kalchitro
Bongosoft Ltd.
ঢাকা বুধবার, ১৯ জুন, ২০২৪, ৫ আষাঢ় ১৪৩১

প্রেম নিয়ে (অমীমাংসিত) তর্ক


কালচিত্র | ড. মোহাম্মদ শেখ সাদী প্রকাশিত: জুলাই ১৫, ২০২৩, ১০:০৫ এএম প্রেম নিয়ে (অমীমাংসিত) তর্ক

প্রেম নিয়ে (অমীমাংসিত) তর্ক

ড. মোহাম্মদ শেখ সাদী

সাম্প্রতিক সময়ের পুঁজিবাদী বিশ্বব্যবস্থা তর্কাতীতভাবে সমাজ-রাষ্ট্রকাঠামো সর্বোপরি মানবজীবনকে জটিলাবর্তে নিক্ষেপ করেছে। মানুষের স্বাভাবিক হৃদয়বৃত্তির স্থলে স্থান করে নিয়েছে বৈষয়িক ভেদবুদ্ধি। বস্তুতান্ত্রিকতার নিগড়ে জিম্মি হয়ে পড়ছে ইচ্ছায়-অনিচ্ছায়। ফলে ভাববাদী দর্শন বস্তুবাদী, বাস্তববাদী মানুষের কাছে অসাড় মনে হয়। ভাববাদী বা আদর্শবাদী রোমান্টিক রবীন্দ্রনাথ একালে জন্মালে কী করতেন অনেক সমঝদারই কৌতুকবশত বলে থাকেন। হাসির ছলে বললেও ভাবনাটি গভীর। সময়, সমকালের অভিঘাত মানুষকে বিশেষ কিংবা বিশিষ্ট জীবনদৃষ্টি দান করে থাকে। ফলে একই ডিসকোর্সের স্বরূপ ও প্রকৃতি পাল্টে যায়। প্রেম নিয়ে কত জিজ্ঞাসা-দর্শন! সাম্প্রতিক সময়ে মানবসম্পর্ক আগের মতো খুব দৃঢ়, গভীর নয়, মানে মানবসম্পর্ককে হৃদয়ের প্রগাঢ় আবেশহীন বলে অনেকেই মনে করেন। এই ধারণা অমূলক নয়। চার-পাঁচ কিংবা সাত-আট বছর প্রেম করে বিয়ে করার মাত্র দু‍‍`চার মাস/ ছ‍‍`সাত মাসের মাথায় সম্পর্ক বা সংসার ভেঙে যেতে দেখছি হরহামেশাই! কারো বা প্রেম করে বিয়ে করে একটি সন্তান হবার তিন-চার বছরের মাথায় সুইসাইড করে মরতে দেখেছি, দেখছি অকস্মাৎ! সম্পর্কের এই ভয়ানক পরিণতির কারণ হিসেবে নানা অনুষঙ্গকেই বিবেচনায় আনা যায়। আমার মামুলি বয়ানে শুধু দু‍‍`চারটি খসড়া আলাপ করবো। প্রথমত, আধুনিক তথ্য-প্রযুক্তির এই যুগে মানবসম্পর্ক পূর্বের ন্যায় পুরোপুরি হৃদয়গঠিত নয়; হৃদয়বৃত্তির স্থলে বস্তুগত-বৈষয়িক লাভালাভ বা হিসেব-কিতেব প্রাধান্য পেয়েছে- যা মানবিক সমাজের অনুগামী নয় মোটেও। যা কেবল পশুজগতে মানানসই। কিন্তু আপত্তিকর বাস্তবতাটি মনুষ্য সমাজের প্রতিক্রিয়া এখন। দ্বিতীয়ত, প্রেম রোমান্টিকতাজাত মানবমনের এক বিশেষ ধরনের প্রতিক্রিয়া। তাত্ত্বিকগণ প্রেমকে নানাভাবে দেখেছেন। ঐশীপ্রেম ও মানবপ্রেমের উৎস একই স্থল হতেই। গতিধারা ভিন্ন। মাওলানা রুমির প্রেমদর্শন অপূর্ব অধ্যাত্মবাদী ফল্গুধারা। নরনারীর প্রেমের রহস্য ব্যাখ্যা করতে সিগমুন্ড ফ্রয়েড বলেছেন, ‍‍`কামচেতনাই প্রেমচেতনার মৌল ভিত্তি‍‍`।তিনি আরো বলেন, ‍‍`প্রেমের স্থায়িত্ব বড়জোর আড়াই/ তিন বছর‍‍`। লালন ফকির বলেন, ‍‍`কাম হইল প্রেমের লতা‍‍`। শাহ আবদুল করিম বলেন, ‍‍`কাম হইতে হয় প্রেমের উদয়/ প্রেম হইলে কাম থাকে না‍‍`। রবীন্দ্রনাথ বলেন, ‍‍` এ মোহ কদিন থাকে/ এ মায়া মিলায়‍‍`। রবীন্দ্রনাথ প্রেমতত্ত্ব হলো- ‍‍`প্রেম চিরন্তন, পাত্রপাত্রীও চিরন্তন‍‍`। নজরুল বললেন, ‍‍`প্রেম চিরন্তন, পাত্রপাত্রী চিরন্তন নয়‍‍`। সুধীন্দ্রনাথ দত্ত বলেন, ‍‍`প্রেম চিরন্তন নয়, পাত্রপাত্রী চিরন্তন নয়‍‍`। প্লেটো বললেন, নিষ্কাম প্রেমের কথা অর্থাৎ দেহাতীত প্রেমের কথা। রবীন্দ্রনাথের প্রেমতত্ত্ব দেহ থেকে দেহাতীতে উত্তীর্ণ। প্রমথ চৌধুরী বলেন, ‍‍`মন পদার্থটি মিলনের কোলে ঘুমিয়ে পড়ে, বিচ্ছেদের স্পর্শে জেগে থাকে‍‍`। আর কত শত চিন্তা-দর্শন জড়ো করা যাবে এই ডিসকোর্সটিকে প্রলম্বিত করতে! সবিস্তারে কিছুই বলবো না আজ। শুধু এই টুকু বলবো- যারা প্রেম, বিয়ে নিয়ে তর্ক করেন, অনুযোগ করেন যে একই জুটি প্রেমপর্বে একরকম, বিয়ের পর বদলে যান কেন! অনেকের ধারণা, দেহগত কামনাবাসনা ফুরায় বলে সম্পর্ক শিথিল হয়ে পড়ে। এটি একটি কারণ হতেই পারে। কিন্তু একমাত্র কারণ হতে পারে না। বিয়ে মানে শুধু শারীরবৃত্তীয় ডিসকোর্স নয়, বরং দায়িত্ব। মানবিক ও সামাজিক দায়বোধও। শরীর ফুরায়। তাহলে পৃথিবীতে অনেক সম্পর্কই টিকে থাকে কীভাবে ! সেটি কীসের বলে? মোহ কেটে যায়। দেহগত কামনাবাসনা ভিত্তি হলে বা কেবল মোহাবিষ্ট সম্পর্ক হলে তা বস্তুতান্ত্রিক সম্পর্ক হয়ে থাকে সাধারণত। বস্তুগত উপযোগিতার বোধ প্রবল হলে মোহ ছাড়িয়ে মায়া, সম্পর্কের প্রতি দায়বদ্ধতা বা দায়বোধ জন্ম নেয় না ব্যক্তিচৈতন্যে। ফলে সম্পর্ক খুব দ্রুত ফুরিয়ে যায়। তখন এক পক্ষের অনীহায় সম্পর্ক ভেঙে পড়ে। আরেকটি বিষয় খুব গুরুত্বপূর্ণ - সেটি হলো এই বাস্তবতা উপলব্ধি করা যে প্রেমপর্ব আর বিয়েপর্বের সম্পর্কের ধরন একরকম নয়। প্রেমপর্বে ফ্যান্টাসির জগতে ভাসে মানবমন। অবাধ কল্পনাপ্রবণতার বিস্তার সেখানে! কেবল স্বপ্ন আর স্বপ্ন! হিসেব কিতেবের বালাই নেই। মানুষ যখন স্বপ্নচারী হয়, তখন সে আকাশবিহারী! উড়তে থাকে পাখির মতো ডানা মেলে অনন্তের অভিযাত্রী হয়ে। বিয়ে করে সে ধূলির ধরায় অর্থাৎ হিসেব কিতেবের পৃথিবীতে অনুপ্রবেশ করে। যেখানে হিসেব সেখানেই হোঁচট খায় স্বপ্ন। কারণ স্বপ্নের কোনো প্রাচীর নেই, সীমানা নেই! প্রসঙ্গত, রাশিয়ায় লেলিনের নেতৃত্বে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের কথা স্মরণ করতে পারি। সম্পদের সুষম বন্টনের নিশ্চয়তা বিধানকারী সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের এত সুন্দর তাত্ত্বিক দর্শনও ভেস্তে গেল বাস্তবজগতে প্রয়োগ করতে গিয়ে। ৭১‍‍`র-পূর্ববর্তী বাংলাদেশের শিল্প-সাহিত্য বিশেষ করে ষাটের দশকের কবিতা, গানের মতো সুন্দর সৃষ্টি এ যাবত আর দেখি না! ষাটের দশকের সোনালী প্রজন্ম আমি নতজানু হয়ে কুর্নিশ করি। কারণ তাঁদের ছিল বৃহৎ প্রসারিত হৃদয়, চেতনা। কারণ তাঁদের সামনে ছিল একটা বড়, মহৎ স্বপ্ন। যা তাঁদেরকে নিরন্তর তাগিদ যোগাতো অসাধারণ কিছু করার। দেশপ্রেমের মতো বড়ো মহৎ ভাবনা যুক্ত হয়েছিল তাঁদের ব্যক্তিসত্তায়। ফলে ঐ সময়ের গানের মতো তীব্র অনুভব-অভিব্যক্তির গান একালে হয় না কেন? কারণ একালে দেশ জাতি স্বাধীন বলে মীমাংসিত হয়ে গেছে সব। মানুষ আত্মপর হয়ে উঠছে। মীমাংসিত মন সৃষ্টিশীল থাকে না। প্রেমপর্বে সৃষ্টিশীল থাকে মন। কারণ অনিশ্চয়তা প্রেমের গতিকে বেগবান রাখে। বিয়েতে মীমাংসিত হয়ে যায় অনেকটা, ফলে শিথিল হতে থাকে সম্পর্ক। এসব মনস্তাত্ত্বিক রহস্যের বিক্ষিপ্ত ভাষ্য না হয় হলো। মানুষ তো যন্ত্র নয়, রোবট হতে পারে না! কেন তবে মোহ ও হিসেবকিতেবের বৈষয়িক ভেদবুদ্ধি ছাপিয়ে মায়া, দায়বদ্ধতা জেগে উঠবে না মানুষের বিবেকের উৎসভূমিতে! ক্ষণস্থায়ী এই জগতে কেন এত স্বার্থান্ধ হয়ে ওঠে মানবমন! কেন পিষে যায় আপন মানুষগুলো তাদের একসময়ের ভীষণ আপনজনকে! মানুষ তো কেবল পণ্য হতে পারে না। মানুষকে পণ্যের দরে মাপা তো মানবাত্মারই অবমাননা! একটি মানবসম্পর্কের বিচ্ছেদ মানে মানবাত্মারই পতন। মানুষ মানবিকবোধে উচ্চকিত হবে ধ্বংসন্মুখ সময়ে দাঁড়িয়েও। এটিই তো প্রত্যাশা মানুষের কাছে। তা না হলে, পশুর স্তর হতে মানুষ অধিক নীচ নয় কি!

[বি. দ্র. (প্রেম করে বিয়ে করা) আমার একজন সুহৃদের আত্মহত্যার পর আমার তাৎক্ষণিক অনুভূতি।]

লেখক : ড. মোহাম্মদ শেখ সাদী

অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, চবি

Side banner