখানে দেখতে পেয়ে শাসালেন। তখন রাসুলুল্লাহ সঃ বললেন : হে বনী আরকাদা, তোমরা নির্বিঘ্নে খেলা প্রদর্শন কর।” (হযরত ইমাম গাযযালী (রহঃ), এহউয়াউ উলুমদ্দিন, ঐ, পৃ.৭৪)।

মানুষ মারা গেলে শোক সঙ্গীত গাওয়া জায়েয। আল খানসা ছিলেন হযরত মুহাম্মদ সঃ এর সমসাময়িক এবং আরবের মহান মহিলা কবি। আল খানসার ভাই ছিলেন একজন বীর। তার নাম সাখর। এ বীর মারা গেলে তার বোন আল খানসা অনেক শোক সঙ্গীত গেয়েছিলেন। (পি কে হিট্টি, আরব জাতির ইতিহাস, অনুবাদ জয়ন্ত সিং, সেঁজুতি ভট্টাচার্য, সৌমিত্র সেনগুপ্ত, কলিকাতা, মল্লিক ব্রাদার্স, ১৯৯৯, পৃ. ৩০২)। কৈ, রাসুল সঃ তো তা নিষেধ করেননি। আর গান যদি হারাম হতো, তাহলে দাউদ নবি, সোলায়মান নবি কি গান করত? দাউদ আঃ এর অনেক বাদ্যযন্ত্র ছিল। (দাউদ আঃ কে নিয়ে আলাদা একটা লেখায় তা আলোচনা করেছি)। মুসা নবিও গান করতেন। তৌরাতে আছে, মোশি ও ইসরায়েলের লোকেরা প্রভুর উদ্দেশ্যে গান গাইত। (তৌরাত/ওল্ড টেস্টামেন্ট, যাত্রাপুস্তক, ১৫:১)।

কোন কোন সময় গান গাওয়া জায়েয সে সম্পর্কে হযরত ইমাম গাযযালী রহঃ বলেন, “ সাধনার সময়, জেহাদে উদ্বুদ্ধ করতে, মল্লযুদ্ধে অবতীর্ণ হতে, মৃত্যু শোকে, ঈদের দিনে, বিবাহ মজলিসে, অনুপস্থিত ব্যক্তির আগমনে, ওলিমা, আকিকা, পুত্র সন্তান জন্মগ্রহণ ও খৎনা, হিফজে কোরানে আনন্দ প্রকাশের উদ্দেশে গান গাওয়া জায়েয।” (হযরত ইমাম গাযযালী (রহঃ), এহউয়াউ উলুমদ্দিন, ঐ, পৃ. ৭২-৭৪)। গাযযালী সাহেব পুত্র সন্তানকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। পুত্র সন্তান জন্মগ্রহণের সময় না বলে সন্তান জন্মগ্রহণের সময় বললে ছেলে মেয়ে উভয়েই গুরুত্ব পেতেন। পুত্র সন্তানের জন্য গান গাওয়া গেলে কন্যা সন্তানের জন্যও যাবে। যাহোক, সঙ্গীত, আনন্দ অনুষ্ঠান, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ইসলামে অবৈধ নয়, ইসলাম ধর্ম পালন করেও যে, তা করা যায় তার ভুরি ভুরি নজির আছে। এখানে কতিপয় সাক্ষ-প্রমাণ হাজির করা হয়েছে মাত্র। বই আকারে বের হলে তিাতে বিস্তর আলোচনা থাকবে। তবে উচ্চ স্বরে ডেক সেট (সাউন্ড বক্স) বাজিয়ে মানুষকে বিরক্ত করা কাম্য নয়। সব খাদ্য যেমন হালাল নয়, তদ্রূপ সব গানও হালাল নয়। শরীর বিকাশের জন্য খাদ্য যেমন প্রয়োজন, তেমনি মনের বিকাশের জন্য সঙ্গীত ও আনন্দ বিনোদন প্রয়োজন।

রেজাউল করিম,

সহকারী অধ্যাপক,

ইতিহাস বিভাগ,

সরকারি রাজেন্দ্র কলেজ, ফরিদপুর।

ইমেইল: rejaulkarim1975@gmail.com

Side banner